সৌরভ ও রাঙ্কা সাংবাদিক বৈঠক করে দেশের সব রাজ্যের মানুষকে একসঙ্গে পথে নামার ডাক দিয়েছেনANI
Published on
:
4 min read
অরিন্দম বন্দ্যোপাধ্যায়, নয়াদিল্লি
প্রয়াত প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় একবার একটি ঘরোয়া আলাপচারিতায় সাধারণ রাজনৈতিক আন্দোলন এবং গণ-আন্দোলনের পার্থক্যের ফারাক বুঝিয়েছিলেন৷ সে সময়ে নির্ভয়া কাণ্ডের জেরে দিল্লি–সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন চলছিল, তাকেই প্রকৃত ‘গণ-আন্দোলন’ বলা যায়— বলেছিলেন তিনি৷ এও বলেছিলেন— দৈনন্দিন কোনও সাধারণ ইস্যুতে রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গণ-আন্দোলনের রসদ থাকে না৷
এক যুগেরও বেশি সময় আগে প্রবীণ রাজনীতিকের দেখানো পথেই এ বার দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ এবং ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (সার) বাতিলের ইস্যুতে দিল্লির যন্তর মন্তরে যে আন্দোলনের সূত্রপাত, তাকে গোটা দেশে ছড়িয়ে দিয়ে গণ–আন্দোলনের রূপ দিতে চান ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) নেতৃত্ব। ‘নিট’–প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে সিজেপির আন্দোলন যন্তর মন্তর থেকেই ছড়িয়ে পড়েছিল পাটনা, মুম্বই, কলকাতা–সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। তবে এ বার সিইসি–র অপসারণ ইস্যুতে মুম্বই, বেঙ্গালুরুতে প্রতীকী প্রতিবাদ কর্মসূচির পরে শনিবার রাজধানী দিল্লিতে ধর্না সমাবেশ করতে গিয়ে পুলিশি ঘেরাটোপে আটকে গিয়েছেন অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কারা।
শনিবার বিমান থেকেই তাঁদের তিন জনকে আটক করে দিল্লি পুলিশ। প্রায় ২৪ ঘণ্টা পরে রবিবার সকালে মুক্তি পান তাঁরা৷ এ দিন সকালে দিল্লি ক্যান্টনমেন্টের এগজ়িকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে তাঁদের হাজির করানো হয়। সেখান থেকেই তাঁরা মুক্তি পান। সিজেপি–র লিগাল টিমের প্রধান রত্না সিং জানিয়েছেন, দীপকে, সৌরভ এবং রাঙ্কা এক বছরের জন্য কোথাও শান্তিভঙ্গ করতে পারবেন না। ৫০,০০০ টাকার ব্যক্তিগত বেল বন্ডের পাশাপাশি শান্তি ভঙ্গ না–করার শর্তে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। দীপকেরা জামিন পাওয়ার পরে বিবৃতি দিয়ে সিজেপির দাবি, ‘আরশোলারা কখনও মরে না। অবশেষে দীপকে, সৌরভ এবং রাঙ্কাকে ছাড়তে বাধ্য হলো দিল্লি পুলিশ।’ মুক্তি পাওয়ার পরেই নিজের ঠাকুমার শেষকৃত্যে যোগদান করার জন্য মহারাষ্ট্র উড়ে যান দীপকে৷ এরপরে এ দিন সৌরভ ও রাঙ্কা সাংবাদিক বৈঠক করে দেশের সব রাজ্যের মানুষকে একসঙ্গে পথে নামার ডাক দিয়েছেন৷
সিজেপি সূত্রের দাবি, গত জুলাইয়ে নিট ইস্যুতে আন্দোলনে দেশের জেন জি় প্রজন্ম সব শহরে পথে নামার পরেই আসল চাপটা টের পেয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। ইস্তফা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। ‘ভোটচুরি’র মতো ইস্যু সাধারণ মানুষকে আরও বেশি স্পর্শ করবে। কিন্তু এ বার দিল্লি পুলিশ আগেভাগে সিজেপি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বকে আটক করে বিক্ষোভ দমানোর কৌশল নিয়েছে। আবার যন্তর মন্তরের মতো রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র একটানা অবরুদ্ধ করে রাখলে তাতে সাধারণ মানুষের রুটি–রুজি উৎসবের মরশুমে ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বুঝে আন্দোলনের পন্থা বদলের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সৌরভ, রাঙ্কারা। তার সঙ্গেই রয়েছে আদালতের অবস্থান— দেশের শীর্ষ আদালত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অনুমতি দিলেও শান্তিভঙ্গ হতে পারে, এমন কোনও কর্মসূচির অনুমোদন দেবে না, সেটা এ দিন স্পষ্ট করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট৷
এই আবহে রবিবার দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠকে সৌরভ বলেন, ‘আমরা পিছু হটছি না৷ আমাদের লড়াই সবে শুরু হলো। জ্ঞানেশ কুমার ইস্তফা না–দেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন জারি থাকবে৷ সারা দেশে গৃহযুদ্ধ, জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দেশের নাগরিকদের সঙ্গেই যুদ্ধে জড়াচ্ছে সরকার। দেশবাসীকে আবেদন করছি, যে যেখানে আছেন সেখানেই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতে শুরু করুন৷’ রাঙ্কা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে বিঁধে অভিযোগ করেন, শনিবার দিল্লির বিভিন্ন প্রান্তে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচিকে ভন্ডুল করতে দিল্লি পুলিশ অত্যাচারের সব সীমা অতিক্রম করে গিয়েছে৷ তাঁর কথায়, ‘স্বাধীন ভারতে এমনটা কখনও হয়নি। ১৯৭৫–এর জরুরি অবস্থার সীমাও পেরিয়ে গিয়েছে বিজেপি সরকার।’ তাঁদের মোবাইল ফোন যে হ্যাক করা হচ্ছে না, তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়— প্রশ্ন তোলেন সৌরভ, রাঙ্কারা।
এ দিনের সাংবাদিক বৈঠকে আরও একটি কৌশলী পদক্ষেপ করেন সিজেপি নেতৃত্ব৷ শনিবার যন্তর মন্তর থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাংলাসাহিব গুরুদ্বারে ঢুকে দিল্লি পুলিশ সেখানে আশ্রয় নেওয়া আন্দোলনকারীদের মারধর করেছে, তাঁদের টেনেহিঁচড়ে বাসে করে তুলে নিয়ে গিয়েছে বলে অভিযোগ করেন সৌরভ৷ অমৃতসরের স্বর্ণ মন্দিরের অপারেশন ব্লু–স্টারের প্রসঙ্গ সরাসরি উল্লেখ না–করে সৌরভের দাবি, ‘আন্দোলনকারীদের ধরতে নিজেদের মাথা না–ঢেকেই জুতো পরে গুরুদ্বারে ঢুকেছিল পুলিশ। এতে শিখদের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করা হয়েছে৷’ শিখ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের আলাদা ভাবে সিইসি অপসারণ আন্দোলনে যোগ দেওয়ার ডাক দেন সৌরভরা৷
এ সবের মাঝে রবিবারও দিল্লির বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ দেখানোর চেষ্টা করেন সিজেপি এবং বাম ছাত্র সংগঠনগুলির সদস্যরা৷ রবিবার সকালে বিক্ষোভ প্রতিহত করতে কনৌট প্লেস, জনপথ, রাইসিনা রোড, খান মার্কেটের মতো এলাকায় ফ্ল্যাগ মার্চ করে দিল্লি পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী৷ দুপুরের দিকে কনৌট প্লেসের আউটার সার্কেলের কাছে বিক্ষোভ দেখান বাম ছাত্র সংগঠন আইসা–র সদস্য–সমর্থকরা৷ শনিবারের মতো বিক্ষোভকারীদের বাসে করে তুলে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁদের৷ এরই মাঝে দিল্লি পুলিশের জওয়ানদের সঙ্গে তীব্র বচসায় জড়িয়ে পড়েন সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাস৷
অভিযোগ, তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে দিল্লি পুলিশ৷ তাঁকে বাসে করে তুলে কোনও থানায় না–নিয়ে গিয়ে মাঝ রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও দলীয় সূত্রে অভিযোগ৷ দিল্লিতে প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়ার সামনে কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন এনএসইউআই-এর সমর্থকেরা বিক্ষোভ দেখান। সেখান থেকে অন্তত ৭০ জনকে আটক করে পুলিশ, তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও ছিলেন। কনৌট প্লেস থেকে আটক করা হয় অন্তত একশো জনকে। একটি ভিডিয়োয় (সত্যতা যাচাই করেনি ‘এই সময়’) একটি বার্গার জয়েন্টের সামনে থেকে এক যুবককে আটক করতে দেখা যায় পুলিশকে। ওই যুবক ক্রমাগত পুলিশকে বলতে থাকেন, তিনি কোনও আন্দোলনে যোগ দিতে আসেননি। তিনি শুধু ওই চত্বরে দাঁড়িয়েছিলেন। এরপরে অবশ্য পুলিশ তাঁকে ছেড়ে দেয়। দিল্লির রামকৃষ্ণ আশ্রম মার্গ মেট্রো স্টেশনের কাছে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে পুলিশের হাতে আটক হন আইসা সভানেত্রী নেহা বোরা৷ অভিযোগ, নেহা এবং তাঁর সতীর্থদের মোবাইল ফোন জোর করে ছিনিয়ে নিয়েছে দিল্লি পুলিশ৷
যদিও এই আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। তাঁর কথায়, ‘দেশজুড়ে যে প্রায় ন’কোটি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে সার প্রক্রিয়ায়, তার মধ্যে এক কোটি মানুষ পথে নামছেন না কেন? যে ককরোচ, আরশোলা বা ছারপোকা যাই বলুন না কেন, অথবা রাজনৈতিক নেতারা যাঁরা পথে নামছেন, তাঁদের ক’জনের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে বলুন তো? আসলে কোনও ইস্যু নেই, তাই এ সব করে হাওয়া গরম করতে চাইছেন কেউ কেউ।’