জীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় যারা সমাজ, সংস্কৃতি ও পরিবারের মজবুত ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন, সেই পরম শ্রদ্ধাভাজন প্রবীণদের সম্মান জানাতে দেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত হলো এক অনন্য ও সর্বজনীন ‘প্রবীণ উৎসব’।
‘প্রবীণরা পরিবারের বোঝা নন; তারা আমাদের ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী, ঐতিহ্যের প্রাণবন্ত ধারক এবং অভিজ্ঞতার আলোকবর্তিকা’ এই মূলসুরকে হৃদয়ে ধারণ করেই উদযাপিত হয় উৎসবটি।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) কুষ্টিয়ার কুমারখালী আবুল হোসেন তরুণ অডিটোরিয়ামে সকাল ১০টা থেকে ‘প্রিমিয়াম হোমস-আগামীর সময় প্রবীণ উৎসব ২০২৬’ শীর্ষক এই ব্যতিক্রমী মিলনমেলাটি দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়।
জাতীয় দৈনিক আগামীর সময়ের গোল্ড ক্লাব এবং কুমারখালী মিলনাগার ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই উৎসবে কুমারখালী উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার ষাটোর্ধ দুই শতাধিক প্রবীণরা সমবেত হন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সাথে সাথে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এরপর ঘটে এক দারুণ আবেগঘন মুহূর্ত—৯৯ বছর বয়সী প্রবীণ শ্রদ্ধেয় মকছেদ আলী আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের প্রথম এই প্রবীণ উৎসবের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
উদ্বোধনের পর কুমারখালী সংগীত বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে ও গোলাপ ফুল দিয়ে প্রবীণ ও আমন্ত্রিত অতিথিদের বরণ করে নেন। উৎসব কমিটির স্বেচ্ছাসেবকরা পরম শ্রদ্ধায় প্রতিটি নিবন্ধিত প্রবীণ নাগরিক ও অতিথিকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন। উত্তরীয় গ্রহণের সময় শতবর্ষী ও বয়োজ্যেষ্ঠদের চোখে-মুখে আনন্দের অশ্রু ও আত্মতৃপ্তি ফুটে ওঠে। পরবর্তীতে সংগীত বিদ্যালয়ের শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন হৃদয়স্পর্শী গান ‘ধন ধান্য পুষ্পে ভরা আমাদেরই বসুন্ধরা’।
সংগীতের সুর মিলিয়ে যাওয়ার পর মঞ্চে পরিবেশিত হয় হৃদয়ছোোঁয়া নাটিকা ‘নিজস্বী’। এরপর নবীন ও প্রবীণদের জীবনের মেলবন্ধন ফুটিয়ে ঐতিহ্যবাহী সুর ও ছন্দে পুঁথি পাঠ করেন মজিবর রহমান। প্রবীণের না-বলা আকুতি ও জীবনবোধ নিয়ে কবিতা ‘সুদের পুড়ানি’ আবৃত্তি করেন ফয়সাল আহমেদ ডালিম। প্রাক্তন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রহমান আজিজ নিজের রচিত কবিতা আবৃত্তি করে উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করেন।
শুধু মঞ্চ পরিবেশনাই নয়, মিলনায়তনের এক পাশে প্রবীণদের শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতি ফিরিয়ে দিতে আয়োজন করা হয়েছিল পুরনো দিনের সামগ্রীর বিশেষ প্রদর্শনী। সেখানে স্থান পায় পুরোনো দিনের তলোয়ার, এনালগ রেডিও, ট্রানজিস্টরসহ প্রবীণদের ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্মৃতিচিহ্ন।
সমাজ ও জাতীয় জীবনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ উৎসবে চার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়:
১. চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রদূত: বাংলাদেশের প্রথম ওপেন হার্ট সার্জন ও প্রখ্যাত কার্ডিয়াক সার্জন অধ্যাপক ডা. এস আর খানকে চিকিৎসাক্ষেত্রে ঐতিহাসিক অবদানের জন্য সম্মাননা জানান সম্পাদক মোস্তফা মামুন।
২. রত্নগর্ভা মা সম্মাননা: শত প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে সব সন্তানকে সমাজের উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠিত করা শতবর্ষী মা আমেনা খাতুনকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়। তাঁর অসুস্থতাজনিত অনুপস্থিতিতে স্মারক গ্রহণ করেন পুত্র কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ কাজী মনজুর কাদির। স্মারক তুলে দেন খ্যাতনামা চিকিৎসাবিদ ডা. এস আর খান।
৩. রত্নৌরস সম্মাননা: ১৮৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী কুমারখালী এম এন পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক মুহাঃ আব্দুল মুত্তালিবের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন দৈনিক আগামীর সময়-এর সম্পাদক মোস্তফা মামুন।
৪. মানবসেবায় আলোকবর্তিকা: দীর্ঘ ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দরিদ্র মানুষের বিনামূল্যে চোখের ছানি চিকিৎসা দিয়ে আসা ‘কুমারখালী অন্ধ কল্যাণ সমিতি’কে সম্মাননা জানানো হয়। প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের হাতে স্মারক তুলে দেন আগামীর সময় গোল্ড ক্লাবের পরিচালক সাইদুজ্জামান রওশন।
শ্রেণী-পেশার কোনো ভেদাভেদ ছাড়া আয়োজিত এই প্রবীণ উৎসবে স্মৃতিচারণ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক আমলা, শিক্ষক, কবি-সাহিত্যিক, গবেষক, সাংবাদিক ও ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি সমাজের প্রান্তিক সারি কৃষক, তাঁতি, শ্রমজীবী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও পিছিয়ে পড়া নৃগোষ্ঠীর প্রবীণ সদস্যরাও তাঁদের অনুভূতি প্রকাশ করেন।
স্বাগত বক্তব্যে কুমারখালীর ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কুমারখালী মিলনাগার ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সভাপতি নাভিন সরোয়ার বলেন, ‘প্রবীণরা আমাদের সমাজের অমূল্য সম্পদ। তাঁদের দীর্ঘজীবনের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি। উপজেলা প্রশাসন সর্বদা প্রবীণদের অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
কুমারখালী মিলনাগারের সাধারণ সম্পাদক মোহা. আব্বাস উদ্দিন বলেন, ‘প্রবীণরা আমাদের শেকড়। তাঁরা যেন শেষ বয়সে অবহেলা বা একাকীত্ব বোধ না করেন, সেদিকে খেয়াল রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।’
বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক ড. সরওয়ার মুর্শেদ রতন, সাবেক চেয়ারম্যান বাংলা বিভাগ এবং সাবেক ডিন কলা অনুষদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
দৈনিক আগামীর সময় গোল্ড ক্লাবের পরিচালক দন্ত্যস রওশন বলেন, ‘প্রবীণদের দায়িত্ব তরুণদের। আমাদের চাওয়া, তরুণরা প্রবীণদের রাখবে যত্নে ভালবাসায় সম্মানে। গোল্ড ক্লাব এমন একটি সমাজ দেখতে চায়।’
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতর জাতীয় কাউন্সিলের সদস্য মতিউর রহমান লাল্টু বলেন, ‘প্রবীণরা আমাদের সমাজ ও পরিবারের অভিভাবক এবং অভিজ্ঞতার অমূল্য ভাণ্ডার। তাদের জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশনা একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ সমাজ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি দৈনিক আগামীর সময়-এর সম্পাদক মোস্তফা মামুন তার বক্তব্যে বলেন, ‘প্রবীণদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন কোনো করুণা নয়, এটি তাদের প্রাপ্য অধিকার। জীবনের শেষভাগে এসে তাঁরা যেন একাকিত্বের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা আমাদের মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ব।’
প্রধান আলোচক বাংলাদেশে ওপেন হার্ট সার্জারির পথিকৃৎ ও কিংবদন্তি কার্ডিয়াক সার্জন অধ্যাপক ডা. এস আর খান বলেন, ‘শারীরিক অসুস্থতার চেয়ে প্রবীণরা মানসিক একাকীত্বে বেশি ভোগেন। নতুন প্রজন্মকে প্রবীণদের প্রতি আরও সংবেদনশীল হতে হবে, তাঁদের সময় দেওয়া ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে মতামত নেওয়া জরুরি।’
উৎসবে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি প্রবীণ নাগরিককে স্মারক উপহার ও উত্তরীয় প্রদান করা হয়। প্রবীণদের সুরক্ষায় দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় বিনামূল্যে ‘হেলথ ক্যাম্প’, যেখানে রক্ত পরীক্ষা, চক্ষু পরীক্ষা ও সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়। সকল প্রবীণ ও আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য মধ্যাহ্নভোজের আয়োজনও ছিল।
বিকেলের দ্বিতীয় পর্বে পুরোনো দিনের স্মৃতিকাতর গান ও লালনগীতির সুর ও উপহার বিতরণের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে এই অনন্য আয়োজনের।
উৎসবের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন কবি ও নাট্যকার লিটন আব্বাস এবং মীর ফরহাদ ফয়সাল রনি। অনুষ্ঠানে কো-স্পন্সর হিসেবে সহযোগিতা করে কুষ্টিয়া ডায়াবেটিক সমিতি (মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ডায়াবেটিস হাসপাতাল), ড. নাসের ফাউন্ডেশন, মধুস ফ্যাশন।
