ঢাক-ঢোল আর সুরের মূর্ছনা ছাড়া পূর্ণতা পায় না সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। পূজার প্রতিটি পর্বে তাই থাকে ঢাকের গর্জন ও সুরের আবহ।
আর এই প্রয়োজন থেকেই প্রতি বছরের মতো এবারও কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী ‘ঢাকের হাট’।
বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে শুরু হওয়া এই হাট চলবে দুই-তিন দিন পর্যন্ত। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দুই শতাধিক বাদকদল নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র নিয়ে হাটে হাজির হয়েছেন। পূজারীরাও ঢাকি ও যন্ত্রী দল নির্বাচন করতে ছুটে এসেছেন দূর-দূরান্ত থেকে।
বাদ্যযন্ত্রের রূপ ও সুরের মূর্ছনায় কটিয়াদী সদরের পুরান বাজার এলাকা এখন উৎসবমুখর। ঢাক, ঢোল, কাঁসি, সানাই, করতাল, খঞ্জনি ও বাঁশির শব্দে জমে উঠেছে হাটের পরিবেশ।
সুরের তালে তালে চলছে প্রতিযোগিতা-কে কার চেয়ে সেরাটা বাজাবেন এবং কার সুরে মুগ্ধ হয়ে পূজা আয়োজকেরা মণ্ডপে নিয়ে যাবেন। যন্ত্রী ও বাদকেরা নিজেদের সেরা সুর ও দক্ষতা উজার করে দিচ্ছেন চুক্তি পাওয়ার আশায়।
অন্যদিকে পূজা আয়োজকেরা ঘুরে ঘুরে বাজনা শুনছেন, দক্ষতা পরখ করছেন এবং দরদাম চালাচ্ছেন। যার বাজনা ও দরদামে মন গলছে, তার সঙ্গেই সম্পাদিত হচ্ছে আনুষ্ঠানিক চুক্তি।
নাম ‘ঢাকের হাট’ হলেও এখানে কোনো বাদ্যযন্ত্র কেনাবেচা হয় না। এখানে যারা আসেন সবাই সঙ্গে করে আনা বাদ্যযন্ত্র বাজান। বাদক ও যন্ত্রীরা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে পূজারীদের মন জয় করার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করেন।
তাদের বাজনা শুনে, দক্ষতা যাচাই করে পূজা আয়োজকেরা মন্ডপে বাজানোর জন্য তাদের ভাড়া করে নেন। সম্মানি নির্ধারিত হয় দল বা সদস্যসংখ্যা, বাদ্যযন্ত্র আর দক্ষতার ওপর। সাধারণত ঢাকের দলের প্রতিজন পনের থেকে বিশ হাজার এবং পুরো যন্ত্রীদল নিতে গুনতে হয় লাখ টাকার ওপরে।
ঢাকীদের জনপ্রতি পারিশ্রমিক ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা হয়ে থাকে। সমগ্র যন্ত্রীদলের মোট খরচ ঢাক, কাঁসর, সানাই ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রসহ পুরো দলটি নিতে সর্বমোট এক লাখ টাকার ওপরে গুনতে হয়।
এই হাট এখন আর শুধুই বাদ্যযন্ত্রের আয়োজন নয়, বরং ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এবারের হাটে উপস্থিত হয়েছেন বিক্রমপুর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বাদকদল। ঢাক-ঢোলের পাশাপাশি রয়েছে বাঁশি, সানাই, করতাল, খঞ্জনি, মন্দিরা, ঝনঝনিসহ নানা ধরনের দেশীয় বাদ্যযন্ত্র। এসব বাদ্যযন্ত্রের সমাহারে হাটটি হয়ে উঠেছে বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও সংগীতের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলা।
বিক্রমপুরের ঢাকি পরিমল দাস বলেন, “ফোনে অনেকে যোগাযোগ করেছিলেন যাইনি। এখানে না আসলে মন মানে না। অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। এর আনন্দটাই আলাদা। আমি ৩০ হাজার টাকা চেয়েছি। দরাদরি চলছে, কমবেশি করে চলে যাব।”
দশ জনের একটি দল নিয়ে কুমিল্লা থেকে এসেছেন কাজল মণিঋষি। তাদের রয়েছে ঢাকসহ আধুনিক বাদ্যযন্ত্র। চুক্তি হাকাচ্ছেন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। অনেকেই দরদাম করছেন।
কাজল মণিঋষি বলেন, “লাখের কম হলে বাজাতে যাবো না।”
গাজীপুরের টঙ্গী থেকে আসা শ্যামল পণ্ডিত বলেন, “এবারই প্রথম এই হাটে এসে মুগ্ধ হয়েছি। এখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাদক দল এসেছে। সেখান থেকে বিক্রমপুরের পাঁচজনের একটি বাদক দল নিয়েছি। চুক্তি হয়েছে ৭৮ হাজার টাকায়।”
স্থানীয় বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান জানান, এই ঢাকের হাট শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নয়, ভিড় করছেন অন্য ধর্মের লোকজনও। তাদের কাছে এই হাট শুধুই বাদ্যযন্ত্রের আয়োজন নয়, এটা এখন ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির অংশ। এই হাট এখন আর শুধু হিন্দুদের নেই, সব ধর্মের লোকজনের হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, ঢাকঢোল ও সুরের মূর্ছনা শুনতে এখানে চলে আসেন সবাই। হাটটি যেন এক উৎসবে পরিণত হয়েছে। সব মিলিয়ে এটি স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘শ্রীমা সংঘ’ হাটের তত্ত্বাবধান করে থাকে। ওই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জীবন কুমার সাহা জানান, ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায়ের সময় শুরু হয় কটিয়াদীর এই ঢাকের হাট। রাজপ্রাসাদে পূজার জন্য সেরা ঢাকির সন্ধানে বার্তা পাঠানো হয়েছিল বিক্রমপুরে। সেখান থেকে বহু ঢাকি নৌপথে কটিয়াদীতে আসেন। রাজা নিজে তাদের বাজনা শুনে সেরা দল বেছে নেন। সেই থেকেই শুরু হয় এই ঐতিহ্যের যাত্রা।
তিনি বলেন, “হাটে আসা বাদকদের থাকা-খাওয়া, নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করছে স্থানীয় পূজা উদযাপন পরিষদ। যদি কোন বাদক শিল্পী ভাড়ায় না যেতে পারেন, তাহলে তাদের বাড়িতে ফেরার সব ব্যবস্থা সংগঠনের পক্ষ থেকে করা হয়।”
