সাকিবুল হাছান
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০২২ এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS) অনুযায়ী দেশে ৫–১৭ বছর বয়সী ৩৫ লাখের বেশি শিশু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিল। তাদের মধ্যে ১৭ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি শিশু শিশুশ্রমে এবং ১০ লাখ ৬৮ হাজারের বেশি শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিয়োজিত ছিল। ২০১৩ সালের তুলনায় ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের হার ৩.২ শতাংশ থেকে কমে ২০২২ সালে ২.৭ শতাংশে দাঁড়ালেও, শিশুশ্রমের মোট সংখ্যা বেড়েছে। কাজের পাশাপাশি শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক শিশুর চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
আজিমপুরের সেকশন এলাকা থেকে গুলিস্তানগামী লেগুনার পেছনে ঝুলে কন্ডাক্টরের কাজ করে ১১ বছর বয়সী রাহাত। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ৯–১০ ঘণ্টা কাজ করে সে, আয় করে দিনে ৩০০–৩৫০ টাকা। চলন্ত লেগুনার বাইরে ঝুলে ভাড়া তোলার কাজটি তার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
একসময় স্কুলে পড়ত রাহাত। কিন্তু অসুস্থ বাবার কারণে পরিবারের আর্থিক সংকট মেটাতে তাকে পড়াশোনা ছেড়ে কাজে নামতে হয়েছে। অন্য শিশুদের মতো তারও শিক্ষিত হওয়ার স্বপ্ন রয়েছে। রাহাত বলে, “আমিও পড়াশোনা করতে চাই, শিক্ষিত হতে চাই। কিন্তু আমার বাবা অসুস্থ, পরিবারে অভাব। যার কারণে আমাকে এই পথ বেছে নিতে হচ্ছে।”
একটি শিশুর এই দিনযাপনকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ভাবার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) National Child Labour Survey 2022 অনুযায়ী, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৩৫ লাখ ৩৬ হাজার শিশু কাজ করে। তাদের মধ্যে ১৭ লাখ ৭৬ হাজার শিশু শিশুশ্রমে যুক্ত এবং ১০ লাখ ৬৮ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিয়োজিত।
অর্থাৎ, দেশের ৫–১৭ বছর বয়সী প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে প্রায় ৯ জন কোনো না কোনো অর্থনৈতিক কাজে যুক্ত; আর প্রতি ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ৪ জন শিশুশ্রমের আওতায় পড়ে। BBS-এর হিসাবে ২০২২ সালে শিশুশ্রমের হার ছিল ৪.৪ শতাংশ। ২০১৩ সালে এই হার ছিল ৪.৩ শতাংশ। একই সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের হার ৩.২ শতাংশ থেকে কমে ২.৭ শতাংশ হয়েছে।
২০২২ সালের হিসাবে কাজ করা শিশুদের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার কৃষিতে, ১১ লাখ ৯২ হাজার শিল্পে এবং ১২ লাখ ৭০ হাজার সেবা খাতে যুক্ত ছিল। অর্থাৎ শিশুশ্রম শুধু কারখানা বা নির্মাণস্থলের সমস্যা নয়। দোকান, ওয়ার্কশপ, পরিবহন, কৃষি, খাবারের দোকান, বিভিন্ন সেবা এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির নানা স্তরে শিশুরা কাজ করছে।
BBS-এর আরেকটি জরিপে সরকার ঘোষিত ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোর পাঁচটি—শুকনা মাছ উৎপাদন, চামড়ার জুতা তৈরি, ওয়েল্ডিং বার্নার মেরামত, অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ এবং অনানুষ্ঠানিক/স্থানীয় টেইলারিং ও পোশাক খাত—নিয়ে আলাদাভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এসব খাতে ৪০,৫২৫টি প্রতিষ্ঠানে ৫–১৭ বছর বয়সী ৩৮,০০৮ শিশু কাজ করছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিশু পাওয়া যায় অটোমোবাইল ওয়ার্কশপে।
আজিমপুর ও গুলিস্তান এলাকায় শিশুদের শ্রমের বাস্তবতা সামনে আসে কর্মস্থলগুলোতে গেলেই। আজিমপুরের একটি হোটেলে কাজ করতে দেখা যায় নয় বছর বয়সী রাফিকে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হোটেলে কাজ করে সে। গুলিস্তানের বিভিন্ন দোকানেও দেখা যায়, অল্প বয়সী শিশুরা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করছে।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজে ব্যস্ত থাকায় এসব শিশুর নিয়মিত স্কুলে যাওয়া ও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। তাদের কারও কারও ক্ষেত্রে পরিবারের ভরণপোষণে অবদান রাখার চাপও রয়েছে। কথা বলতে গিয়ে এক শিশু জানায়, পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে অল্প বয়সেই তাকে উপার্জনের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে; পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার মতো সহায়তাও তারা পাচ্ছে না বলে তার বক্তব্য। এসব শিশুর অভিজ্ঞতা দেখায়, শিশুশ্রম কেবল কর্মস্থলে শিশুদের উপস্থিতির বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি এবং পরিবারের আর্থিক অনিশ্চয়তা।
BBS-এর তথ্য অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে থাকা শিশুদের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার কখনোই স্কুলে যায়নি। আবার সব শিশুই যে কাজ শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে স্কুল ছেড়ে দেয়, তা নয়। কেউ সকালে স্কুল করে বিকেলে কাজ করে, কেউ রাতে কাজ করে, আবার কেউ ধীরে ধীরে স্কুল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
ঢাকার মগবাজারের একটি ভাতের হোটেলে কাজ করে ১২ বছর বয়সী রতন। যে বয়সে তার স্কুলে যাওয়ার, পড়াশোনা করার, খেলাধুলায় মেতে থাকার আর আনন্দে বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সে তাকে সময় কাটাতে হচ্ছে হোটেলের কাজের ব্যস্ততায়। শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দের বদলে জীবনের এত অল্প বয়সেই তাকে মুখোমুখি হতে হচ্ছে কঠিন বাস্তবতার।
রতনের মতো কত শিশু যে দারিদ্র্য, পারিবারিক সংকট কিংবা সহায়তার অভাবে অল্প বয়সেই শ্রমে যুক্ত হচ্ছে, তার পূর্ণ হিসাব আমাদের সামনে নেই। যত্ন ও সুযোগ পেলে যে শিশুরা নিজেদের সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারত, তাদের অনেকেরই শৈশব আটকে যাচ্ছে জীবিকার তাগিদে। ফুল হয়ে ফোটার আগেই যেন অনেক শিশুর স্বপ্ন ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
এই অভিজ্ঞতা শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়। শিশুর কাজ করার পেছনে পরিবারের অর্থনৈতিক চাপ, শিক্ষার খরচ, স্কুলে যাতায়াত, পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যের অসুস্থতা, ঋণ, অভিবাসন কিংবা সামাজিক বাস্তবতা—একাধিক কারণ কাজ করতে পারে।
ইউনিসেফ-এর গবেষণাতেও শিশুশ্রম পরিমাপের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে: বিভিন্ন জরিপে শিশুশ্রমের সংজ্ঞা ও পরিমাপের পদ্ধতি এক নয়। ন্যাশনাল চাইল্ড লেবার সার্ভে, মূলত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বিবেচনায় নেয়, অন্যদিকে এমআইসিএস-এর মতো জরিপে গৃহস্থালির কাজও বিবেচনায় আসতে পারে। ফলে বিভিন্ন উৎসের সংখ্যাকে সরাসরি একে অপরের সঙ্গে তুলনা করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
BBS-এর জরিপ অনুযায়ী, নির্বাচিত পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ খাতে কাজ করা শিশুদের মধ্যে ১৯.১ শতাংশ ছেলে এবং ৭.৭ শতাংশ মেয়ে ভারী জিনিস বহন, ঠেলা বা টানার মতো কাজে যুক্ত ছিল। এসব খাতে কর্মরত শিশুদের ৬৪.৩ শতাংশ শহর এলাকায় এবং ৩৫.৭ শতাংশ গ্রামে বাস করত।
মজুরির বিনিময়ে কতটা শৈশব?
বিবিএস-এর জরিপে নির্বাচিত পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ খাতে কর্মরত শিশুদের নিয়োগ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ৫১.৪ শতাংশ মাসে ৫,০০০ টাকা বা তার কম মজুরি দিত বলে পাওয়া গেছে। ২৮.৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ১০,০০০ টাকা বা তার কম মজুরি দিত।
কিন্তু শিশুর আয়কে শুধু পরিবারের অতিরিক্ত আয় হিসেবে দেখলে সমস্যার একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। কারণ শিশুর কাজের বিনিময়ে পরিবার হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে কিছু টাকা পায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেই শিশুর শিক্ষা, দক্ষতা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ক্ষতি হতে পারে।
আইএলও বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গুঞ্জন দাল্লাকোটির বক্তব্য অনুযায়ী, শিশুশ্রম দূর করতে আইন কার্যকর করার পাশাপাশি সরকার, নিয়োগকর্তা, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
আইন আছে, কিন্তু নজরদারি কতটা?
বাংলাদেশে শিশুশ্রম ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধে আইন ও সরকারি কর্মসূচি রয়েছে। সরকার একাধিক খাতকে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। BBS-এর সাম্প্রতিক জরিপে এমন ৪৩টি ঝুঁকিপূর্ণ খাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়-কাজের জায়গায় নিয়মিত নজরদারি হচ্ছে কতটা?
শিশুশ্রম প্রতিরোধে সরকারি তৎপরতার বিষয়ে প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম দপ্তরের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ওই বছর ৩৪,০০৮টি কর্মস্থল পরিদর্শন করে ৩,৬৯৭টি শিশুশ্রম-সংক্রান্ত লঙ্ঘন শনাক্ত করা হয়। তবে সদরঘাট, মগবাজার ও আজিমপুর এলাকায় শিশু শ্রমিক শনাক্ত, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শিশুদের পুনর্বাসনের নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান এই প্রতিবেদনের জন্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
শুধু কাজ থেকে সরালেই কি সমাধান?
শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সহজ সমাধান মনে হতে পারে-শিশুকে কর্মস্থল থেকে সরিয়ে দেওয়া। কিন্তু এরপর?
যদি পরিবারের আয় কমে যায়, শিশুটি যদি আবার অন্য কোথাও কাজে যায়? যদি স্কুলে ফেরার খরচ থাকে? যদি তার বয়স ও শিক্ষাগত অবস্থার কারণে নিয়মিত শ্রেণিতে ফিরে যাওয়া কঠিন হয়? তাই সমাধানটি শুধু “কাজ বন্ধ” নয়; শিশুকে নিরাপদে শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করাও জরুরি।
UNICEF-এর সাম্প্রতিক বাংলাদেশ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের MICS-এ ৫–১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রমে যুক্ত হওয়ার হার ৯.২ শতাংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে UNICEF নিজেই সতর্ক করেছে যে বিভিন্ন উৎসে সংজ্ঞা ও পদ্ধতির পার্থক্যের কারণে তথ্য তুলনায় সতর্কতা প্রয়োজন।
এ কারণেই জাতীয় পর্যায়ের NCLS-এর ৪.৪ শতাংশ এবং MICS-এর ৯.২ শতাংশকে পাশাপাশি রেখে “একটি বেড়েছে, অন্যটি কমেছে”—এমন সরল সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। বরং দুটি জরিপের পদ্ধতিগত পার্থক্য পাঠকের সামনে পরিষ্কার করাই সাংবাদিকতার দায়িত্ব।
বাংলাদেশে শিশুশ্রমের সংখ্যা নিয়ে সরকারি জরিপ আছে, ঝুঁকিপূর্ণ খাতের তালিকা আছে, আইন আছে, প্রকল্প আছে। তবু ২০২২ সালের সরকারি হিসাবেই ১৭ লাখ ৭৬ হাজার শিশু শিশুশ্রমে এবং ১০ লাখ ৬৮ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে ছিল।
তাই প্রশ্নটি শুধু কত শিশু কাজ করছে, তা নয়।
প্রশ্ন হলো-যে শিশুর আজকের শ্রম একটি পরিবারের আজকের খাবার জোগায়, তার আগামী দিনের শিক্ষা, নিরাপত্তা ও স্বপ্নের দায়িত্ব কে নেবে?
“আমিও পড়াশোনা করতে চাই, শিক্ষিত হতে চাই। কিন্তু আমার বাবা অসুস্থ, পরিবারে অভাব। যার কারণে আমাকে এই পথ বেছে নিতে হচ্ছে।”
কথা শেষ করে রাহাত আবার লেগুনার কাজে ফিরে যায়। তার চোখে শিক্ষিত হওয়ার স্বপ্ন, অথচ বাস্তবতা তাকে আটকে রেখেছে জীবিকার কঠিন চাপে। রাহাতের মতো শিশুদের জন্য প্রশ্নটি তাই শুধু কাজ থেকে মুক্তির নয়—তাদের যেন আবার পড়াশোনায় ফেরার এবং নিরাপদ শৈশব ফিরে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, সেই দায়িত্ব কার?
