বর্তমানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকট ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যার মধ্যে জ্বালানি সংকট অন্যতম। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় নীতিগত জটিলতার কারণে আমরা এতদিন সৌরবিদ্যুৎ থেকে প্রত্যাশিত সুফল নিতে পারিনি।
বাংলাদেশ এখন সবুজ কারখানা স্থাপনে বিশ্বে অগ্রগণ্য অবস্থানে রয়েছে। দেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৩০০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এ অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে শীর্ষস্থানীয় ও সর্বোচ্চ স্কোরপ্রাপ্ত প্লাটিনাম সনদধারী কারখানার সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম এগিয়ে থাকা দেশ। হ্যামস গ্রুপের চারটি কারখানার মধ্যে তিনটিই লিড সনদপ্রাপ্ত। এর মধ্যে হ্যামস গার্মেন্টস (নিট কম্পোজিট) ১১০ নম্বরের মধ্যে ১০৮ পেয়ে শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বেও সর্বোচ্চ স্কোর নিয়ে প্রতিনিধিত্ব করছে।
আমাদের ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের তাগিদ এবং আগামী প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা এ পথে এগিয়েছি। সবুজ কারখানা মানে শুধু গাছপালা দিয়ে পরিবেশ সাজানো নয়; মূল বিষয় হলো জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো এবং কার্বন নিঃসরণ কমানো। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে পানি পুনর্ব্যবহারের ওপরও আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।
যত বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার হবে, কার্বন নিঃসরণও তত বাড়বে। এ বাস্তবতায় বিভিন্ন অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা সাহসের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আশপাশের দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আমরা আধুনিক যন্ত্রপাতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়িয়ে নিজেদের সক্ষমতা ও অবদান ধরে রাখার চেষ্টা করছি।
বর্তমানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকট ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যার মধ্যে জ্বালানি সংকট অন্যতম। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় নীতিগত জটিলতার কারণে আমরা এতদিন সৌরবিদ্যুৎ থেকে প্রত্যাশিত সুফল নিতে পারিনি। তবে সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থার ওপর থেকে ভ্যাট ও কর প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের জন্য বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। ইডকলের হিসাব অনুযায়ী দেশে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। আমি মনে করি, এ করছাড়ের ফলে আমরা অন্তত সেই লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছতে পারব। একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে, আগামী দিনে আরএমজি ও টেক্সটাইল খাতকে টেকসই করতে হলে আমাদের জ্বালানির সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর আরো বেশি মনোযোগ দিতে হবে।
বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোর আলোচনা ও বাস্তবতা থেকে মনে হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশগুলো অর্থায়নে অনিচ্ছুক। ফলে আন্তর্জাতিক অনুদানের ওপর নির্ভর করে দেশের জলবায়ু মোকাবেলার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা যথেষ্ট হবে না। অনুদানের অপেক্ষায় না থেকে বিকল্প অর্থায়ন ও বিনিয়োগের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
ইন্ডাস্ট্রি লিডার হিসেবে আমরা কারখানা পর্যায়ে জ্বালানি সাশ্রয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছি। পুরনো প্রচলিত মোটরের পরিবর্তে আধুনিক ও জ্বালানি সাশ্রয়ী মোটর ব্যবহার শুরু করেছি। একই সঙ্গে কারখানায় বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহারসহ ছোট ছোট নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের চেষ্টা করছি। বর্তমানে বিভিন্ন কারণে দেশের তৈরি পোশাক খাতের সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে আসছে। জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি ব্যাংকের উচ্চ সুদহার শিল্পকে টেকসই রাখার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া এনবিআর, কাস্টমস ও বন্ড অফিস-সংক্রান্ত জটিলতাও আমাদের প্রতিদিনের বড় চ্যালেঞ্জ।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শ্রম আইনে যে সংশোধনী আনা হয়েছে, তা আমাদের সক্ষমতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এ সংশোধনী তৈরি পোশাক শিল্পকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে এবং এতে খাতটির প্রায় ৫০ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ ধীরে ধীরে সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকারকে বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে।
সবশেষে বলব, আগামী দিনের তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত যেন নিজেদের অবস্থান ধরে রেখে আরো ভালোভাবে এগিয়ে যেতে পারে—এ আশাবাদ ব্যক্ত করছি।
