দুর্গাপূজা, মেলা, কনসার্ট কিংবা ফুটবল ম্যাচ; বড় কোনো আয়োজন মানেই দীর্ঘ সময় বাইরে থাকা, মানুষের ভিড় আর অনেক ক্ষেত্রে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে চলাফেরা। এমন পরিস্থিতিতে শুধু দর্শক বা অংশগ্রহণকারী নয়, স্বেচ্ছাসেবক ও আয়োজকদেরও তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সঠিক প্রস্তুতি ও সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হলে বড় জনসমাগমে তাপজনিত অসুস্থতার বেশিরভাগই প্রতিরোধ ও ঘটনাস্থলেই চিকিৎসা করা সম্ভব।
বড় জমায়েতে কেন বাড়ে গরমের ঝুঁকি?
খেলাধুলা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মতো বড় জমায়েতে দীর্ঘ সময় রোদ বা গরমের মধ্যে থাকতে হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় ঘন ভিড়, নিরাপদ পানির সীমিত সুযোগ, দীর্ঘ সময় যাতায়াতের চাপ এবং অনেকের স্থানীয় আবহাওয়ার সঙ্গে অপরিচিতি।
সব মিলিয়ে এমন পরিবেশ শরীরের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। একই সময়ে কোনো এলাকায় বড় আয়োজন হলে স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা ও অ্যাম্বুলেন্সের ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন এক পর্যালোচনায় ১৯৮০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে বড় জনসমাগমে প্রায় ৫ লাখ চিকিৎসা সংক্রান্ত ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২২ হাজারের বেশি ঘটনা ছিল তাপজনিত অসুস্থতার।
তবে, গবেষণাগুলো একইসঙ্গে দেখিয়েছে, কোনো আয়োজনের ঘটনাস্থলে চিকিৎসাব্যবস্থা ভালোভাবে প্রস্তুত থাকলে ৯০ শতাংশের বেশি রোগীকে সেখানেই চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। এতে স্থানীয় হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্সের ওপর অতিরিক্ত চাপও অনেকটা কমানো যায়
শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতা যথেষ্ট নয়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হেলথ ইমার্জেন্সিজ প্রোগ্রামের নির্বাহী পরিচালক ড. চিকওয়ে ইহেকওয়াজু বলেন, “চরম গরম বড় জনসমাগমে স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও আয়োজনের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি তৈরি করছে। এটিকে শুধু পরিবেশগত ঝুঁকি হিসেবে দেখলে হবে না; আয়োজনের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবেও বিষয়টিকে বিবেচনা করতে হবে।”
তার মতে, “সুরক্ষা শুধু ব্যক্তির আচরণের ওপর নির্ভর করতে পারে না। নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন, প্রস্তুতি ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ক্ষতি কমানো এবং উষ্ণতর বিশ্বে আরো নিরাপদ ও সহনশীলভাবে আয়োজন পরিচালনা করা সম্ভব।” অর্থাৎ, গরমে নিজের সঙ্গে পানি রাখা বা রোদ এড়িয়ে চলার মতো ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি আয়োজকদেরও আগে থেকে তাপজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।
বাড়ছে তাপজনিত মৃত্যুও
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অধিকাংশ স্থলভাগে ১৯৫০-এর দশকের পর থেকে তীব্র গরম ও তাপপ্রবাহ আরো ঘন ঘন এবং বেশি তীব্র হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্যানেল। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা যত বাড়বে, তীব্র গরমের ঘটনা আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পূজা, মেলা বা কনসার্টে কী প্রস্তুতি দরকার?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বড় আয়োজনের দিন তাপমাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছানোর অপেক্ষা না করে আগেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। শুধু একটি ব্যবস্থা নয়, একাধিক পদক্ষেপ একসঙ্গে কার্যকর করাই সবচেয়ে বেশি কাজে দেয়।
এর মধ্যে রয়েছে—
* নিরাপদ পানি ও টয়লেট: দর্শক ও অংশগ্রহণকারীদের সহজে পান করার উপযোগী নিরাপদ পানি এবং পর্যাপ্ত টয়লেটের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
* শরীর ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা: আয়োজনস্থলে এমন জায়গা রাখতে হবে, যেখানে মানুষ কিছু সময়ের জন্য গরম থেকে দূরে গিয়ে শরীর ঠান্ডা করতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য কুলিং ব্যবস্থাও রাখতে হবে।
* সময়সূচিতে পরিবর্তন: তীব্র গরমের সময় এড়িয়ে আয়োজনের সময়সূচি নির্ধারণ বা প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা যেতে পারে।
ভিড় নিয়ন্ত্রণ: এক জায়গায় অতিরিক্ত মানুষের চাপ যেন তৈরি না হয়, সে জন্য প্রবেশ, বের হওয়া ও চলাচলের পথ যথাযথভাবে পরিচালনা করতে হবে।
* কর্মীদের সুরক্ষা: আয়োজনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদেরও গরম থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। কারণ দীর্ঘ সময় কাজ করতে গিয়ে তারাও তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন
* সচেতনতামূলক প্রচার: কখন পানি খাবেন, কোথায় ঠান্ডা জায়গায় যেতে হবে এবং তাপজনিত অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে কী করতে হবে—এসব তথ্য দর্শক ও অংশগ্রহণকারীদের জানানো জরুরি।
* তাৎক্ষণিক নজরদারি: আয়োজন চলাকালে তাপজনিত অসুস্থতার ঘটনা বা ঝুঁকির পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
* ঘটনাস্থলেই চিকিৎসা: প্রশিক্ষিত চিকিৎসাকর্মী ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীসহ প্রস্তুত চিকিৎসাব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে অসুস্থ ব্যক্তিকে দ্রুত সেবা দেওয়া যায়।
আয়োজকদের পরিকল্পনাতেও থাকতে হবে গরমের হিসাব
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায় শুধু দর্শক বা অংশগ্রহণকারীর বিষয়টি নয়, পুরো আয়োজনকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
আয়োজনস্থলের নকশা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ, পানি ও স্যানিটেশন, যাতায়াত, নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং কর্মীদের ব্যবস্থাপনা; সবকিছুই মানুষের নিরাপদ পানি, ঠান্ডা জায়গা ও দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগকে প্রভাবিত করে।
তাই পূজা, মেলা, কনসার্ট, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা কিংবা অন্য কোনো বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে গরমের ঝুঁকি শুধু চিকিৎসাবিষয়ক বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। আয়োজনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তাপজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে।
গরমের মধ্যে দর্শকেরও কিছু সতর্কতা জরুরি
আয়োজকদের প্রস্তুতির পাশাপাশি দর্শক ও অংশগ্রহণকারীদেরও নিজের শরীরের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। দীর্ঘ সময় রোদে বা গরমে থাকার বদলে সুযোগ পেলে ছায়া বা তুলনামূলক ঠান্ডা জায়গায় বিশ্রাম নেওয়া, নিয়মিত পানি পান করা এবং শরীর খারাপ লাগলে বিষয়টি উপেক্ষা না করাই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে মাথা ঘোরা, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা তাপজনিত অসুস্থতার কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত আয়োজকদের চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হবে।
বড় জমায়েতে নিরাপত্তা তাই শুধু ভিড় সামলানো বা জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয় নয়। গরমের সময় দর্শকের শরীরকে নিরাপদ রাখার প্রস্তুতিও আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন নির্দেশনায় সেই বিষয়টিই গুরুত্ব পেয়েছে।
সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
