ভারত-চিন সীমান্ত বিবাদে স্থাননাম পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হওয়া অপ্রত্যাশিত নয়। দীর্ঘ দিনের অমীমাংসিত সীমান্ত প্রশ্নে দুই দেশই নিজেদের ভূখণ্ডগত দাবি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু ভারতের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে গিয়ে চিন যে-ভাষায় আপত্তি জানায়, তা কতটা যুক্তিসংগত সেই প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কোনও দেশ ‘নিজের ভূখণ্ড’ বলে বিবেচিত অঞ্চলের জন্য নাম নির্ধারণ করলে তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য দেশের বিরুদ্ধে উসকানি বলে ব্যাখ্যা করা যায় না।
ভারতের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযে প্রযোজ্য। দেশের প্রশাসনিক কাঠামো, সরকারি মানচিত্র এবং ভৌগোলিক নামের মাধ্যমে নিজের অবস্থান প্রকাশ করার অধিকার ভারতের রয়েছে। সেই অধিকারকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানোর আগে সীমান্ত বিবাদের ইতিহাস, দুই দেশের অবস্থান এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা কর প্রয়োজন। চিনের আপত্তি অনুযায়ী, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক লাদাখের ২৮টি স্থানের জন্য নাম ঘোষণা করেছে। বেজিংয়ের দাবি, কয়েকটি স্থান এমন এলাকায় অবস্থিত, যা চিনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে তারা মনে করে। একই সঙ্গে অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন স্থানের নাম চিনের নিজস্ব নামকরণ অনুযায় স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিও দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছে বেজিং।
ভারতের নামকরণের কারণে চিনের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীন কোনও অঞ্চলের বাস্তব পরিস্থিতি রাতারাতি পরিবর্তিত হয় না।
ভারত অবশ্য অরুণাচল প্রদেশকে নিজের ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’ বলে মনে করে এবং চিনের এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের নামকরণকে একতরফা পদক্ষেপ বলে সমালোচনা করার সময় চিনের নিজের নামকরণ নীতির দিকটিও বিচার কর জরুরি। কারণ, বেজিংও তার দাবিকৃত অঞ্চলগুলির জন্য নাম নির্ধারণ করে এবং সেই নাম সরকারি নথি ও মানচিত্রে ব্যবহার করে। ফলে নামকরণের প্রশ্নে এক দেশের পদক্ষেপকে অগ্রহণযোগ্য এবং অন্য দেশের অনুরূপ পদক্ষেপকে স্বাভাবিক বলে বিবেকনা করা হলে তা দ্বৈর মানদন্ডের জন্ম দেয়। মানচিত্রে কোনও স্থানের নাম অন্তর্ভুক্ত করলেই সেই অঞ্চলের উপর সার্বভৌমত্বের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয় না। কিন্তু এই যুক্তি ভারতের ক্ষেত্রেই শুধু প্রয়োগ করা যায় না, চিনের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। চিন যদি অরুণাচল প্রদেশের কোনও স্থানের নাম পরিবর্তন করে কিংবা সেই নামকে সরকারি মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করে, তাতে ভারতের ভূখণ্ডগত অবস্থান বদলে যায় না।
একইভাবে ভারতের নামকরণের কারণে চিনের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীন কোনও অঞ্চলের বাস্তব পরিস্থিতি রাতারাতি পরিবর্তিত হয় না। অতএব, নামকরণকে কেন্দ্র করে ভারতের বিরুদ্ধে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলার আগে বেজিংয়ের বোঝা উচিত যে, তার নিজের নামকরণও ভারতের সম্মতি অর্জন করেনি। একতরফা নামকরণকে সীমান্তের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসাবে দেখার কোনও যুক্তি নেই। সে কারণে স্থাননামকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক অবস্থান জোরদার করার পরিবর্তে ভারত ও চিনের উচিত কুটনৈতিক সায়ম, পারস্পরিক শ্রাদ্ধা এবং ধারাবাহিক আলোচনার পথে এগিয়ে যাওয়া।
