শীতের আগমনী হাওয়ায় রাজধানীর বাজারে বাড়তে শুরু করেছে নতুন সবজির সরবরাহ, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দামে। পাশাপাশি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় কমছে ডিমের দাম। এতে দীর্ঘদিনের ঊর্ধ্বমুখী বাজারদরে চাপে থাকা ক্রেতারা কিছুটা স্বস্তি পেলেও চাল, ডাল, তেল ও আটার বাড়তি দাম সেই স্বস্তিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে কয়েকটি পণ্যের দাম কমলেও সামগ্রিকভাবে সংসারের ব্যয় সামলাতে এখনো হিমশিম খেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর, নিউমার্কেট ও হাজারীবাগের বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাজার শীতকালীন সবজি আসতে শুরু করায় দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছে। তবে বাড়তি রয়েছে চাল, ডাল, তেল ও আটাসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম।
বাজারে মানভেদে এখন প্রতিকেজি বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৭০ থাকে ৯০টাকা। করলা বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা, গাজর (দেশি) ১০০ থেকে ১২০টাকা, চিচিঙ্গা ৬০ টাকা, বরবটি ৭০ থেকে ৮০ টাকা, ঢেঁড়স ৬০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৪০ টাকা, কাঁচা পেঁপে ৩০ টাকা, পটল ৭০ টাকা, কচুরমুখী ৬০ টাকা, টমেটো মানভেদে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, কাঁকরোল ৭০ থেকে ৮০ টাকা, ধুন্দুল ৬০ টাকা, কাঁচামরিচের কেজি ১৫০ টাকা, প্রতিটি পিস জালি কুমড়া ও লাউ আকারভেদে ৬০ থেকে ৮০ টাকা, মানভেদে মুলা ৭০ টাকা, শীতের আগাম শিম ১২০ থেকে ১৪০ টাকা এবং আকার অনুযায়ী ফুলকপি ও বাঁধাকপি গড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ পিস ধরে।
কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে মুরগি ও ডিমের বাজারে
সরবরাহ ভালো থাকায় গত সপ্তাহের তুলনায় এ সপ্তাহে ব্রয়লার মুরগির দাম এ সপ্তাহে বাজারেভেদে ৫ থেকে ১০ টাকা কমেছে। এখন বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ছিল ১৯০ টাকা। বাজারে এখন প্রতি কেজি সোনালি মুরগি ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা। এবং গরুর মাংস ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১২০০ টাকায়।
মুরগির পাশাপাশি এ সপ্তাহে ডিমের দামও কিছুটা কমেছে। গত সপ্তাহে বাজারে ফার্মের মুরগির লাল ডিমের ডজন ১৫০ টাকা, এ সপ্তাহে ১০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা দরে। আর সাদা ফার্মের ডিমের ডজন গত সপ্তাহের বিক্রি হয়েছিল ১৪০ টাকা, এ সপ্তাহে বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকা।
গত সপ্তাহের মত এ সপ্তাহেও মাছের দাম বাড়তি রয়েছে। এখন বাজারে মাঝারি সাইজের চাষের রুই বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা কেজি দরে। আকার অনুযায়ী কাতল ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা, কালিবাউশের দাম ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। চাষের পাঙাস আকার অনুযায়ী কেজি ২৫০ থেকে ২৬০টাকা, আকারভেদে তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, মাঝারি আকারের কৈ মাছ ২০০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।
আকারভেদে দেশি শিং ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, বড় সাইজের পাবদা ৪০০ টাকা, চিংড়ি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা, দেশি পাঁচমেশালি ছোট মাছ ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, মলা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, টেংরা ৫০০ থেকে ৬০০টাকা, আকারভেদে রূপচাঁদা ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, বোয়াল আকার অনুযায়ী ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা, বাতাসি মাছ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, কাজলি মাছ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, টেংরা মাছ ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং মেনি মাছ ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, বেলে মাছ ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বেড়েছে চাল-আটা ও ময়দার দাম
সবজির বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও চাল, আটা ও ময়দার দাম কিছুটা বেড়েছে। দুই সপ্তাহ আগে চালের দাম কেজিতে ১ থেকে ৩ টাকা বেড়ে যাওয়ার পর থেকে তা আর কমেনি। একই সঙ্গে গত এক মাসে খোলা ও প্যাকেটজাত আটার দাম যথাক্রমে ২ ও ৮ শতাংশ বেড়েছে। বেড়েছে ময়দা ও ছোলার দামও। অন্যদিকে, ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা ও সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে বাড়তি দামে।
এখন বাজারে মানভেদে নাজিরশাইল ও মিনিকেট চাল প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৯০ টাকা দরে । পাইজাম, ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ বিক্রি হচ্ছে ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা কেজি দরে আর মোটা চাল বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি দরে। ব্যবসায়ীরা জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে চালের দাম বাড়লেও এরপর আর কমেনি।
বাজারে খোলা আটা প্রতি কেজি ৪৮ থেকে ৫০ টাকা এবং প্যাকেটজাত আটা ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, গত এক মাসে খোলা আটার দাম ২ শতাংশ এবং প্যাকেটজাত আটার দাম ৮ শতাংশ বেড়েছে।
এদিকে, খোলা ময়দার দাম ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং প্যাকেটজাত ময়দার দাম ৬ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে খোলা ময়দা প্রতি কেজি ৭০ টাকা এবং প্যাকেটজাত ময়দা ৮৫ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আটা-ময়দার পাশাপাশি ছোলার দামও বেড়েছে। এখন বাজারে মানভেদে প্রতি কেজি ছোলা ১১০ থেকে ১২৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ গত সপ্তাহে এর দাম ছিল ১০০ থেকে ১১০ টাকা। অন্যান্য ডালের মধ্যে বড়দানা মসুর ডাল প্রতি কেজি ৯০ থেকে ১০০ টাকা, ছোটদানা মসুর ডাল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অ্যাংকর ডাল ৬০ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া বাজারে দেশি পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, দেশি রসুন ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা এবং দেশি আদা ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বোতলজাত সয়াবিন তেলের দামও রয়েছে বাড়তি। বর্তমানে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ২১০ টাকা এবং দুই লিটারের বোতল ৪১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
যা বলছে ক্রেতা বিক্রেতারা
সবজি ও ডিমের দাম কিছুটা কমায় স্বস্তি প্রকাশ করছেন ক্রেতারা। তবে চাল, আটা, ময়দা, ডাল, ছোলা ও ভোজ্যতেলের বাড়তি দামে সামগ্রিক বাজার খরচ কমছে না বলে জানিয়েছেন তারা। অন্যদিকে, বিক্রেতারা বলছেন, মৌসুমি সবজির সরবরাহ বাড়ায় কিছু পণ্যের দাম কমছে। তবে পাইকারি বাজারে কেনা দাম বেশি থাকায় অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম কমানো কঠিন হচ্ছে। এতে একদিকে ক্রেতাদের ব্যয় কমছে না, অন্যদিকে বিক্রিও কমে যাওয়ার কথা জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সপ্তাহিক বাজার করতে এসেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী রিফাদ হাসান। তিনি রাইজিংবিডিকে বলেন, বাজারে কিছু সবজির দাম কমতে শুরু করেছে। ডিমের দামও আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। এতে কিছুটা স্বস্তি লাগছে। কিন্তু চাল, আটা, ময়দা, ডাল ও তেলের দাম তো কমেনি। বরং চালের দাম আগে বেড়েছে, এখনো সেই বাড়তি দামেই কিনতে হচ্ছে। সবজি ও ডিমে কিছু টাকা সাশ্রয় হলেও অন্য পণ্য কিনতে গিয়ে সেই টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। ফলে সব মিলিয়ে সংসারের বাজার খরচ খুব একটা কমছে না।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে বাজার করতে আসা গৃহিণী তানিয়া আক্তার বলেন, প্রতিদিনের বাজারে এমন কোনো পণ্য নেই, যেটা না কিনলেও চলে। সবজি, ডিম, চাল, ডাল, তেল সবই প্রয়োজন। এখন কিছু সবজি ও ডিমের দাম কমায় ভালো লাগছে। কিন্তু চাল, আটা, ময়দা, ছোলা ও অন্যান্য পণ্যের দাম বেশি থাকায় মাসের খরচ মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে যে টাকা নিয়ে বাজারে গেলে প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা যেত, এখন একই টাকায় কম পণ্য কিনতে হচ্ছে। এভাবে কিছু পণ্যের দাম কমলেও সাধারণ মানুষের প্রকৃত স্বস্তি ফিরবে না, যতক্ষণ না নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে আসে।
কারওয়ানবাজারের সবজি বিক্রেতা মফিদুল ইসলাম বলেন, শীতের সবজি বাজারে আসতে শুরু করেছে। সরবরাহ বাড়ায় কিছু সবজির দাম কমছে। মৌসুমি সবজির সরবরাহ আরও বাড়লে দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সব সবজির দাম একসঙ্গে কমে না। কোন সবজি কত দামে বিক্রি হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে আড়ত থেকে কেনা দাম ও বাজারে সরবরাহের ওপর। পরিবহন খরচসহ অন্যান্য ব্যয়ও রয়েছে। ক্রেতারা কম দামে সবজি কিনতে পারলে আমাদেরও বিক্রি বাড়ে। কারণ দাম বেশি থাকলে অনেক ক্রেতা প্রয়োজনের তুলনায় কম সবজি কেনেন।
রাজধানীর নিউমার্কেট মুদি দোকানের বিক্রেতা হাসান সিকদার বলেন, ডিমের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় বাজারে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। কিন্তু চাল, আটা, ময়দা, ডাল, ছোলা ও তেলের মতো পণ্যের দাম এখনো বেশি। এসব পণ্য পাইকারি বাজার থেকে যে দামে কিনতে হচ্ছে, খুচরা বাজারে তার প্রভাব পড়ছে। চালের দাম দুই সপ্তাহ আগে বেড়েছে, এরপর আর তেমন কমেনি। আটা ও ময়দার দামও বেশি। ক্রেতারা দোকানে এসে দাম শুনে অনেক সময় পরিমাণ কমিয়ে দেন বা কিছু পণ্য না কিনেই ফিরে যান। আমাদেরও বিক্রি কমে যায়। পাইকারি বাজারে দাম কমলে খুচরা পর্যায়েও ক্রেতারা স্বস্তি পাবেন।
