এক হাতে ব্যাটের শাসন, অন্য হাতে উইকেটের পেছনে অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতা! আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে এক টেস্টে যেন নিজের সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন লিটন দাস। দুই ইনিংসে ফিফটি ও সেঞ্চুরি করার পর উইকেটের পেছনে একের পর এক শিকার ধরেছেন বাংলাদেশের এই উইকেটরক্ষক।
আজ টেস্টের পঞ্চম দিনের প্রথম সেশনের শেষভাগে ইকরাম আলীখিলের দুর্দান্ত একটি ক্যাচ নিয়ে পূর্ণতা দিয়েছেন নিজের কীর্তিকে! তাতেই টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম উইকেটকিপার হিসেবে এক ম্যাচে দুই ইনিংসে পঞ্চাশোর্ধ্ব রান ও ৯টি ডিসমিসালের অনন্য রেকর্ড গড়েছেন তিনি।
আবুধাবি টেস্টের পঞ্চম দিনে লিটনের সেই ক্যাচটি ছিল ম্যাচের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত। ইবাদত হোসেনের বাউন্সার গ্লাভসে ছুঁয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল ইকরামের বল। ডান দিকে ডাইভ দিয়ে অবিশ্বাস্য দক্ষতায় সেটি তালুবন্দি করেন লিটন। ক্যাচটি ধরার পর নিজেও যেন কিছুটা বিস্মিত ছিলেন তিনি। সতীর্থরা ছুটে এসে অভিনন্দন জানান তাঁকে। ইবাদতও ইকরামকে স্যালুট জানিয়ে উদ্যাপন করেন উইকেটটি!
ক্যাচটি শুধু বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি উইকেট এনে দেয়নি, লিটনের ব্যক্তিগত রেকর্ডেও যোগ করেছে নতুন মাত্রা। এর আগে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে ৫৩ রান করেছিলেন তিনি। দ্বিতীয় ইনিংসে খেলেছেন ১০২ রানের দুর্দান্ত ইনিংস। উইকেটের পেছনে প্রথম ইনিংসে পাঁচটি এবং দ্বিতীয় ইনিংসে চারটি ডিসমিসাল করেছেন। সব মিলিয়ে তার শিকার এখন নয়টি, যার মধ্যে আটটি ক্যাচ এবং একটি স্টাম্পিং।
এই কীর্তিতে পেছনে পড়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ডেনিস লিন্ডসে। ১৯৬৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এক টেস্টে দুই ইনিংসে পঞ্চাশোর্ধ্ব রান করার পাশাপাশি আটটি ডিসমিসাল করেছিলেন তিনি। এতদিন সেটিই ছিল এমন পারফরম্যান্সের সর্বোচ্চ নজির। এবার লিটন নয়টি ডিসমিসাল করে সেই রেকর্ড নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেলেন।
ব্যাট ও গ্লাভস-দুই জায়গাতেই লিটনের এমন পারফরম্যান্সে আবুধাবি টেস্টটি তার ক্যারিয়ারের স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইকরামের ক্যাচটি বাংলাদেশের জন্য ছিল স্বস্তির। দীর্ঘ সময় ধরে উইকেটের জন্য অপেক্ষা করছিলেন বোলাররা। সেদিকউল্লাহ আতাল ও ইকরাম মিলে ক্রিজে বেশ ভালোভাবেই থিতু হয়ে গিয়েছিলেন। এমন সময় ইবাদতের বাউন্সারে লিটনের অসাধারণ প্রচেষ্টা ভাঙে আফগানদের প্রতিরোধ।
পঞ্চম দিনের প্রথম সেশন শেষে আফগানিস্তানের সংগ্রহ ৭৯ ওভারে চার উইকেটে ২০৩ রান। জয়ের জন্য তাদের প্রয়োজন আরও ২৭৬ রান। অন্যদিকে বাংলাদেশের দরকার ছয় উইকেট। হাতে রয়েছে শেষ দুই সেশন।
দিনের শুরুতে তিন উইকেটে ১৩২ রান নিয়ে ব্যাটিং শুরু করেছিল আফগানিস্তান। সেদিকউল্লাহ আতাল ও হাশমতউল্লাহ শহিদি মিলে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন। তবে ৫৩তম ওভারে মেহেদী হাসান মিরাজের বলে শর্ট লেগে আতালের একটি ক্যাচ ফেলে দেন তানজিদ হাসান তামিম। পরের বলেই সিঙ্গেল নেন আতাল। কিন্তু শারীরিক সমস্যায় মাঠেই বসে পড়েন শহিদি। পরে ফিজিওর চিকিৎসা নিয়েও স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে না পারায় বদলি খেলোয়াড়দের সহায়তায় মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। ৩৩ বলে ২০ রান করে আহত অবসর নেন আফগান অধিনায়ক।
শহিদির জায়গায় ব্যাটিংয়ে নামেন ইকরাম। আতালের সঙ্গে জুটি গড়ে বাংলাদেশের বোলারদের দীর্ঘ সময় পরীক্ষা নেন তিনি। তবে লাঞ্চের ঠিক আগে ইবাদতের বাউন্সারে লিটনের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরতে হয় তাকে। ৩৩ রান করা ইকরামের বিদায়ে স্বস্তি ফিরে আসে বাংলাদেশ শিবিরে।
আফগানিস্তানের হয়ে সেদিকউল্লাহ আতাল তখনও প্রতিরোধ ধরে রেখেছেন। প্রথম সেশন শেষে ২১৬ বলের মোকাবিলায় ৬৬ রান করে অপরাজিত ছিলেন তিনি। তার সঙ্গে অপরাজিত ইসমাত আলমের সংগ্রহ শূন্য।
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে করেছিল ৩৪৬ রান। জবাবে আফগানিস্তান গুটিয়ে যায় ২৪০ রানে। দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ সাত উইকেটে ৩৭২ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে। লিটনের ১০২ রানের পাশাপাশি নাজমুল হোসেন শান্ত ৮২, মুশফিকুর রহিম ৮১ ও মেহেদী হাসান মিরাজ অপরাজিত ৫২ রান করেন। তাতে আফগানিস্তানের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় ৪৭৯। আফগানিস্তানের জিততে দরকার ২৭৬ রান, বাংলাদেশের ৬ উইকেট। হাতে দুই সেশন।
লক্ষ্যটা বড় হলেও পঞ্চম দিনের উইকেটে আফগানিস্তানকে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ দিতে চায় না বাংলাদেশ। ইবাদত হোসেন তিনটি এবং হাসান মাহমুদ একটি উইকেট নিয়েছেন। লিটনের বিশ্বরেকর্ডের দিনে তাই বাংলাদেশের সামনে অপেক্ষা আরেকটি অর্জনের!
