জ্বালানি খাতে সর্বজনীন ভর্তুকি ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক রাজস্ব সহায়তা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পণ্য ও সেবার দাম আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনাও চাপে পড়তে পারে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারের এলজি-০৩ হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব বিষয় তুলে ধরে আইএমএফ। এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক ডিপার্টমেন্টের উদ্যোগে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে প্রকাশিত ‘রিজিওনাল ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়।
এতে উপস্থিত ছিলেন আইএমএফের এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক ডিপার্টমেন্টের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন, ডেপুটি ডিরেক্টর সোনালি জেইন চান্দ্রা এবং সংস্থাটির যোগাযোগ কর্মকর্তা পাভিস দেবাস্বাদি। ১২ অক্টোবর শুরু হওয়া এ সম্মেলন চলবে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত।
আইএমএফের মূল্যায়নে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক গতিপথ মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। এগুলো হলো মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোর ধারাবাহিক পরিবর্তন।
এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও অঞ্চলটির অর্থনীতি এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সহনশীলতা দেখিয়েছে। তবে এই সাফল্যের সুফল সব দেশের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হয়নি। একই দেশের অর্থনীতিতেও প্রযুক্তিনির্ভর খাতগুলো তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাচ্ছে, যেখানে অন্যান্য খাত নানা প্রতিকূলতার মুখে রয়েছে।
আইএমএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও তা সীমাহীন নয়। জ্বালানির উচ্চমূল্য দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়লে এ অঞ্চলের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নতুন করে পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।
বড় অর্থনীতিগুলো জ্বালানির মজুত ব্যবহার, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন নীতিগত সহায়তাও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে, নিম্ন আয়ের দেশ, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলো তুলনামূলক বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। জ্বালানি, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও সারের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এসব দেশের উৎপাদন খরচ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উভয়ই বাড়ছে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় নির্বাহের ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সর্বজনীন জ্বালানি ভর্তুকি দিয়ে বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে সীমিত সময়ের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ। এতে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন জানান, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগের পূর্বাভাসের তুলনায় ভালো ছিল। তবে দেশভেদে এই প্রবৃদ্ধির চিত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা কমে ৪ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। যদিও এপ্রিলের পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ৪ শতাংশ ধরা হয়েছিল, নতুন হিসাব সেই তুলনায় উন্নত পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিপণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধির ফলে দক্ষিণ কোরিয়া, আসিয়ানভুক্ত কয়েকটি দেশ, চীন, ভারত ও জাপানের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর, এআই অবকাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিপণ্যের চাহিদা রপ্তানি ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে সহায়তা করছে।
তবে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুবিধা না পাওয়া এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করা দেশগুলোর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তুলনামূলক দুর্বল হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের অর্থনীতি ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানো হয়েছে।
কৃষ্ণা শ্রীনিবাসনের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানির দাম উঁচু পর্যায়ে থেকে যেতে পারে। পাশাপাশি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়া কিংবা সংশ্লিষ্ট সম্পদের মূল্যায়নে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটলে এশিয়ার অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহব্যবস্থায় এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরকারি বন্ডের সুদের হার বাড়লে তার প্রভাব আঞ্চলিক বন্ড বাজারেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে আর্থিক খাতের বিদ্যমান দুর্বলতা আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিকূল আবহাওয়াও অর্থনীতির জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি দেখা দিলে কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপও তীব্র হতে পারে।
তবে বিপরীত চিত্রও সম্ভব। এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লে এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সংযোগ গভীর হলে আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে ভালো হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মুদ্রানীতিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীভূত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন। তার মতে, মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
একই সঙ্গে রাজস্বনীতিতে আর্থিক স্থায়িত্ব রক্ষার পাশাপাশি সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিক খাতের তদারককারী সংস্থাগুলোকে বাজারের অস্থিরতা এবং প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য শ্রমবাজার সংস্কার, কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা, পরিষেবা খাতে আন্তদেশীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল অবকাঠামো ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ। পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংস্থাটি।
সব মিলিয়ে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় নির্বিচারে ভর্তুকি দেওয়ার পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি অর্থের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা দিয়েছে আইএমএফ।
