দুই বছর বন্ধ থাকার পর এবার বসেছে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী ‘গুড় পুকুরের মেলা’। তবে মেলা ঘিরে কোটি টাকার লেনদেন, দোকান বরাদ্দ ও বিভিন্ন খাতে টাকা আদায় এবং রাজস্বের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, ২১ দিনে দোকান ভাড়া, অগ্রিম, বিদ্যুৎ, বিনোদনসহ বিভিন্ন খাত থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। তবে জেলা প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মেলা থেকে তারা কোনো রাজস্ব পায়নি।
মেলার আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও। তাদের অভিযোগ, মেলা প্রাঙ্গণে গভীর রাত পর্যন্ত জুয়ার আসর চলছে। তবে মেলা পরিচালনা কমিটির এক সদস্য জোর করে টাকা আদায় বা চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে গুড় পুকুরের মেলা কয়েকশ বছরের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পরিচিত। সাধারণত ভাদ্র মাসের শেষ দিন ও পূজাকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোল এলাকার গুড় পুকুর-সংলগ্ন পুরোনো বটগাছের কাছে এ মেলা আয়োজনের প্রচলন রয়েছে। এবার নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় শহরের শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে মেলার আয়োজন করা হয়। ১ অক্টোবর দুপুরে মেলার উদ্বোধন করেন সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাওসার আজিজ। ২০ অক্টোবর মেলা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) পর্যন্ত কার্যক্রম চলতে দেখা গেছে।

মেলায় অংশ নেওয়া কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, দোকান বরাদ্দের জন্য দৈনিক ১ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া দিতে হয়েছে। পাশাপাশি দোকানের আকার ও অবস্থানভেদে ১০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম নেওয়া হয়েছে বলে তাদের দাবি। এর বাইরে তাঁবু, সাজসজ্জা, ইট বিছানো, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সুবিধার জন্যও টাকা দিতে হয়েছে।
জুই হানি ফার্মের স্বত্বাধিকারী নাহিদা আক্তার জানান, তাঁবুর জন্য ৭ হাজার, সাজসজ্জায় ৯ হাজার এবং ইট বিছানোর জন্য ৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিদিন দোকানভাড়া বাবদ ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং তিনটি বাতির জন্য ৩০০ টাকা দিতে হচ্ছে। মেলার শৌচাগার ব্যবহারেও প্রতিবার ১০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আচার ও চাটনি বিক্রেতা আব্দুস সামাদ বলেন, তাঁবুর জন্য ২০ হাজার এবং সাজসজ্জার জন্য ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন। তার দাবি, মোট ৩০ হাজার টাকা জামানত হিসেবে নেওয়া হয়েছে, যা ফেরত দেওয়া হবে না বলে তাকে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিদিন দোকানভাড়া ৪ হাজার টাকা, যার মধ্যে পাঁচটি বাতির জন্য প্রতিদিন ৫০০ টাকা দিতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, দোকানভাড়া, অগ্রিম ও অন্যান্য খাত মিলিয়ে মেলায় প্রায় ৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এসব খাতের পূর্ণাঙ্গ আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করা হয়নি।
সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাওসার আজিজ বলেন, মেলা আয়োজনের জন্য কোনো দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। আয়োজকদের মৌখিক অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। মেলা থেকে জেলা প্রশাসন কোনো রাজস্ব পায়নি। মেলার সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করা হলেও তা অনুমোদন করা হয়নি।
সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ক পৌরসভার মালিকানাধীন হলেও এবার মেলা থেকে পৌরসভা কোনো রাজস্ব পায়নি।
জেলা প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, মেলায় বিপুল অঙ্কের টাকা লেনদেনের দাবি উঠলেও এ দুই প্রতিষ্ঠান কোনো রাজস্ব পায়নি। ফলে মেলার আয়োজন, অর্থ আদায় ও আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
মেলার অনুমতি পাওয়ার জন্য জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিএনপি নেতাসহ বিভিন্ন পক্ষকে বড় অঙ্কের টাকা দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী ও আয়োজক। তবে তারা ক্যামেরার সামনে এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য ও সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সদস্যসচিব মো. আবু জাহিদ ডাবলু বলেন, জনদাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবং জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে মেলার আয়োজন করা হয়েছে। জোর করে টাকা আদায় বা চাঁদাবাজির কোনো ঘটনা ঘটেনি। বিভিন্ন কাজে যারা বিনিয়োগ ও চুক্তির ভিত্তিতে যুক্ত হয়েছেন, তারা নিজেদের বিনিয়োগ অনুযায়ী আয় করছেন। তবে মেলা থেকে আয় করা টাকা কোথায় বা কীভাবে জমা হচ্ছে, সে বিষয়ে তার নির্দিষ্ট তথ্য নেই।
চাঁদাবাজির অভিযোগ, হিসাব প্রকাশের দাবি
সাতক্ষীরা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল খালেক মেলাকে ঘিরে চাঁদাবাজির অভিযোগের নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী গুড় পুকুরের মেলাকে কেন্দ্র করে এই ঐতিহ্যকে সামনে রেখে এখানেও আমরা বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে জানতে পেরেছি চরমভাবে এখানে চাঁদাবাজি হচ্ছে। এটাকেও আমরা নিন্দা জানাই, এটাকে আমরা ধিক্কার জানাই, এর বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ জানাই।
সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব আলীনুর খান বাবুলের অভিযোগ, মেলায় গভীর রাত পর্যন্ত জুয়ার আসর চলছে এবং প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ টাকা আদায় হচ্ছে। তিনি মেলার আয়-ব্যয়ের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।
ইব্রাহিম খলিল/এএমকে
