ইরানে নতুন করে হামলা চালানো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের আটটি দেশ। শুক্রবার তুরস্কে বৈঠক করে হরমুজ প্রণালিসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি নিয়ে গঠিত ইউরোপীয় জোট ‘ইথ্রি’ (E3)-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা শুক্রবার তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও মিসর নিয়ে গঠিত ‘আরফোর’ (R4) গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এতে ইতালিও অংশ নেয়।
ইস্তাম্বুলে বৈঠক শেষে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, বৈঠকে অংশ নেওয়া কোনো দেশই ইরানে নতুন করে সামরিক হস্তক্ষেপ বা হামলার পক্ষে নয়। এমন পদক্ষেপে উত্তেজনা বাড়বে এবং সংঘাত আরও বিস্তৃত হবে। যুদ্ধ বন্ধের একমাত্র পথ কূটনীতি ও সংলাপ।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো সাংবাদিকদের বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হলে কেউই লাভবান হবে না। বরং এর ফলে জ্বালানি তেলের দামসহ হাইড্রোকার্বন পণ্যের বাজারে গুরুতর প্রভাব পড়বে।
তিনি বলেন, “তাই আট দেশের এই গোষ্ঠীর প্রথম কাজ হবে উভয় পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর আহ্বান জানানো। এ অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত বাড়ানোর মতো পরিস্থিতি আমাদের নেই।”
ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তায়ানি বলেন, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে উত্তেজনা কমানোই তাঁদের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, “আমি মনে করি না, কেবল সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব।” হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবারও নৌ চলাচল স্বাভাবিক করতে সংলাপ এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
এদিকে, তুরস্কে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত টম ব্যারাক বলেছেন, এ সপ্তাহান্তেই ইরানে হামলা চালাতে পারে ওয়াশিংটন। এক্সে প্রচারিত পডকাস্টের উপস্থাপক মারিও নওফালের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
ব্যারাকের দাবি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সমঝোতার বিষয়ে ‘উন্মুক্ত, প্রস্তুত ও সহজে যোগাযোগযোগ্য’ থাকলেও তিনি কী চান, সে বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছেন।
সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক অভিযান ইরানের সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে হবে না বলেও দাবি করেন ব্যারাক। তাঁর ভাষায়, ট্রাম্প চান এমন একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে, যাতে কেউ জিম্মি না থাকে, কোনো হুমকি না থাকে এবং বিশ্ব পরিস্থিতি শান্ত হয়।
‘এ ধরনের প্রথম উদ্যোগ’
আট দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ, ইয়েমেনে ক্রমবর্ধমান সংঘাত এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেন।
ইস্তাম্বুল থেকে আলজাজিরার প্রতিবেদক সিনেম কোসেওগলু বলেন, আঞ্চলিক সংঘাতগুলোর ধরন ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনার জন্য আট দেশের এ সম্মেলন ‘এ ধরনের প্রথম উদ্যোগ’।
তিনি বলেন, অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর জাতীয় স্বার্থে পার্থক্য রয়েছে, বিশেষ করে উপসাগরীয় সংকটের বিষয়ে। তবে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যা ঘটছে, তার প্রভাব বিশ্বের অন্যান্য অংশেও পড়ছে।
শুক্রবার পৃথক বৈঠকের পর আরফোর গোষ্ঠীর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা একটি যৌথ বিবৃতি দেন। এতে বলা হয়, ইসরায়েলি দখলদারত্বই এ অঞ্চল ও এর বাইরের অস্থিতিশীলতার মূল কারণ।
ফিলিস্তিনে ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক বিপর্যয় বন্ধ করতে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানান তাঁরা।
বিবৃতিতে হুতিদের ‘অগ্রহণযোগ্যভাবে উত্তেজনা বাড়ানোর’ তীব্র নিন্দা জানানো হয়। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেন মন্ত্রীরা। হুতিদের সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ করে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসারও আহ্বান জানানো হয়।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের বিষয়ে সংলাপ ও কূটনীতির জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তাঁরা। বৈধ নৌ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে—এমন যেকোনো পদক্ষেপের বিরোধিতা করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ নৌ চলাচল পুরোপুরি পুনরায় চালুর আহ্বান জানান মন্ত্রীরা।
আঞ্চলিক কূটনীতিতে তুরস্কের ভূমিকা
ইস্তাম্বুলের একটি হোটেলে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আঞ্চলিক কূটনীতিতে নিজেদের ভূমিকা আরও জোরালো করার চেষ্টা করছে তুরস্ক। এর অংশ হিসেবে গত আগস্টে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে শুরু হওয়া ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ এবং মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তুরস্ক জানিয়েছে, এ চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়। মিসরসহ অন্য দেশগুলোর জন্যও এতে যোগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
কূটনৈতিক এ প্ল্যাটফর্মের বিষয়ে ফিদান বলেন, এর বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে। বিশেষ করে এটি অনানুষ্ঠানিক ও নমনীয় এবং সরাসরি বিদ্যমান সমস্যাগুলোর ওপর গুরুত্ব দেয়।
তিনি বলেন, “ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে এত ভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের একত্র করে—এমন আর কোনো প্ল্যাটফর্মের কথা আমাদের জানা নেই।” এ প্রক্রিয়ায় গঠনমূলক ভূমিকা রাখার জন্য আঙ্কারা উপযুক্ত অবস্থানে রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি কায়রো। সম্প্রতি মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি বলেছেন, সৌদি আরবকে সুরক্ষা দিতে প্রয়োজনীয় যেকোনো পদক্ষেপ নেবে তাঁর দেশ।
ইরানের সমর্থনপুষ্ট হুতিরা ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। ওই সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে সৌদি আরব। এ ছাড়া সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক প্রাণঘাতী হামলাও চালিয়েছে হুতিরা।
সূত্র: আল জাজিরা
এমএস/
