বর্তমানে তিনি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিমান ইঞ্জিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান হানিওয়েলে কর্মরত রয়েছেন।
বিশ্বখ্যাত বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার বহুল আলোচিত উড়ন্ত বৈদ্যুতিক গাড়ি ‘রোডস্টার’-এর নতুন মডেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশল প্রকল্পে কাজ করে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন বাংলাদেশি প্রকৌশলী তারেক সরোয়ার। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মেধাবীদের এই জয়যাত্রায় যুক্ত হলো আরও একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। বর্তমানে তিনি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিমান ইঞ্জিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান হানিওয়েলে কর্মরত রয়েছেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী তারেক সরোয়ার ২০২৩ সালে টেসলায় ইন্টার্নশিপ করার সময় এই যুগান্তকারী প্রকল্পে যুক্ত হন। গাড়ি তৈরির প্রচলিত পদ্ধতিতে সাধারণত আন্ডারবডি বা নিচের অংশটি একাধিক স্টিল শিট বা ধাতব পাত জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয়। তবে টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের লক্ষ্য ছিল জোড়াতালির এই প্রচলিত ধারণা থেকে বেরিয়ে পুরো আন্ডারবডিকে একটিমাত্র সিঙ্গেল পার্ট হিসেবে ঢালাই করা।

এত বড় একটি যন্ত্রাংশ একবারে কাস্টিং বা ঢালাই করা অত্যন্ত কঠিন প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ ছিল। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে টেসলা বিশেষ ধরনের অ্যালুমিনিয়াম অ্যালয় উদ্ভাবন করে। দীর্ঘ চেষ্টার পর তারা সফলভাবে প্রতি পাঁচ সেকেন্ডে একটি করে আন্ডারবডি সিঙ্গেল পার্ট তৈরি করার পদ্ধতি আয়ত্ত করে। তারেকের ভাষ্যমতে, পুরো উত্তর আমেরিকায় এত বড় একটি পার্ট একবারে কাস্টিং করার আর কোনো পূর্বের দৃষ্টান্ত নেই।
এই জটিল প্রক্রিয়ায় তারেক সরোয়ারের মূল দায়িত্ব ছিল বিভিন্ন তীব্র আবহাওয়ায় গাড়িটির আন্ডারবডির দীর্ঘমেয়াদি পারফরম্যান্স মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করা। সময়ের সঙ্গে উপাদানের স্থায়িত্ব, আচরণ এবং কার্যক্ষমতা কেমন হবে—তা এই মূল্যায়নের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। তার এই বিশ্লেষণ থেকে প্রাপ্ত ফলাফল পরবর্তীতে যন্ত্রাংশটির চূড়ান্ত নকশা তৈরিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ২০২৩ সালে এই প্রকল্পে কাজ করার দীর্ঘ তিন বছর পর সম্প্রতি গাড়িটির পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রকাশ্যে আসায় নিজের সেই স্মৃতির কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছেন তিনি।
প্রকৌশলজগতের বড় কোনো উদ্ভাবনের পেছনে কেবল দৃশ্যমান নকশাই শেষ কথা নয়; এর পেছনে থাকে গভীর উপাদান বিজ্ঞান, নিখুঁত তথ্য বিশ্লেষণ এবং অসংখ্য কারিগরি সিদ্ধান্ত। বুয়েটের ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে অর্জন করা ধাতব পদার্থের বৈশিষ্ট্য ও স্থায়িত্বের জ্ঞানই তারেককে আধুনিক গাড়ি নির্মাণশিল্পের এই চরম চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাহায্য করেছে। টেসলার মতো প্রতিষ্ঠানে তার এই অবদান প্রমাণ করে যে, সুযোগ পেলে বাংলাদেশের তরুণেরা বিশ্বমানের প্রকৌশল ও প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা রাখে।
গর্বিত পরিবার : লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর শহরের আবু তাহের ও ছাহেরা আক্তার রুমা দম্পতির বড় ছেলে তারেকের বেড়ে ওঠা ও স্থায়ী নিবাস ঢাকার উত্তরায়। ব্যক্তিগত জীবনে ইউসুফ জারিফ ও রুকাইয়া নামের দুই সন্তানের জনক এই প্রকৌশলী ২০১৬ সালে বিয়ে করেন কম্পিউটার প্রকৌশলী সুমাইয়া আফরিনকে। প্রকৌশলী তারেক সরোয়ারের এই অসামান্য অবদানে গর্বিত তার পরিবারও।
