আজ থেকে ৯৩৪ বছর আগে, ইতিহাসের পাতায় ১০৯২ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ অক্টোবর দিনটি একটি গভীর শোক ও ঐতিহাসিক রূপান্তরের চিহ্ন এঁকে দিয়েছিল। আজকের এই দিনে ইরানের নাহাওয়ান্দে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন প্রখ্যাত পারস্য পণ্ডিত, দূরদর্শী কূটনীতিবিদ ও সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রধান উজির আবু আলী আল-হাসান বিন আলী আল-তুসী—ইতিহাস যাকে 'নিজাম আল-মুলক' (যার অর্থ রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা প্রদানকার’) নামে চেনে।
মধ্যযুগীয় ইসলামি শাসনব্যবস্থা ও প্রশাসনিক ইতিহাসে তার অবদান অবিস্মরণীয়। রাজনৈতিক দর্শন, সুশাসন ও শিক্ষা বিপ্লবে তিনি যে পথ দেখিয়ে গেছেন, তা যুগে যুগে রাষ্ট্রনায়ক ও গবেষকদের অনুপ্রাণিত করে আসছে।
৩০ বছরের নিরবচ্ছিন্ন শাসন ও সেলজুক সাম্রাজ্যের রূপান্তর
১০৬৩ থেকে ১০৯২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টানা ৩০ বছর নিজাম আল-মুলক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রধান উজির (প্রধানমন্ত্রী) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি প্রথমে মহান সুলতান আলপ আরসলান এবং পরবর্তীতে তার যোগ্য উত্তরসূরি সুলতান প্রথম মালিক শাহ-এর প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন।
মধ্য এশিয়া থেকে আনাতোলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল সাম্রাজ্যটির প্রশাসনিক শৃঙ্খলা মূলত তার দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপর ভর করেই টিকে ছিল। বিশেষ করে, মাত্র ১৮ বছর বয়সে সিংহাসনে বসা তরুণ সুলতান মালিক শাহ-এর শাসনকালকে সফল ও সুসংগঠিত করতে পর্দার আড়াল থেকে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিলেন এই পারস্য পণ্ডিত। যাযাবর তুর্কমেন যোদ্ধাদের একটি সুশৃঙ্খল, সুসংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রূপান্তর করার প্রধান কারিগর ছিলেন তিনিই।
মধ্যযুগের অলিখিত সংবিধান
সুলতান মালিক শাহ-এর অনুরোধে নিজাম আল-মুলক রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়মাবলী, রাজনৈতিক দর্শন ও সুশাসন বিষয়ে ফার্সি ভাষায় একটি অনন্য নির্দেশিকা গ্রন্থ রচনা করেন, যা সিয়াসতনামা বা সিয়ার আল-মুলুক নামে সুপরিচিত। ৫০টি অধ্যায়ে বিভক্ত গ্রন্থটিকে সেলজুক আমলের এক প্রকার অলিখিত সংবিধান বলা চলে।
এই গ্রন্থে তিনি যেসব নীতির ওপর জোর দিয়েছেন:
শাসকের জবাবদিহিতা ও প্রজার ন্যায়বিচার: রাষ্ট্রপ্রধানকে সব সময় প্রজাসাধারণের কল্যাণে নিবেদিত হতে হবে।
রাজকোষের সঠিক ব্যবহার: সরকারি অর্থ অপচয় রোধ ও স্বচ্ছতার সাথে প্রয়োগ।
যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ: স্বজনপ্রীতি এড়িয়ে মেধার ভিত্তিতে কর্মকর্তা পদায়ন।
দূরদর্শী গোয়েন্দা ব্যবস্থা: সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা রক্ষায় একটি সুসংগঠিত গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের অপরিহার্যতা, যা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আধুনিক গবেষকদের কাছেও এক পরম বিস্ময়।
ঐতিহাসিক নেজামিয়্যা মাদ্রাসা
ইসলামি দুনিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন নিজাম আল-মুলক। তিনি সাম্রাজ্যের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে (যেমন: বাগদাদ, নিশাপুর, ইসফাহান) নেজামিয়্যা (Nizamiyyah) নামক আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।
এটিই ছিল ইতিহাসের প্রথম সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষালয়, যেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থাকা, খাওয়া ও মেধা বৃত্তির সুব্যবস্থা ছিল। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইমাম আল-গাজালির (র.) মতো যুগান্তকারী পণ্ডিতেরা শিক্ষকতা করেছেন। আধুনিক যুগের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ধারণা, তার মূল উৎস ছিল এই নেজামিয়্যা মাদ্রাসাগুলোই।
রহস্যময় গুপ্তঘাতক হাশাশিন ও করুণ ট্র্যাজেডি
নিজাম আল-মুলকের এই বর্ণাঢ্য ও বৈপ্লবিক জীবনের অবসান ঘটেছিল তৎকালীন ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় ও কুখ্যাত রাজনৈতিক গুপ্তঘাতক দল হাশাশিন (Order of Assassins)-এর হাতে। (উল্লেখ্য, এই রাজনৈতিক গুপ্তঘাতক দলটির পটভূমির ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে বিশ্বখ্যাত ভিডিও গেম ফ্র্যাঞ্চাইজি 'Assassin's Creed' তৈরি হয়)।
হাশাশিনদের কট্টরপন্থী মতাদর্শের বিপরীতে নিজাম আল-মুলক সুন্নি মতাদর্শ ও সুশাসনের মূল ধারাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ায় তিনি তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। হাশাশিনদের দলনেতা হাসান-ই সাবাহর নির্দেশে এক ঘাতক সুফি দরবেশের ছদ্মবেশে উজিরের কাফেলার কাছে পৌঁছায়।
১০৯২ সালের ১৪ অক্টোবর, উজির নিজাম আল-মুলক যখন পালকিতে চড়ে ইসফাহান থেকে বাগদাদের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন সেই ছদ্মবেশী ঘাতক বিষাক্ত খঞ্জর দিয়ে তাঁকে মর্মান্তিকভাবে আঘাত করে। ঘটনাস্থলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ইতিহাসের এই মহান সুশাসক ও বিজ্ঞ পণ্ডিত।
অবিনশ্বর উত্তরাধিকার
নিজাম আল-মুলকের ট্র্যাজিক হত্যাকাণ্ডের পরপরই সেলজুক সাম্রাজ্যে এক বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতা ও ভাঙনের সূচনা হয়, যা প্রমাণ করে সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব কতটা তার ওপর নির্ভরশীল ছিল।
আজকের দিনে দাঁড়িয়েও নিজাম আল-মুলকের জীবন ও চিন্তাধারা আমাদের শেখায়,অস্ত্রের জোর একটি সাম্রাজ্য জয় করতে পারে, কিন্তু জ্ঞান, শিক্ষা ও সুশাসনই একটি রাষ্ট্রকে দীর্ঘকাল টিকিয়ে রাখে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
