ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও অপসারণের দাবিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের আটক, পুলিশের বাধা এবং ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) দুই নেতাকে পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে তিহার কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল বিতর্ক চলছে। কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী বিক্ষোভকারীদের ওপর কথিত পুলিশি নির্যাতনের প্রমাণ হিসেবে ভিডিও ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, এসব প্রমাণের ভিত্তিতে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
অন্যদিকে, ভারতের সর্বভারতীয় ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি নেহা বোরা ভারতের তরুণদের গণতান্ত্রিক ও ভোটাধিকার আন্দোলনে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার কথা বলেছেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিজেপির দুই নেতার গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এ পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে একটি পুরো প্রজন্মকে ভয় দেখিয়ে নীরব করার চেষ্টা চলছে।
নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিরোধী দল, শিক্ষার্থী ও অধিকারকর্মীদের প্রতিবাদ এবং পুলিশের পদক্ষেপে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের নির্যাতনের অভিযোগ তুলে রাহুল গান্ধী বলেছেন, শিক্ষার্থীদের ভিডিও ধারণ করে তা তার কাছে পাঠাতে হবে। এসব ভিডিও পরবর্তী সময়ে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সরকারি বাসভবন ১০ জনপথে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় রাহুল বলেন, লিঙ্গ, জাতপাত কিংবা ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে সবাই কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একত্র হয়েছেন। এ সময় তিনি তার পাশে থাকা বিক্ষোভকারীদের দিকে ইঙ্গিত করেন। তাদের কয়েকজনকে আটকে রাখার সময় পুলিশ মারধর করেছে বলে অভিযোগ ওঠে।
রাহুল বলেন, ‘এটি একটি জাতীয় কণ্ঠস্বর। অমিত শাহজি, দয়া করে বিষয়টি ভালো করে দেখুন। এই কণ্ঠস্বরের বিরোধিতা করছেন আপনারা। আমি বলছি, কেউ এই কণ্ঠস্বরের বিরোধিতা করতে পারবে না। তাই আপনাদেরও তা করা উচিত নয়।’
পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে রাহুল বলেন, ‘আমি সব শিক্ষার্থীকে বলেছি, পুলিশ সদস্যদের কর্মকাণ্ডের ভিডিও ধারণ করে সেই প্রমাণ আমাদের কাছে পাঠাতে। পুরো বিষয়টির নিষ্পত্তি হলে আমরা এসব প্রমাণ কাজে লাগাব এবং যাদের শাস্তি পাওয়া প্রয়োজন, তাদের প্রত্যেককে শাস্তির আওতায় আনার ব্যবস্থা করব। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, জ্ঞানেশ কুমার, অমিত শাহ থেকে শুরু করে আমাদের সন্তানদের গায়ে হাত তোলা কনস্টেবল পর্যন্ত— কেউ বাদ যাবেন না।’
এ সময় পুলিশের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন বলে অভিযোগ করা এক বিক্ষোভকারীকে তার প্রতিক্রিয়া দেখাতে বলেন রাহুল। জবাবে ওই ব্যক্তি একটি বাঁশি বের করে বাজাতে শুরু করেন। ঘটনাটি বিক্ষোভকারীদের প্রতি পুলিশের আচরণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
বুধবার সিজেপির নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠিয়ে তিহার কারাগারে নেওয়া হয়েছে। সংবাদ সংস্থা পিটিআই সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে। শান্তি বজায় রাখার মুচলেকা ভঙ্গ এবং জন্তর মন্তরে অনধিকার প্রবেশের অভিযোগে তাদের হেফাজতে পাঠানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এর আগে বুধবার সকালে তাদের আবার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়। তাদের সহযোগী অজিঙ্কা শিন্ডের জামিনের মুচলেকাসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা চূড়ান্ত করা হচ্ছিল বলে জানা গেছে।
এর আগে জন্তর মন্তরে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ঘটনায় সিজেপির দুই নেতাকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানান সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। তিনি নাগপুর থেকে দেওয়া বক্তব্যে তাদের পাঁচ দিনের কারাবাসের বিষয়টি তুলে ধরে ব্রিটিশ শাসনামলে স্বাধীনতাকামীদের গ্রেপ্তারের সঙ্গে এর তুলনা করেন।
দীপকে বলেন, ‘এই দেশে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা কি অপরাধ? আশুতোষ ও সৌরভকে পাঁচ দিনের জন্য কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কেন? কারণ, তারা যন্তর মন্তরে গিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছেন। এমন ঘটনা সর্বশেষ ঘটেছিল ব্রিটিশ শাসনামলে। তখন জনসমক্ষে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করায় স্বাধীনতাসংগ্রামীদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হতো। নরেন্দ্র মোদি একই ধরনের কাজ করছেন।’
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিরোধী দলগুলোর জোট ইন্ডিয়ার সঙ্গে অভিন্ন লক্ষ্য থাকার কথা জানিয়েছেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। তবে তিনি বলেছেন, সিজেপি একটি স্বতন্ত্র চাপ সৃষ্টিকারী সংগঠন হিসেবেই কাজ করবে।
নাগপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দীপকে অভিযোগ করেন, জ্ঞানেশ কুমার নির্বাচনে কারচুপি করছেন এবং নরেন্দ্র মোদিকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সহায়তা করছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সবার একটি অভিন্ন লক্ষ্য রয়েছে। আমরা জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে লড়াই করছি, যিনি নির্বাচনে কারচুপি করছেন এবং নরেন্দ্র মোদিকে ক্ষমতায় থাকতে সাহায্য করছেন। ককরোচ জনতা পার্টি একটি স্বতন্ত্র চাপ সৃষ্টিকারী সংগঠন এবং সব সময় তা-ই থাকবে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আমরা ইন্ডিয়া জোটের বিরোধী। আমাদের এবং ইন্ডিয়া জোটের আন্দোলন একই লক্ষ্যকে সামনে রেখে পরিচালিত হচ্ছে।’
ভারতের তরুণদের গণতান্ত্রিক ও ভোটাধিকার আন্দোলনে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার প্রভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরা। বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন প্রতিবেশী দেশ ভারতের তরুণদের অনুপ্রাণিত করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলন উপলক্ষে পাঠানো এক ভিডিওবার্তায় তিনি এ কথা বলেন। সম্মেলনে শুভেচ্ছা জানিয়ে নেহা বোরা বলেন, ‘সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে বিপ্লবী শুভেচ্ছা। আপনাদের প্রতি আমাদের লাল সালাম। আমরা জানি, এই দেশে সর্বত্র যে জেন-জি আন্দোলন দেখতে পাচ্ছি, তা প্রথম শুরু হয়েছিল বাংলাদেশে। পথ দেখানোর জন্য আপনাদের অভিনন্দন।’
বাংলাদেশের আন্দোলন থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথাও জানান তিনি। নেহা বলেন, ‘আমরা আপনাদের প্রতি সংহতি জানাই। আপনাদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিই, আপনাদের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি।’
সিজেপির নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসের গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেছেন, এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে একটি পুরো প্রজন্মকে ভয় দেখিয়ে নীরব করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে মমতা বলেন, তিনি এবং তার আগের বহু প্রজন্ম গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় লড়াই করেছেন। এ লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে। মমতা বলেন, ‘সিজেপির আশুতোষ ও সৌরভের গ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা জানাই। এই মুহূর্তগুলো আমাদের সবার জন্য। আমাদের মহান গণতন্ত্র রক্ষায় ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করার অঙ্গীকার করতে হবে। এটি একটি পুরো প্রজন্মকে ভয় দেখিয়ে নীরব করার চেষ্টা। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের কখনোই সাংবিধানিক অধিকার সমর্পণ করা উচিত নয়।’
দেশের বিভিন্ন অংশে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গে তার দলের ১৪ হাজার মানুষ পুলিশি ও রাজনৈতিক নিপীড়নের মুখোমুখি হচ্ছেন। মমতা বলেন, ‘যে সরকার ভুলে গেছে যে সরকার জনগণের, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য— সেই সরকারের পতন ঘনিয়ে এসেছে।’ তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘লক্ষ লক্ষ তরুণের প্রতি আমার বার্তা— তোমাদের দিদি আজও তোমাদের পাশে আছে, চিরকাল থাকবে। আসুন, আমরা একসঙ্গে দাঁড়াই এবং আমাদের মাতৃভূমি ভারতকে রক্ষা করি।’
দিল্লিতে সিজেপির দুই নেতার গ্রেপ্তার ও কারাবাসের পাশাপাশি অন্যান্য ছাত্র ও যুব সংগঠনও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। বুধবার স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (এসএফআই) এবং ডেমোক্রেটিক ইয়ুথ ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (ডিওয়াইএফআই) যৌথভাবে ফিরোজ শাহ রোড থেকে যন্তর মন্তরের উদ্দেশে প্রতিবাদ মিছিল বের করে। তবে পুলিশ মাঝপথেই মিছিলটি আটকে দেয়।
অন্যদিকে, মুম্বাইয়ে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) বোম্বের বাইরে বিক্ষোভকারীদের আটক করেছে পুলিশ। প্রতিষ্ঠানটির দ্বিতীয় বর্ষের বি.টেক শিক্ষার্থী সাহিল ওয়াকোড়ের মৃত্যুর প্রতিবাদে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। সাহিলের বাবা রবীন্দ্র ওয়াকোড়ে লোকজনকে ক্যাম্পাসে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ‘চলো আইআইটি বোম্বে’ স্লোগানে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বিক্ষোভকারীদের আটক করা হয়েছে।
