বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সারসহ কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তার মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি উৎপাদনব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে শিল্পোন্নত সাত দেশের জোট জি-৭। এ লক্ষ্যে কৃষিতে সারের দক্ষ ব্যবহার, পুষ্টি উপাদানের সুষম ব্যবস্থাপনা এবং মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা করেছেন জোটের কৃষিমন্ত্রীরা।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) ফ্রান্সের প্যারিসে দেশটির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জি-৭ কৃষিমন্ত্রীদের বৈঠকে এসব বিষয় গুরুত্ব পায়। ফ্রান্সের কৃষি, কৃষিখাদ্য ও খাদ্য সার্বভৌমত্ববিষয়ক মন্ত্রী অ্যানি জেনেভার সভাপতিত্বে বৈঠকে জি-৭ সদস্যদেশগুলোর প্রতিনিধিদের পাশাপাশি ইউরোপীয় কমিশনের কৃষি ও খাদ্যবিষয়ক কমিশনার ক্রিস্টোফ হ্যানসেন অংশ নেন। বৈঠকটি আন্তর্জাতিক খাদ্য প্রদর্শনী SIAL Paris 2026-এর আয়োজনের সঙ্গে সমন্বয় করে অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়। কৃষকদের সংকট মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনের স্থায়িত্ব ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এর আগে গত ৮ জুন অনুষ্ঠিত জি-৭ কৃষিমন্ত্রীদের ভার্চুয়াল বৈঠকে সারমূল্য বৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থার সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি সহায়তার বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। এবারের বৈঠকে সেই ধারাবাহিকতায় কৃষি উৎপাদনব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে আরও স্থিতিশীল করার উপায় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল সার ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের কার্যকর ব্যবহার। কৃষিতে প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টি উপাদান প্রয়োগ, পুষ্টিচক্রের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং মাটির উর্বরতা সংরক্ষণকে টেকসই উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষি উপকরণের অপচয় কমানো এবং উৎপাদনব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ফ্রান্সের কৃষিমন্ত্রী অ্যানি জেনেভার বলেন, কৃষকদের বারবার আঘাত হানা সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সারের উন্নত ব্যবস্থাপনা, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ এবং কৃষি খাতের দুর্বলতা কমানো তাঁদের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। নীতিনির্ধারণে গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান কাজে লাগানোর ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
বৈঠকের পরবর্তী কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী ৩ ও ৪ ডিসেম্বর জি-৭ দেশগুলোর কৃষিবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের নিয়ে একটি সংলাপ আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সের কৃষি গবেষণা সংস্থা INRAE-এর উদ্যোগে অনুষ্ঠেয় এ সংলাপে মাটির স্বাস্থ্য, পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, গবেষণার অভিন্ন অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে।
এ ছাড়া আগামী ১৯ ও ২০ নভেম্বর প্যারিসে জি-৭-এর প্রধান ভেটেরিনারি কর্মকর্তাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এতে প্রাণিস্বাস্থ্যের ঝুঁকি, জৈবিক হুমকি এবং ভেটেরিনারি সেবায় বিভ্রান্তিকর তথ্য মোকাবিলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টি আলোচনায় আসবে।
জি-৭-এর সদস্যদেশগুলো হলো ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, কানাডা ও জাপান। ইউরোপীয় ইউনিয়নও জোটের কার্যক্রমে অংশ নেয়।
বিশ্বজুড়ে কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে কৃষি উৎপাদনে উপকরণের দক্ষ ব্যবহার, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং গবেষণাভিত্তিক সমাধান গ্রহণের উদ্যোগ ভবিষ্যতের খাদ্যসংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল নির্ভর করবে সদস্যদেশগুলোর বাস্তব পদক্ষেপ, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর।
The post খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষির স্থিতিশীলতা জোরদারে প্যারিসে জি-৭ কৃষিমন্ত্রীদের বৈঠক appeared first on ভোরের চেতনা.
