পুজোর ক’টা দিন ঘড়ির কাঁটা মেনে চলা দায়! সকালে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে কখন যে দুপুর গড়িয়ে যায়, খেয়ালই থাকে না। কখনও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, কখনও আত্মীয়ের বাড়িতে খাওয়াদাওয়া, আবার কখনও রাতভর প্যান্ডেল হপিং। উৎসবের আনন্দে বদলে যায় খাওয়াদাওয়া, ঘুম এবং দৈনন্দিন রুটিন।
আর এই ব্যস্ততার মধ্যেই অনেকের ভুল হয়ে যায় রোজের ওষুধ খেতে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ বা থাইরয়েডের সমস্যায় যাঁরা নিয়মিত ওষুধ খান, তাঁদের এই অসতর্কতা বিপদ ডেকে আনতে পারে। সামান্য অনিয়মেই বিঘ্নিত হতে পারে রোগের নিয়ন্ত্রণ। তাই পুজোর আনন্দে মেতে উঠুন, কিন্তু ওষুধ খাওয়ার নিয়মে ফাঁকি দেবেন না।
রুটিন বদলালেই বিপত্তি
দীর্ঘদিন ধরে কোনও অসুখের ওষুধ খেলে অনেক সময় তা রোজকার অভ্যাসে পরিণত হয়। কিন্তু পুজোর সময় ঘুম থেকে ওঠা, খাওয়াদাওয়া এবং বাড়ি ফেরার সময় বদলে যাওয়ায় সেই অভ্যাসে ছেদ পড়ে। কখনও সকালে ওষুধ খাওয়ার কথা মনে থাকে না, কখনও আবার বাইরে থাকার কারণে নির্দিষ্ট সময়ে ওষুধ নেওয়া হয় না।
এর ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে, রক্তচাপের নিয়ন্ত্রণে বিঘ্ন ঘটতে পারে। কিছু হৃদ্রোগের ওষুধ বাদ পড়লেও বাড়তে পারে জটিলতার ঝুঁকি। আবার থাইরয়েডের ওষুধ নিয়ম মেনে না খেলে দীর্ঘমেয়াদে রোগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হতে পারে। তাই কয়েক দিনের উৎসব বলে ওষুধের নিয়মে ছাড় দেওয়া ঠিক নয়।
ওষুধের সময় ভুলবেন না
পুজোর দিনগুলিতে ওষুধ খাওয়ার সময় মনে রাখতে মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়ে রাখতে পারেন। প্রতিদিন যে সময়ে ওষুধ খান, সম্ভব হলে সেই সময়সূচি বজায় রাখুন। সারাদিন বাইরে থাকার পরিকল্পনা থাকলে প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে নিয়ে বেরোন।
ওষুধের প্যাকেট বা লেবেলে দেওয়া সংরক্ষণের নির্দেশ মেনে চলুন। বিশেষ করে ইনসুলিনের মতো ওষুধের ক্ষেত্রে তাপমাত্রার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কোনও ওষুধ খালি পেটে, আবার কোনওটি খাবারের পরে খেতে হয়। তাই ঠাকুর দেখতে বেরনোর পরিকল্পনা করলেও ওষুধ খাওয়ার নিয়ম নিজের মতো করে বদলাবেন না।

ডোজ বাদ পড়লে কী করবেন?
ধরা যাক, ঠাকুর দেখতে গিয়ে ওষুধ খাওয়ার কথা ভুলে গিয়েছেন। বাড়ি ফিরে মনে পড়তেই, আগের ডোজের ক্ষতিপূরণ করতে একসঙ্গে দু’বার ওষুধ খেয়ে নিলেন। এমন ভুল বিপজ্জনক হতে পারে। বাদ পড়া ডোজের ক্ষেত্রে কী করা উচিত, তা নির্ভর করে ওষুধের ধরন, নির্ধারিত সময় এবং পরবর্তী ডোজের ব্যবধানের উপর। তাই ওষুধের নির্দেশিকা দেখে নিন অথবা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বিশেষ করে ইনসুলিন, ডায়াবেটিসের কিছু ওষুধ এবং রক্ত পাতলা রাখার ওষুধের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। নিজের সিদ্ধান্তে ডোজ দ্বিগুণ করবেন না, আবার চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত ওষুধ বন্ধও করবেন না।
পুজোর খাবারেও সতর্কতা
উৎসবের মরশুমে মিষ্টি, ভাজাভুজি, বিরিয়ানি বা রেস্তরাঁর খাবার খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। কিন্তু ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগের রোগীদের ক্ষেত্রে খাবারের অনিয়মও সমস্যার কারণ হতে পারে। ওষুধ খাচ্ছেন বলে ইচ্ছেমতো খাওয়াদাওয়া করা নিরাপদ নয়।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ ও সময় মেনে চলুন। বাইরে দীর্ঘক্ষণ থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার ও জল সঙ্গে রাখুন। ডায়াবেটিসের রোগীরা চিকিৎসকের নির্দেশ অনুসারে রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করুন। শরীর খারাপ লাগলে পুজোর আনন্দে তা উপেক্ষা করবেন না।

আনন্দের সঙ্গী হোক সতর্কতা
পুজোর আনন্দ উপভোগ করতে গিয়ে নিজের স্বাস্থ্যের সঙ্গে আপস করবেন না। বাইরে বেরনোর আগে ওষুধের তালিকা মিলিয়ে নিন, নির্দিষ্ট সময়ে ওষুধ খাওয়ার কথা মনে রাখুন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখুন। কোনও কারণে ওষুধের সময়সূচি বদলানোর প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ঘাম, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ভাব বা গুরুতর অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিন। মনে রাখবেন, উৎসবের আনন্দ কয়েক দিনের, কিন্তু শরীরের যত্ন প্রতিদিনের। তাই ঠাকুর দেখা, আড্ডা আর খাওয়াদাওয়ার পরিকল্পনার পাশাপাশি ওষুধ খাওয়ার নিয়মটাও থাকুক আপনার পুজোর রুটিনে।
