দুর্গাপুজোয় জনসংযোগে যে তৃণমূল কংগ্রেস আলাদা উৎসবের পরিবেশ তৈরি করে ফেলত, আজ একপ্রকার তার বিপরীত ছবি। ক্রাইসিসে কারও মনে পড়ছে মুকুল রায়কে, কেউ দলের সর্বোচ্চ পদ সামলেও এখন নিঃসঙ্গ। প্রাক্তন মন্ত্রী, জেল থেকে ফেরা পার্থ চট্টোপাধ্যায় থেকে বর্তমান সাংসদ সৌগত রায়, পালাবদলের পর প্রথম পুজো সকলেরই যেন অন্যরকম।
তৃণমূল কংগ্রেস দল তখন ভূমিষ্ঠ। ভবিষ্যতে যাঁদের হাতে এই দলের বিস্তার-প্রসার ঘটবে, কালীঘাটের একচালা ঘরে রাখা মা তারার পা ছুঁয়ে সেই চারজন শপথ নেন, জীবনে যখনই যা-ই হয়ে যাক, কেউ কাউকে ছেড়ে যাবেন না। যার মধ্যমণি ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাকিরা সুব্রত বক্সি, মুকুল রায়, পার্থ চট্টোপাধ্যায়। আদিগঙ্গা দিয়ে তার পর অনেক জল গড়িয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস পাহাড়প্রমাণ হয়ে শেষে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। “এই দল আর উঠে দাঁড়াতে পারবে বলে মনে হয় না”- প্রায় স্বগতোক্তির সুরে কথাটা বললেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়, এক সময় মমতা শিবিরের অন্যতম হেভিওয়েট। তাঁর দাবি, “মমতা ভুল থেকে শিক্ষা নিল না। আগেও ভুল করেছে, যখনই যে ডুবেছে তার হাত ছেড়ে দিয়েছে। এখনও সেই শুধু নিজেরটুকু নিয়েই রয়েছে। এখনও যে ভুল করছে তার হাত ছেড়ে দিচ্ছে। এখনও ভুল করছে।” সেই সঙ্গে প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর আক্ষেপ, “মুকুলকে খুব মিস করছি। ও থাকলে এবং সুস্থ থাকলে এই ক্রাইসিস হয়তো সামলে দিতে পারত। মমতার আশপাশে আগে যারা ছিল তারা যতটা পেরেছে ওকে ভুল বুঝিয়েছে, এখনও যারা রয়েছে তারাও ভুল বুঝিয়ে চলেছে।”
শহর-জেলার দুর্গাপুজোগুলোয় বিজেপির স্থানীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এবার কোথাও দখলের, কোথাও বাড়তি কর্তৃত্ব ফলানোর অভিযোগ তুলেছে তৃণমূল। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে একটি পুজোও এবার উদ্বোধন করেননি, পাড়ার পুজো কালীঘাট মিলন সংঘের মণ্ডপে ঢুকে দুই খুদেকে দিয়ে ফিতে কাটিয়েছেন। তাঁর ভাইপো সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেন্দ্র ডায়মন্ড হারবারে এখনও কোনও পুজো উদ্বোধনে যাওয়ার শিডিউল নেই। অরূপ বিশ্বাস, ফিরহাদ হাকিম জুটির জমজমাট দুর্গাপুজো আছে। তবে সে দুটি থেকে এই দুই তারকা নাম কার্যত উধাও। সুরুচি সংঘের সংসর্গ থেকে অরূপের নাম পুরোপুরি মুছে গিয়েছে। চেতলা অগ্রণীর পুজোর সঙ্গে আছেন ফিরহাদ, তবে নামকেওয়াস্তেই। বাকি যে তারকারা একসময় দুর্গাপুজো আলো করে বসে থাকতেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম পার্থ চট্টোপাধ্যায়। নাকতলা উদয়ন সংঘের প্রাক্তন কর্তা। তাঁর গ্রেপ্তারি এবং জেলজীবনের পর সেই পুজো জৌলুস হারায়। এবার পুজোয় তিনি নিজের নাকতলার বাড়িতেই থাকছেন। পুরনো বন্ধুদের আসার কথা। পুজো কাটানো বলতে এটুকুই। এই মুহূর্তে কোনও পুজোর সঙ্গেও জড়িত নন তিনি, কোনও পুজো উদ্বোধনের আমন্ত্রণও নেই।
এই অবস্থার মূল কারণ ‘বিজেপির দখলদারি’ বা ‘কর্তৃত্ব ফলানো’ বলেই মনে করছেন দলের বর্ষীয়ান সাংসদ সৌগত রায়। কলেজ স্কোয়ারের পুজো কমিটির তিনি সভাপতি। কিন্তু সেই পুজোয় তিনি থাকছেন না। আমন্ত্রণ ছিল দমদমে তাঁর কেন্দ্রের কিছু পুজো কমিটিতেও। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, সে সবেও বিজেপি নাক গলিয়েছে। তাই বিরক্ত হয়ে তিনি দিল্লি পাড়ি দিয়েছেন। যোগ দেবেন সেখানকার করোলবাগের পুজো কমিটির আমন্ত্রণে। তাঁর কথায়, “কলেজ স্কোয়ারের পুজোর খুঁটিপুজো করলেন শমীক ভট্টাচার্য। বিজেপির বিধায়ক-নেতারা এখন সেখানে কর্তৃত্ব ফলাচ্ছেন। খামোখা এসবে থাকা মানে অপমানের মধ্যে পড়া। তার থেকে দিল্লি ভালো।” দলের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সি অসুস্থ, কিছু মাস আগেই অস্ত্রপোচার হয়েছে তাঁর। খুব একটা বাড়ি থেকে বেরোচ্ছেন না, ফোনেও চট করে পাওয়া যায় না। তবে টুকটাক বাড়ি থেকে বেরিয়ে কখনও কাছের বকুলবাগান রোডের পার্টি অফিস, কখনও পাড়ার পুজো ‘ঐকতান’-এ এসে বসছেন বলে জানালেন তাঁর ভাই সন্দীপ বক্সি। তাঁর কথায়, “কোনও পুজোয় যাওয়া তো দাদার পক্ষে আর সম্ভব না। তবে পাড়ায় মাঝেমাঝে এসে বসছেন, অল্প কথা বলছেন। কথাও দিয়েছেন পুজোর চারটে দিন পাড়ার পুজোয় থাকবেন।”
এসব থেকে কিছুটা ভিন্ন রুটিন অবশ্য তৃণমূল কংগ্রেসের প্রথম জয়ী বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের। নিজের হাজরা পার্কের পুজোর পাশাপাশি আরও গুটিকতক পুজোর উদ্বোধন করেছেন। বালিগঞ্জের সঙ্গে পুরনো কেন্দ্র রাসবিহারী কেন্দ্রেরও বেশ কিছু পুজোয় গিয়েছেন। হাজরা পার্কের পুজোয় বরাবর অষ্টমীর সন্ধ্যারতি করেন। এবারও করবেন। তাঁর কথায়, “এবারের পুজো কিছুটা হালকা। তবে বেশ কিছু পুজোয় আমন্ত্রণ ছিল, সেসব মিটিয়ে নিয়েছি। পারলে পুজোয় এ পাড়া-সে পাড়ায় কিছুটা ঘুরব নিজের মতো।”
