শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি, চিন্তাশক্তির বিকাশ, নৈতিকতার চর্চা এবং জীবনকে সুন্দরভাবে পরিচালনার যোগ্যতা অর্জন। বিদ্যালয় হওয়ার কথা সেই শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র। শিক্ষক হবেন জ্ঞান ও প্রেরণার উৎস, আর শ্রেণিকক্ষ হবে শিক্ষার্থীর শেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ক্রমশ একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে বিদ্যালয়ের পাঠ যথেষ্ট নয়; পরীক্ষায় ভালো ফল করতে তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট টিউটর কিংবা বিভিন্ন ব্যাচের ওপর।
ফলে শিক্ষা যেন বিদ্যালয়ের চার দেয়াল পেরিয়ে একটি বাণিজ্যিক ব্যবস্থার হাতে চলে যাচ্ছে। অভিভাবককে বিদ্যালয়ের বেতন দেওয়ার পাশাপাশি কোচিং ও প্রাইভেট পড়ানোর জন্যও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীকে বই, খাতা ও পরীক্ষার প্রস্তুতির বাইরে অতিরিক্ত পড়ার চাপে সময় কাটাতে হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান হওয়ার পরও কেন কোচিংয়ের প্রয়োজন হচ্ছে? এটি কি শিক্ষার্থীর অযোগ্যতা, শিক্ষকের ব্যর্থতা, অভিভাবকের অতিরিক্ত প্রত্যাশা, নাকি সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি?
বাস্তবতা হলো, এই সংকটের জন্য কোনো একটি পক্ষকে এককভাবে দায়ী করা যায় না। এর পেছনে রয়েছে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত দায়িত্বহীনতা, সামাজিক মানসিকতা, পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন এবং শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা।
১. শিক্ষক কতটা দায়ী?
শিক্ষা কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শিক্ষক। একজন দক্ষ, দায়িত্বশীল ও শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষক শ্রেণিকক্ষেই পাঠ এমনভাবে উপস্থাপন করতে পারেন, যাতে অধিকাংশ শিক্ষার্থী বিষয়টি বুঝতে পারে।
কিন্তু যখন শ্রেণিকক্ষে পাঠদান যথাযথ হয় না, তখন শিক্ষার্থীকে একই বিষয় বোঝার জন্য বিদ্যালয়ের বাইরে অন্য শিক্ষকের কাছে যেতে হয়।
কিছু ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা দেখা যায়, সেগুলো হলো :
প্রথমত : শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদানের ঘাটতি। শিক্ষক পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু শেষ করলেও শিক্ষার্থীরা তা কতটা বুঝেছে, তা যাচাই করা হয় না। ফলে শিক্ষার্থীর মনে প্রশ্ন থেকে যায়, জমতে থাকে শেখার ঘাটতি।
দ্বিতীয়ত : শিক্ষার্থীর দুর্বলতা শনাক্ত না করা। একই শ্রেণিতে সব শিক্ষার্থীর মেধা, শেখার গতি ও পারিবারিক সহায়তা সমান নয়। দুর্বল শিক্ষার্থীদের বাড়তি সহযোগিতা না দিলে তারা ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত : প্রাইভেট পড়ানোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে পড়ানোর প্রয়োজনকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয় যে, অভিভাবক মনে করেন প্রাইভেট না পড়লে সন্তান ভালো ফল করতে পারবে না।
চতুর্থত : পেশাগত দায়িত্ব ও জবাবদিহির অভাব। নিয়মিত উপস্থিতি, পাঠপরিকল্পনা, শিক্ষার্থীর অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকলে তার দায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকেরও রয়েছে।
তবে সব শিক্ষককে একইভাবে দায়ী করা অন্যায়। অনেক শিক্ষক সীমিত সুযোগ-সুবিধা, বড় শ্রেণিকক্ষ ও নানা প্রশাসনিক দায়িত্বের মধ্যেও নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠদান করেন।
প্রতিকার : সর্বপ্রথমে শিক্ষকদের বর্তমান মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মান মূল্যায়ন, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা এবং পেশাগত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যালয়ে পাঠদানের মান উন্নত হলে কোচিংয়ের প্রয়োজন স্বাভাবিকভাবেই কমবে।
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীদের ব্যাচে পড়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা বন্ধ করতে হবে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট শিক্ষকের ব্যাচে না পড়লে পরীক্ষায় ও ক্লাসে কুনজরে দেখার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।
২. শিক্ষার্থী কতটা দায়ী?
শিক্ষার্থী শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান অংশীজন। তারও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দেয় না, বাড়ির কাজ সময়মতো করে না, নিজে অনুশীলন করে না কিংবা পরীক্ষার আগে অল্প সময়ে সবকিছু শিখে নেওয়ার চেষ্টা করে। পরে পরীক্ষার চাপ বাড়লে তারা কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
কেউ কেউ মনে করে, বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকলেই দায়িত্ব শেষ। অথচ শেখার জন্য প্রয়োজন মনোযোগ, অনুশীলন, প্রশ্ন করার সাহস এবং নিজের ভুল সংশোধনের চেষ্টা।
তবে শিক্ষার্থীদের দায় নির্ধারণের সময় তাদের বয়স, পারিবারিক পরিবেশ, পাঠদানের মান এবং পরীক্ষার চাপও বিবেচনায় নিতে হবে। যে শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে বিষয়টি বুঝতেই পারেনি, তার কাছে এককভাবে স্বশিক্ষার দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া যুক্তিসংগত নয়।
প্রতিকার : শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়ার অভ্যাস, পাঠ্যবিষয় নিয়ে আলোচনা, দলগত অনুশীলন, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা এবং আত্মমূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্থীকে শুধু পরীক্ষার নম্বর অর্জনকারী নয়, বরং সক্রিয় শিক্ষার্থী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
৩. অভিভাবক কতটা দায়ী?
সন্তানের ভালো ফলাফল প্রত্যেক অভিভাবকের প্রত্যাশা। কিন্তু এই প্রত্যাশা যখন অতিরিক্ত নম্বর, শ্রেণিতে প্রথম স্থান কিংবা অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য আড়ালে চলে যায়।
অনেক অভিভাবক মনে করেন, সন্তান যত বেশি কোচিং করবে, তার ফলাফল তত ভালো হবে। ফলে বিদ্যালয়ের পড়ার পাশাপাশি একাধিক কোচিং বা প্রাইভেট শিক্ষকের ব্যবস্থা করা হয়।
কেউ কেউ সন্তানের প্রকৃত শেখার অগ্রগতির চেয়ে পরীক্ষার নম্বরকে বেশি গুরুত্ব দেন। সন্তান কোনো বিষয়ে পিছিয়ে থাকলে বিদ্যালয়ের শিক্ষকের সঙ্গে আলোচনা না করে সরাসরি কোচিংয়ের ব্যবস্থা করেন। এভাবে অভিভাবকের সদিচ্ছাও কখনো কখনো কোচিং নির্ভরতা বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, অভিভাবকেরা অনেক সময় বিদ্যালয়ের পাঠদানের ওপর আস্থা না পেয়ে কিংবা সন্তানের শিক্ষাগত ঘাটতি পূরণ করতে বাধ্য হয়েই কোচিংয়ের আশ্রয় নেন। তাই তাঁদেরও এককভাবে দায়ী করা যায় না।
প্রতিকার : অভিভাবকদের বুঝতে হবে, ভালো শিক্ষা মানে শুধু ভালো ফলাফল নয়। সন্তান বিষয়টি বুঝতে পারছে কি না, তার চিন্তা ও সৃজনশীলতা বাড়ছে কি না, তার মধ্যে সততা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ তৈরি হচ্ছে কি না এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয় ও অভিভাবকের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং যৌথ দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে হবে।
৪. শিক্ষা ব্যবস্থা কতটা দায়ী?
কোচিং নির্ভরতার সবচেয়ে গভীর কারণগুলোর একটি হলো শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা।
যেখানে পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষার্থীর যোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি, সেখানে শিক্ষার লক্ষ্য স্বাভাবিকভাবেই নম্বর কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থী তখন বিষয়টি গভীরভাবে বোঝার পরিবর্তে পরীক্ষায় কীভাবে বেশি নম্বর পাওয়া যায়, তা শেখার চেষ্টা করে।
শিক্ষাব্যবস্থার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো :
১. পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা : শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার চেয়ে পরীক্ষার ফলাফলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।
২. শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর আধিক্য : বড় শ্রেণিকক্ষে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর শেখার ঘাটতি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
৩. শিক্ষার মানে বৈষম্য : বিদ্যালয় ভেদে শিক্ষক, অবকাঠামো, শিক্ষা উপকরণ ও পাঠদানের মানের পার্থক্য।
৪. শিক্ষক উন্নয়নের সীমাবদ্ধতা : কার্যকর প্রশিক্ষণ, নিয়মিত পেশাগত উন্নয়ন ও পাঠদানের মান যাচাইয়ের ঘাটতি।
৫. পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়নের অসামঞ্জস্য : শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও বাস্তব দক্ষতা বাড়ানোর কথা বলা হলেও মূল্যায়ন ব্যবস্থা যদি মুখস্থনির্ভর থাকে, তাহলে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসে না।
৬. কোচিং ব্যবসার প্রসার : শিক্ষার চাহিদাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক ব্যবস্থার ওপর কার্যকর তদারকি না থাকলে কোচিংনির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।
অতএব, শিক্ষার্থীর আচরণ বা শিক্ষকের দায়িত্বহীনতার বাইরে গিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার নীতিমালা, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
৫. কোচিং নির্ভরতার মূল কারণ কী?
কোচিংনির্ভরতার পেছনে কয়েকটি কারণ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
প্রথম কারণ : বিদ্যালয়ের পাঠদানের ওপর আস্থার সংকট। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা যদি মনে করেন, বিদ্যালয়ে পড়েই পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা সম্ভব নয়, তাহলে তাঁরা বিকল্প খুঁজবেন।
দ্বিতীয় কারণ : ভালো ফলাফলের সামাজিক প্রতিযোগিতা। পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নম্বর ও মেধাতালিকাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হলে কোচিংয়ের চাহিদা বাড়ে।
তৃতীয় কারণ : পরীক্ষার ধরন। পরীক্ষায় সাফল্য অর্জনের জন্য যদি নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করা কিংবা পরীক্ষাভিত্তিক কৌশল শেখাই প্রধান হয়ে ওঠে, তাহলে কোচিংয়ের বাজার তৈরি হয়।
চতুর্থ কারণ : ব্যক্তিগত দুর্বলতা পূরণের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা না থাকা। কোনো শিক্ষার্থী একটি বিষয়ে পিছিয়ে পড়লে বিদ্যালয়ে যদি তার জন্য পর্যাপ্ত সহায়তার ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে তাকে কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়।
পঞ্চম কারণ : শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে দেখা। শিক্ষা যখন মানবসম্পদ গঠনের পরিবর্তে শুধু সনদ, নম্বর ও চাকরি পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়, তখন শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ সহজ হয়।
৬. কোচিংনির্ভর শিক্ষার ক্ষতিকর প্রভাব
কোচিংনির্ভরতার প্রভাব ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক-তিনটি ক্ষেত্রেই পড়ে।
অর্থনৈতিক চাপ : বিদ্যালয়ের খরচের পাশাপাশি কোচিং ও প্রাইভেট পড়ানোর ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারগুলো এতে পিছিয়ে পড়তে পারে।
শিক্ষার্থীর ওপর অতিরিক্ত চাপ : বিদ্যালয়, কোচিং, বাড়ির কাজ ও পরীক্ষার প্রস্তুতির মধ্যে শিক্ষার্থীর বিশ্রাম, খেলাধুলা, সৃজনশীল কাজ এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কমে যায়।
স্বনির্ভরভাবে শেখার ক্ষমতা হ্রাস : সবকিছু অন্যের কাছ থেকে বুঝে নেওয়ার অভ্যাস তৈরি হলে শিক্ষার্থীর নিজে পড়া, সমস্যা সমাধান ও স্বাধীনভাবে চিন্তা করার দক্ষতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
শিক্ষায় বৈষম্য বৃদ্ধি : যেসব পরিবার বেশি অর্থ ব্যয় করতে পারে, তারা অতিরিক্ত শিক্ষাসহায়তা কেনার সুযোগ পায়। অন্যদিকে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে অসুবিধায় পড়তে পারে।
৭. কোচিংনির্ভরতা থেকে মুক্তির উপায়
সমস্যাটি দীর্ঘদিনের। তাই শুধু কোচিং বন্ধের ঘোষণা দিয়ে এর সমাধান সম্ভব নয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নত করে কোচিংয়ের ওপর অনিবার্য নির্ভরতা কমাতে হবে।
ক. বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষকে শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র করতে হবে :
শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এমন হতে হবে, যাতে শিক্ষার্থী বিষয়টি বুঝতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় অনুশীলনের সুযোগ পায়।
শুধু পাঠ্যবই শেষ করাকে সাফল্য হিসেবে বিবেচনা না করে শিক্ষার্থীরা কতটা শিখেছে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
খ. দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয়েই বাড়তি সহায়তা :
কোনো শিক্ষার্থী গণিত, ইংরেজি কিংবা অন্য বিষয়ে পিছিয়ে পড়লে তার জন্য বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত সহায়ক ক্লাস, অনুশীলন ও ব্যক্তিগত পরামর্শের ব্যবস্থা করতে হবে। এই সহায়তা এমনভাবে দিতে হবে, যাতে আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে কোনো শিক্ষার্থী পিছিয়ে না পড়ে।
গ. পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কার :
শুধু মুখস্থ করে নম্বর পাওয়ার সুযোগ কমিয়ে অনুধাবন, বিশ্লেষণ, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা এবং বাস্তব প্রয়োগের দক্ষতা মূল্যায়ন করতে হবে। তবে মূল্যায়নের পরিবর্তন যেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সৃষ্টি না করে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
ঘ. শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি :
শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীর মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা এবং প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার শেখাতে হবে। একই সঙ্গে তাঁদের মর্যাদা, প্রয়োজনীয় সহায়তা ও কাজের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
ঙ. কোচিং ও প্রাইভেট পড়ানোর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা :
কোচিংয়ের নামে অনৈতিক চাপ, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, অযৌক্তিক ফি কিংবা বিদ্যালয়ের পাঠদানের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হলে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিশেষ করে কোনো শিক্ষক যেন নিজের শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়তে বাধ্য না করেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তবে কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল শিক্ষার্থীদের বিকল্প সহায়তার ব্যবস্থা না করে হঠাৎ সব ধরনের কোচিং বন্ধ করে দিলে বিপরীত ফল হতে পারে। তাই নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বাড়ানো অপরিহার্য।
চ. অভিভাবকদের মানসিকতার পরিবর্তন :
সন্তানকে অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে তার নিজস্ব অগ্রগতি বুঝতে হবে। নম্বরের পাশাপাশি জ্ঞান, দক্ষতা, সততা, মানবিকতা ও আত্মবিশ্বাসের বিকাশকে গুরুত্ব দিতে হবে।
৮. কে কতটা দায়ী একটি বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন
কোচিংনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার জন্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষা ব্যবস্থার দায় একই রকম নয়।
শিক্ষক : শ্রেণিকক্ষে যথাযথ পাঠদান, শিক্ষার্থীর দুর্বলতা শনাক্ত এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা থাকলে দায়ী।
শিক্ষার্থী : নিয়মিত অনুশীলন, মনোযোগ ও নিজের শেখার দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে দায়ী।
অভিভাবক : অতিরিক্ত নম্বরের প্রতিযোগিতা ও অযৌক্তিক প্রত্যাশার মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করলে দায়ী।
৯. করণীয় : এখন কী করা প্রয়োজন?
সমস্যা সমাধানের জন্য তিনটি পর্যায়ে কাজ করা যেতে পারে।
স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ : ১. বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক শেখার ঘাটতি চিহ্নিত করা। ২. দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়ক ক্লাস চালু করা। ৩. অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় করা। ৪. শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা।
মধ্যমেয়াদি পদক্ষেপ : ১. শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সহায়তা নিশ্চিত করা। ২. বিদ্যালয়ের পরীক্ষার ফলের পাশাপাশি প্রকৃত শেখার অগ্রগতি মূল্যায়ন করা। ৩. কোচিংয়ের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত ও অনৈতিক বাণিজ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা। ৪. শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠাগার, বিজ্ঞানচর্চা, ভাষা শিক্ষা ও সৃজনশীল কার্যক্রমের সুযোগ বাড়ানো।
দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ : ১. পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষার পরিবর্তে জ্ঞান ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করা। ২. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শিক্ষার মানের বৈষম্য কমানো। ৩. শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন ও জবাবদিহির ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। ৪. শিক্ষার মান উন্নয়নে সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা।
উপসংহার : কোচিং নয়, কার্যকর শিক্ষাই হোক মূল লক্ষ্য :
কোচিং নিজে সবসময় খারাপ নয়। কোনো শিক্ষার্থী বিশেষ বিষয়ে দুর্বল হলে বা অতিরিক্ত অনুশীলনের প্রয়োজন হলে সহায়ক শিক্ষা উপকারী হতে পারে। সমস্যা তখনই, যখন কোচিং বিদ্যালয়ের শিক্ষার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায় কিংবা ভালো ফলাফলের জন্য তা প্রায় বাধ্যতামূলক বলে বিবেচিত হয়।
একটি সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থায় বিদ্যালয়েই শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় শিক্ষা অর্জনের প্রধান সুযোগ থাকবে। বাড়তি সহায়তার প্রয়োজন হলে তা হবে বিশেষ প্রয়োজনে, নিয়ম হিসেবে নয়।
শিক্ষককে তাঁর দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে, শিক্ষার্থীকে মনোযোগী ও পরিশ্রমী হতে হবে, অভিভাবককে বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা রাখতে হবে এবং শিক্ষা প্রশাসনকে মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ যদি শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে, শিক্ষক যদি হন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথপ্রদর্শক এবং পরীক্ষা যদি হয় জ্ঞান যাচাইয়ের মাধ্যম তাহলে কোচিংনির্ভরতার বর্তমান সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
সতর্কতা : এটি চারটি উপজেলার নির্বাচিত ২৩টি বিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা। তাই এই হারকে সমগ্র খুলনা বিভাগ বা বাংলাদেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হার হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না।
খুলনা গেজেট/এনএম
