দেশের আকাশপথে যাত্রী চলাচল বাড়ছে দ্রুতগতিতে। রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার, সৈয়দপুর, রাজশাহী, যশোর ও বরিশালের বিমানবন্দরে বাড়ছে যাত্রীর সংখ্যা। ২০২৫ সালে দেশের বিমানবন্দরগুলো দিয়ে যাত্রী চলাচল আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই দেশের আটটি বিমানবন্দর দিয়ে চলাচল করেছেন ১ কোটি ৩ লাখ ১৪ হাজার ২৩৭ যাত্রী। কিন্তু যাত্রী চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি বিমানবন্দরগুলোর অবকাঠামোগত সক্ষমতা ও যাত্রী সেবাব্যবস্থার প্রস্তুতি।
যাত্রী বাড়ার কারণে দেশের বিমানবন্দরগুলো যাত্রীদুর্ভোগ ও হয়রানিও বেড়েছে। ইমিগ্রেশন থেকে লাগেজ সংগ্রহ, কাস্টমস পার হয়ে বাইরে বের হওয়া— প্রতিটি ধাপেই যাত্রীদের ভোগান্তির অভিযোগও দীর্ঘদিনের। ইমিগ্রেশনে দীর্ঘ সারি, লাগেজ পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, দায়িত্বশীলদের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রাজস্ব বোর্ডের নিয়মানুযায়ী বিদেশ
থেকে আসা যাত্রীদের ৫ শতাংশ তল্লাশি করার বিধান রয়েছে। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে শতভাগ লাগেজ তল্লাশি করে কাস্টমস। এ কারণে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।
দেশের প্রধান বিমানবন্দর শাহজালালে বছরে প্রায় ৮০ লাখ যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার কথা বলা হলেও ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন— এ ছয় মাসেই এই বিমানবন্দর দিয়ে চলাচল করেছে ৮৫ লাখ ২৬ হাজার ৩৯৯ জন। অর্থাৎ ছয় মাসেই বার্ষিক সক্ষমতার চেয়ে ৫ লাখ ২৬ হাজার ৩৯৯ জন বেশি যাত্রী চলাচল করেছে। দেশের মোট বিমানযাত্রীর প্রায় ৮৩ শতাংশের চাপও সামলাতে হচ্ছে এই একটি বিমানবন্দরকে। অন্যদিকে সিলেট ও কক্সবাজার বিমানবন্দরে ২০২৫ সালে যাত্রী প্রবৃদ্ধি হয়েছে যথাক্রমে ১৮ দশমিক ৬৩ ও ১৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ফলে দেশের আকাশপথে ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে বিমানবন্দরগুলোর অবকাঠামো, পরিচালন সক্ষমতা, জনবল ও যাত্রীসেবার প্রস্তুতি কতটা বাড়ানো হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশের বিমানবন্দরগুলো দিয়ে মোট ১ কোটি ৬৬ লাখ ৭২ হাজার ২৬৬ জন যাত্রী চলাচল করেন। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৭৫ লাখ ৭৩ হাজার ৩০৩ জনে। এক বছরে যাত্রী বেড়েছে ৯ লাখ ১ হাজার ৩৭ জন, প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই যাত্রী চলাচল করেছে ১ কোটি ৩ লাখ ১৪ হাজার ২৩৭ জনে। এ সংখ্যা ২০২৫ সালের পূর্ণ বছরের মোট যাত্রীর প্রায় ৫৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক যাত্রী ৭৯ লাখ ৪০ হাজার ৩২১ এবং অভ্যন্তরীণ যাত্রী ২৩ লাখ ৭৩ হাজার ৯১৬ জন। এ ছাড়া বিমানবন্দরে দর্শনার্থীর চাপও রয়েছে। ছয় মাসে এক কোটির বেশি দর্শনার্থী বিমানবন্দরে যাত্রায়াত করে। মূলত তারা বিমানযাত্রীকে গ্রহণ ও বিদায় জানাতে উপস্থিত হন। এতে বিমানবন্দরের অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের চাপ পড়ে। বহির্বিশ্বের কোনো বিমানবন্দরে এত দর্শনার্থীর চাপ দেখা যায় না।
দেশের বিমান পরিবহন ব্যবস্থায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওপর নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের সব বিমানবন্দর দিয়ে ১ কোটি ৩ লাখ ১৪ হাজার ২৩৭ জন যাত্রী চলাচল করেছে। এর মধ্যে শুধু শাহজালাল ব্যবহার করেছেন ৮৫ লাখ ২৬ হাজার ৩৯৯ জন। অর্থাৎ দেশের মোট বিমানযাত্রীর প্রায় ৮২ দশমিক ৭ শতাংশই এই একটি বিমানবন্দর দিয়ে চলাচল করেছেন।
শাহজালালে ছয় মাসের যাত্রীর মধ্যে আন্তর্জাতিক যাত্রী ৭৩ লাখ ৩৯ হাজার ৪৪১ এবং অভ্যন্তরীণ যাত্রী ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৯৫৮ জন। আন্তর্জাতিক যাত্রীর বড় অংশের চাপ এই বিমানবন্দরকে সামলাতে হচ্ছে। যাত্রী ব্যবস্থাপনা, পাসপোর্ট পরীক্ষা, ইমিগ্রেশন, নিরাপত্তা তল্লাশি, বোর্ডিং, ব্যাগেজ সরবরাহ, টয়লেট সার্ভিস, উড়োজাহাজের পার্কিং ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং— প্রতিটি ক্ষেত্রেই সমন্বিত সক্ষমতা জরুরি। বলা যেতে পারে বাড়তি যাত্রীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয় কর্তৃপক্ষকে। প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্ভোগ ও হয়রানির শিকার হতে হয় যাত্রীদের। কোনো একটি পর্যায়ে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো যাত্রাপ্রক্রিয়ায়।
বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানেও যাত্রী বৃদ্ধির চিত্র স্পষ্ট। ২০২৪ সালে শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে ১ কোটি ৩১ লাখ ২০ হাজার ৫০১ জন যাত্রী চলাচল করেন। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৩৮ লাখ ৬০ হাজার ৪৩৩ জনে। এক বছরে যাত্রী বেড়েছে ৭ লাখ ৩৯ হাজার ৯৩২ জন, প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ২০২৪ সালেও যাত্রীসংখ্যা ওই সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি ছিল। অর্থাৎ চাপটি সাময়িক নয়; দীর্ঘদিন ধরেই যাত্রীসংখ্যা ও ঘোষিত সক্ষমতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের গতি অব্যাহত থাকলে যাত্রী ব্যবস্থাপনার চাপ আরও বাড়তে পারে।
ঢাকার বাইরে আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলোয়ও যাত্রী চলাচল বাড়ছে। বিশেষ করে সিলেট ও কক্সবাজারে ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালে যাত্রী বৃদ্ধির হার জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি।
সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ২০২৪ সালে ৭ লাখ ৪৮ হাজার ৩৯ জন যাত্রী চলাচল করেন। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ লাখ ৮৭ হাজার ৩৮৫ জনে। এক বছরে যাত্রী বেড়েছে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩৪৬ জন, প্রবৃদ্ধি ১৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে এই বিমানবন্দর দিয়ে চলাচল করেছেন ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৬০৮ জন যাত্রী।
কক্সবাজার বিমানবন্দরে ২০২৪ সালে যাত্রী ছিলেন ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৭০৪ জন। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৬১ হাজার ২৮৩ জনে। এক বছরে যাত্রী বেড়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৫৭৯ জন, প্রবৃদ্ধি ১৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে কক্সবাজার বিমানবন্দর দিয়ে চলাচল করেছেন ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৯২০ জন যাত্রী।
অন্যদিকে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৭ লাখ ১৬ হাজার ৮৯৭ জন যাত্রী চলাচল করেছেন। একই সময়ে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ১ লাখ ৫২ হাজার ২৫৭, রাজশাহীতে ৪৩ হাজার ৫৯৩, যশোরে ২৪ হাজার ১৯৭ এবং বরিশালে ৬ হাজার ৩৬৬ জন যাত্রী চলাচল করেছেন।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের বিমানবন্দরগুলো দিয়ে চলাচল করা যাত্রীদের মধ্যে আন্তর্জাতিক যাত্রীর সংখ্যাই বেশি। এ সময়ে আন্তর্জাতিক যাত্রী ছিলেন ৭৯ লাখ ৪০ হাজার ৩২১ জন, আর অভ্যন্তরীণ যাত্রী ২৩ লাখ ৭৩ হাজার ৯১৬ জন। অর্থাৎ মোট যাত্রীর প্রায় ৭৭ শতাংশ আন্তর্জাতিক এবং ২৩ শতাংশ অভ্যন্তরীণ পথে চলাচল করেছেন।
শাহজালালে আন্তর্জাতিক যাত্রী ছিলেন ৭৩ লাখ ৩৯ হাজার ৪৪১ এবং অভ্যন্তরীণ যাত্রী ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৯৫৮ জন। জাতীয় আন্তর্জাতিক যাত্রীর সিংহভাগই এই বিমানবন্দর ব্যবহার করেছেন। আন্তর্জাতিক যাত্রী ব্যবস্থাপনায় পাসপোর্ট পরীক্ষা, ইমিগ্রেশন, নিরাপত্তা, বোর্ডিং ও ব্যাগেজ সরবরাহের মতো একাধিক ধাপ থাকায় এসব সেবার পর্যাপ্ত সক্ষমতা নিশ্চিত করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বেবিচকের মুখপাত্র ও সহকারী পরিচালক মুহাম্মাদ কাউছার মাহমুদ বলেন, যাত্রী চাপ কমাতে বর্তমানে যেসব বিমান সংস্থা আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করছে, তাদের শাহ আমানত ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকেও ফ্লাইট পরিচালনা করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। কারণ, এসব বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত সুবিধা রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা ২৪ ঘণ্টাজুড়ে ফ্লাইটের সময়সূচি সুষমভাবে বণ্টনের চেষ্টা করছি, যাতে নির্দিষ্ট কোনো সময়ে অতিরিক্ত চাপ তৈরি না হয় এবং দিনের বিভিন্ন সময়ে ভারসাম্য বজায় রেখে উড়োজাহাজ অবতরণ করতে পারে।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল অব. এম মফিদুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, গত ছয় মাসে দেশের বিমানবন্দরগুলো দিয়ে ৮৫ লাখের বেশি যাত্রী যাতায়াত করেছেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোয় যাত্রীর চাপ বাড়লেও সেই অনুপাতে অবকাঠামো ও পরিচালন সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। ২০১৯ সাল থেকেই যাত্রী প্রবাহের এই প্রবৃদ্ধি শুরু হয়। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজার বিমানবন্দরের সম্প্রসারণে বেশ কিছু প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেভাবে আর এগোয়নি। বর্তমান সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। সঠিকভাবে কাজ এগিয়ে নিলে দায়িত্বরতরা নিয়মানুযায়ী দায়িত্ব পালন করলে এ সমস্যার সমাধান হবে। সিভিল এভিয়েশন খাতের বিদ্যমান অবকাঠামো ও সক্ষমতা উন্নয়নেও মন্ত্রণালয়কে বিশেষ নজর দিতে হবে।
