বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। দেবী দুর্গার পূজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বাঙালির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আবেগময় জীবনেরও এক প্রতিচ্ছবি। নতুন পোশাক, আলোকসজ্জা, ঢাকের বাদ্য আর প্রিয়জনের সঙ্গে মিলনমেলায় পরিণত হয় এই দুর্গোৎসব।
ধর্মীয় বিশ্বাসের গণ্ডি ছাড়িয়ে এই উৎসব মানুষের মিলন, সম্প্রীতি ও আনন্দের উপলক্ষ হয়ে ওঠে। ধনী-দরিদ্র, নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ একই উৎসবের আবহে শামিল হন।
দুর্গাপূজা বাঙালির আবহমান সংস্কৃতি, আবেগ, শিল্প এবং সামাজিক জীবনের গভীরতম আত্মপ্রকাশ। এসব বিষয় নিয়ে রাইজিংবিডিতে বিশেষ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তন্ময় সাহা জয়, বিভাগীয় প্রধান, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, কুষ্টিয়া। তার সঙ্গে কথা বলেছেন সনজিৎ সরকার উজ্জ্বল।
রাইজিংবিডি: হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজা বাংলাদেশে কীভাবে সার্বজনীন উৎসব হয়ে উঠল?
তন্ময় সাহা জয়: বাংলায় ঘটা করে দুর্গা পূজার আয়োজন শুরু হয় মূলত বৃটিশ আমলে। তখনকার দিনে জমিদারেরা তাদের আভিজাত্য ও প্রতিপত্তি দেখানোর মাধ্যম হিসেবে এই পূজাকে ব্যবহার করতেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কারণে বাংলায় যে নব্য জমিদার শ্রেণি গড়ে উঠেছিল, তাদের মাধ্যমেই এই পূজা শহর থেকে গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে। তবে এইসব আয়োজনে সাধারণের অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে। বিদেশি সাহেব ও উচ্চবর্গীয় হিন্দুদেরকে ঘিরেই এই পূজার সব আয়োজন থাকতো। সেখানে গান-বাদ্য বা ভোজের যে আয়োজন ছিল; তার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল কোম্পানির কর্তাদের খুশি রাখা। তবে রাণী রাসমনির দুর্গাপূজাতে প্রজাদের উপস্থিতির সুযোগ ছিল। এরপর কালের বিবর্তনে জমিদারদের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায় এবং বিভিন্ন এলাকায় বিস্তার ঘটে বারোয়ারি দুর্গাপূজার। এই বারোয়ারি পূজার প্রচলন থেকেই দুর্গাপূজা হয়ে ওঠে সার্বজনীন পূজা। বিভিন্ন লোকালয়ে সমিতির সদস্যরা চাঁদা তুলে শুরু করেন সার্বজনীন দুর্গাপূজার আয়োজন।
দেবী দুর্গার প্রতিমার চালচিত্রে শিব, পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। পায়ের কাছে মহিষাসুর, সঙ্গে সিংহ, আর প্রতিমার সামগ্রিক বিন্যাসে নানা প্রাণী ও উদ্ভিদের উপস্থিতি। এসবের উপস্থিতি আমাদের সমাজ বাস্তবতায় কীভাবে ধরা দিচ্ছে?
দুর্গাপূজার আয়োজনে ঘটে প্রকৃতির সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার সংযোগ। নবপত্রিকা স্থাপনের মাধ্যমে দেবীর আরাধনা শুরুর বিষয়টি বাংলার মানুষের সঙ্গে কৃষির নিবিড় সম্পর্ককে প্রতিনিধিত্ব করে। রম্ভা, কচ্চী, হরিদ্রা, জয়ন্তী, বিল্ব, দাড়িম্ব, অশোক, মানকচু এবং ধান্যঞ্চ নবপত্রিকা দেবীর ভিন্ন ভিন্ন রূপের প্রতিনিধিত্ব করবার পাশাপাশি প্রকৃতির প্রতি মানুষের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠে। তেমনিভাবে বিভিন্ন প্রাণির উপস্থিতিও এই পূজায় তাৎপর্য বহন করে।
দুর্গাপ্রতিমার দিকে তাকালে একটি অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে। মা দুর্গা মহিষাসুরের সঙ্গে ভয়ংকর যুদ্ধে লিপ্ত, অথচ তার সাথের দেব-দেবী যেন নির্বিকার। কার্তিক অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকলেও মায়ের যুদ্ধে সক্রিয় নন, গণেশের মুখে প্রশান্তির আভাস, লক্ষ্মী ধনসম্পদ মুক্তহস্তে দানের প্রতীক, সরস্বতী বীণা হাতে জ্ঞানের প্রতিমূর্তি। এই দৃশ্যপট কী বাঙালির যাপিত জীবনের প্রতিচ্ছবি?
দুর্গাপূজায় দেবীর প্রতিমার সঙ্গে আরো অনেকের উপস্থিতি আমাদের সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। আমাদের সমাজে যেমন ভালো-মন্দ, সুন্দর-অসুন্দর, ধনী-নির্ধন, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব মানুষ রয়েছে, তেমনিভাবে দেবীর মর্ত্যে আগমনেও নানা শ্রেণির-নানা বিষয়ের প্রতিনিধিত্বকারী দেব-দেবীরা তার সঙ্গে থাকেন।
মানুষ যুগে যুগে অজানা শক্তির ব্যাখ্যা খুঁজেছে, বিপদে আশ্রয় চেয়েছে, কল্যাণের জন্য অশুভ শক্তির বিনাশ চেয়েছে। মহিষাসুরের অত্যাচারে দেবতারা যখন বিপর্যস্ত, তখন তাদের সম্মিলিত শক্তি থেকে আবির্ভূত হন দেবী দুর্গা। মহিষাসুর বধ কী ‘দশে মিলে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ এই প্রবাদের সত্যতার প্রকাশ করে?
মহিষাসুর যখন ব্রহ্মার নিকট থেকে বর পেয়ে অজেয় হয়ে যায়, তখন সে স্বর্গ-মর্ত্য-পাতালে উৎপাত শুরু করে। স্বর্গহারা দেবতারা ত্রিদেবের সঙ্গে একত্রিত হয়ে সম্মিলিত তেজের মাধ্যমে দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটান। ব্রহ্মার বরের কারণে কোনো পুরুষ বা দেবতার দ্বারা মহিষাসুরের বধ সম্ভবপর ছিল না। তাই মহিষাসুরমর্দিনীরূপে ঘটে দেবীর আবিভার্ব। আমাদের সমাজে কিংবা রাষ্ট্রেও যখন অত্যাচারীরা প্রবল প্রতাপশালী হয়ে যায়, তখন সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমেই তাদের পতন নিশ্চিত করতে হয়। কোনো এক বা কয়েক শ্রেণির প্রয়াসে সেটা সফল হওয়া সম্ভব নয়। মহিষাসুর বধ তাই আমাদের সমাজে দশে মিলে করি কাজেরই প্রতিচ্ছবি।
সনাতন ধর্মে দেবী দুর্গা মহিষাসুরমর্দিনী, আদিশক্তি বা জগৎজননী হলেও, প্রত্যেক বাঙালির ঘরে তিনি পূজিত হন ঘরের মেয়ে উমা হিসেবে। পুরো বছর কৈলাস থাকার পর, আশ্বিন মাসে উমা লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ নিয়ে মর্ত্য বা আমাদের ঘরে আসেন। দেবীকে কোনো দূরবর্তী বা ভীতি জাগানো অলৌকিক সত্তা নয়, বরং ঘরের বিবাহিত মেয়ে হিসেবে কল্পনা করা হয়, যে কয়েকদিনের জন্য মর্ত্যে বেড়াতে এসেছে।
দুর্গার প্রতিমার বিবর্তনেও রয়েছে নানা বৈচিত্র্য। বাংলার কোনো কোনো প্রাচীন মূর্তিতে দেবীর বাহনের পরিচিত সিংহরূপের বদলে অন্য প্রাণীর উপস্থিতি দেখা যায়। প্রাচীন ভাস্কর্যে দুর্গার সঙ্গে গণেশ ও কার্তিকের উপস্থিতির নিদর্শন পাওয়া গেলেও লক্ষ্মী, সরস্বতীসহ আজকের পরিচিত পারিবারিক প্রতিমার রূপ সব সময় এমন ছিল না। সময়ের সঙ্গে দুর্গার পৌরাণিক পরিচয়ের পাশাপাশি বাঙালির পারিবারিক কল্পনা তাকে নতুনভাবে নির্মাণ করেছে। প্রতিমায় বিবর্তন তা কী আবহান বাংলার জীবনগাঁথাকেই ধারণ করে এগিয়েছে?
দুর্গাপূজার যে বিবরণ আদি পুরাণসমূহে পাওয়া যায় সেখানে দেবীর মূল রূপের সঙ্গে সিংহ ও মহিষাসুরের উপস্থিতি চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু পরবর্তীতে পৌরাণিক পূজা পদ্ধতির সরল রূপ জটিল হয়ে যায়। দেবীর সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ এবং কার্তিকের পূজার প্রচলন শুরু হয়।
বিভিন্ন প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হয়, এই অঞ্চলে দেবীর পূজায় পোড়ামাটি ও পাথরের মূর্তি ব্যবহার হতো আদি যুগে। মধ্যযুগে এই পাথরের প্রতিমার অনুকরণেই মাটির প্রতিমা নির্মাণ করে পূজা শুরু হয়। সেসময় জমিদার/রাজবাড়িতে দেবীর একচালা প্রতিমা স্থাপন করা হতো। দেবীর পেছনে এক চাল বা ছাদ থাকায় এই কাঠামোকে এক চালা কাঠামো বলা হতো। এখনো অনেক বনেদি বাড়িতে এমন একচালা দেবীর কাঠামো দেখা যায়। একচালা প্রতিমায় দেবী দুর্গার সঙ্গে উপরে লক্ষ্মী ও সরস্বতী এবং নিচে কার্তিক ও গণেশকে এক পরিবারের মতো সাজানো হতো। এছাড়া সিংহটি দেখতে কিছুটা ঘোড়ার আকৃতির হতো। কিন্তু বারোয়ারি পূজার বিকাশে শিল্পীদের ছোঁয়ায় দেবীর কাঠামোর একচালা রূপ পরিবর্তিত হতে থাকে। মায়ের বিভিন্ন রূপের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন থিম যুক্ত করে প্রতিমা তৈরির কাজ হয় এখন। পাশাপাশি প্রতিমা তৈরিতে ব্যবহৃত উপকরণেও নানা ভিন্নতা দেখা যায় আজকাল। তাই প্রতিমার কাঠামোয় এই বিবর্তনকে মায়ের পূজার সার্বজনীন রূপ প্রাপ্তির অনুষঙ্গ হিসেবেই বিবেচনা করতে পারি আমরা।
একসময়কার রণরঙ্গিনী দেবী হয়ে উঠেছেন মা, কন্যা ও পরিবারের কেন্দ্রীয় চরিত্র। এই পরিবর্তনকে কেবল পুরাণের ধারাবাহিকতা দিয়ে বোঝা যায় না; এর মধ্যে রয়েছে বাংলার সামাজিক জীবন, মাতৃত্বের ধারণা এবং পারিবারিক আবেগের গভীর প্রভাব। বাঙালির দুর্গাপূজার সবচেয়ে বড় স্বাতন্ত্র্য হলো, এখানে মহাশক্তি দেবী দুর্গা ঘরের মেয়ে হয়ে ওঠেন। সমাজে এর প্রভাব কতটা দেখতে পান?
সনাতন ধর্মে দেবী দুর্গা মহিষাসুরমর্দিনী, আদিশক্তি বা জগৎজননী হলেও, প্রত্যেক বাঙালির ঘরে তিনি পূজিত হন ঘরের মেয়ে উমা হিসেবে।
দেবী দুর্গার পূজায় প্রতিমা নির্মাণের জন্য বিভিন্ন ধরনের মাটি ও উপকরণের প্রয়োজন হয়। এই উপকরণগুলো শুধু সমাজ ও প্রকৃতির ভিন্নতার মাঝে সমন্বয় সাধন নয়; বরং সবাইকে ছাড়া সমাজের যেকোনো মঙ্গলময় আয়োজনই যে অপূর্ণ থেকে যায় সেই বার্তা দেয় আমাদেরকে। নারী শক্তির এই আরাধনা আমাদেরকে শিক্ষা দেয় সমাজে নারীর সম্মান ও মর্যাদার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে। দেবীর দুর্গার উপস্থিতি আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া দুর্গতি নাশ সম্ভব না, সম্ভব না সমৃদ্ধি কিংবা প্রগতি অর্জন। তাই নারীর তথা শক্তিরূপিনী দেবীর এই আরাধনা আমাদের কাছে ভীষণ তাৎপর্য বহন করে তা বলা বাহুল্য।
পুরো বছর কৈলাস থাকার পর, আশ্বিন মাসে উমা লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ নিয়ে মর্ত্য বা আমাদের ঘরে আসেন। দেবীকে কোনো দূরবর্তী বা ভীতি জাগানো অলৌকিক সত্তা নয়, বরং ঘরের বিবাহিত মেয়ে হিসেবে কল্পনা করা হয়, যে কয়েকদিনের জন্য মর্ত্যে বেড়াতে এসেছে।
আর এই আয়োজন ঘিরেই বারোয়ারি সব মন্দিরগুলো হয়ে একেকটা যৌথ পরিবার। মহালয়ার দিন থেকে শুরু করে বিসর্জনের দিন পর্যন্ত বাড়ির মেয়ের মতো মায়ের যত্ন ও আদর করা হয়। পূজার এই শিক্ষা নিজের বাড়ির জন্যেও অনুকরণীয়। বিয়ের পর বাড়ির মেয়ের জন্যে এমন আকুলতা দেখা যায় প্রতিটি বাড়িতে। দুর্গাপূজার সময় এ আয়োজন ঘিরে বাঙালি পরিবারের সদস্যরা ছুটে যান নিজেদের পৈতৃক বাড়িতে।
পৌরাণিক দুর্গা ও লৌকিক দুর্গার মধ্যে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। পৌরাণিক আখ্যানে তিনি অসুরবিনাশিনী, দেবতাদের সম্মিলিত শক্তির প্রতীক। তার হাতে অস্ত্র, তার লক্ষ্য অশুভের বিনাশ। দুর্গা কেবল ধর্মীয় প্রতিমা নন, নারীর শক্তি প্রতীক হিসেবে পূজিত হচ্ছেন, এর সঙ্গে কী আপনি একমত?
দেবী দুর্গার পূজায় প্রতিমা নির্মাণের জন্য বিভিন্ন ধরনের মাটি ও উপকরণের প্রয়োজন হয়। এই উপকরণগুলো শুধু সমাজ ও প্রকৃতির ভিন্নতার মাঝে সমন্বয় সাধন নয়; বরং সবাইকে ছাড়া সমাজের যেকোনো মঙ্গলময় আয়োজনই যে অপূর্ণ থেকে যায় সেই বার্তা দেয় আমাদেরকে। নারী শক্তির এই আরাধনা আমাদেরকে শিক্ষা দেয় সমাজে নারীর সম্মান ও মর্যাদার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে। দেবীর দুর্গার উপস্থিতি আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া দুর্গতি নাশ সম্ভব না, সম্ভব না সমৃদ্ধি কিংবা প্রগতি অর্জন। তাই নারীর তথা শক্তিরূপিনী দেবীর এই আরাধনা আমাদের কাছে ভীষণ তাৎপর্য বহন করে তা বলা বাহুল্য।
রাইজিংবিডিকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
রাইজিংবিডিকেও আমার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ।
