বাংলা সাহিত্যের শক্তি তার ভাষা, ইতিহাস ও মানুষের বহুমাত্রিক জীবনে। সেই শক্তিকে বিশ্বে পৌঁছে দিতে হলে আমাদের বইকে একই সঙ্গে সাহিত্যিকভাবে গভীর, সম্পাদনায় নির্ভুল, অনুবাদে প্রাণবন্ত এবং পাঠকের কাছে সহজে প্রাপ্য করতে হবে। বিশ্ববাজারে জায়গা পাওয়া কোনো একক লেখক বা প্রকাশকের কাজ নয়; এটি একটি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক উদ্যোগ। সেই উদ্যোগ ধারাবাহিক হলে বাংলা বই কেবল প্রবাসী বাঙালির স্মৃতির আশ্রয় হয়ে থাকবে না–অনুবাদের মাধ্যমে নতুন বিভিন্ন ভাষার বিশ্ব পাঠকের কল্পনা ও চিন্তারও অংশ হয়ে উঠবে।...
বাংলা বইয়ের বিশ্ববাজার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই একটি প্রশ্ন সামনে আসে–আমরা কোন বাজারের কথা বলছি? বিশ্বের নানা দেশে বসবাসকারী বাংলা ভাষাভাষী পাঠক এক ধরনের বাজার; আর বাংলা না জেনেও অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য পড়তে আগ্রহী পাঠক আরেক ধরনের। প্রথম বাজারটি আমাদের চোখের সামনেই আছে–বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এবং ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ নানা অঞ্চলের প্রবাসী বাঙালিরা বাংলা বই খোঁজেন, কেনেন, পড়েন এবং সন্তানদের হাতে তুলে দেন। দ্বিতীয় বাজারটি এখনো তুলনামূলকভাবে ছোট; কিন্তু আন্তর্জাতিক সাহিত্যের মানচিত্রে বাংলা ভাষার বিস্তার ঘটানোর জন্য এর গুরুত্ব অনেক বেশি।
প্রবাসী বাঙালির বই পড়ার আগ্রহ ভাষা, স্মৃতি ও পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। বিদেশে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা বই মাতৃভাষার সংযোগ রক্ষার মাধ্যম। শিশু-কিশোরদের জন্য ছড়া, গল্প, কমিকস ও দ্বিভাষিক বইয়ের পাশাপাশি বড়দের উপন্যাস, কবিতা, ইতিহাস, ধর্ম, দর্শন ও সমকালীন বিষয়ভিত্তিক বইয়ের চাহিদাও রয়েছে। উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যে অনলাইন পোর্টালসহ বিভিন্ন উদ্যোগে বাংলা বই পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে, পাঠক রয়েছে; প্রয়োজন তাদের কাছে নিয়মিত, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ীভাবে বই পৌঁছানোর ব্যবস্থা।
তবে প্রবাসী পাঠক থাকা আর সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক বাজার থাকা এক বিষয় নয়। অনেক জায়গায় বাংলা বইয়ের দোকান নেই, নতুন বইয়ের খবর পাঠকের কাছে পৌঁছায় না, আর বই অর্ডার করে পেতে সময় ও খরচ দুটোই বেশি লাগে। প্রবাসী বইবাজার এখনো অনেকাংশে পরিচিতজন, সাংস্কৃতিক সংগঠন, মেলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন বিক্রির ওপর নির্ভরশীল। ফলে পাঠক বই পেতে পারেন, কিন্তু বইয়ের নির্বাচিত সংগ্রহ, দ্রুত সরবরাহ, স্থানীয় প্রচার ও নিয়মিত বিক্রির অবকাঠামো সব জায়গায় সমানভাবে নেই। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে প্রবাসী বাজারকে শুধু বই রপ্তানির বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; বইয়ের বিপণন, বিতরণ, পাঠচক্র, গ্রন্থাগার এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন–সব মিলিয়ে একটি পাঠক-সম্প্রদায় গড়ে তুলতে হবে।
বাংলা ভাষার বাইরের পাঠকের কাছে পৌঁছানোর প্রধান সেতু অনুবাদ। বাংলা সাহিত্য দীর্ঘদিন ধরেই ভাব, ভাষা ও বিষয়বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। কিন্তু সেই সম্পদের বড় অংশই বাংলা ভাষার ভেতরে সীমাবদ্ধ। ভালো অনুবাদ হলে আমাদের জীবন, সমাজ, ইতিহাস ও কল্পনার জগৎ অন্য ভাষার পাঠকের কাছে ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত হতে পারে। বাংলাদেশের লেখকদের গল্প নিয়ে ইংরেজিতে প্রকাশিত The Book of Dhaka এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। Comma Press-এর প্রকাশিত এই সংকলনে ঢাকা শহরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন লেখকের গল্প স্থান পেয়েছে; বইটি World Literature Today-এর ২০১৬ সালের উল্লেখযোগ্য অনূদিত বইয়ের তালিকায়ও অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এ অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, বাংলাদেশের গল্প শুধু বাংলাদেশের পাঠকের জন্য নয়–যথাযথ সম্পাদনা, অনুবাদ ও প্রকাশনা পেলে তা আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছেও অর্থবহ হতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক পাঠক কেবল ‘বাংলাদেশের গল্প’ পড়তে চান–এ ধারণা যথেষ্ট নয়। তারা এমন সাহিত্য খোঁজেন, যা একদিকে নিজস্ব সমাজ ও সংস্কৃতিতে প্রোথিত, অন্যদিকে মানুষের সর্বজনীন অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে। দারিদ্র্য, প্রেম, বিচ্ছেদ, পরিবার, যুদ্ধ, অভিবাসন, স্মৃতি, ন্যায়-অন্যায়, ক্ষমতা, শহর ও গ্রামের রূপান্তর–এসব বিষয় নানা দেশের পাঠকের কাছেই পরিচিত। কিন্তু পরিচিত বিষয়কে নতুনভাবে দেখানোর ক্ষমতাই সাহিত্যকে আলাদা করে। আমাদের লেখকরা যদি কেবল বিদেশি পাঠকের রুচি অনুমান করে লেখেন, তাহলে লেখার স্বকীয়তা হারানোর ঝুঁকি থাকে। বরং নিজের বাস্তবতার গভীর ও শিল্পসম্মত বর্ণনা দিতে হবে; অনুবাদ ও সম্পাদনা সেই বাস্তবতাকে অন্য ভাষার পাঠকের কাছে বোধগম্য করে তুলবে।
বাংলা সৃজনশীল বইয়ের মান নিয়ে এককথায় চূড়ান্ত রায় দেওয়া সম্ভব নয়। বাংলা সাহিত্যে শক্তিশালী লেখক ও বৈচিত্র্যময় সাহিত্যকর্মের ঐতিহ্য রয়েছে। তবে বইয়ের সংখ্যা বাড়লেই সাহিত্যমান বাড়ে না। পাণ্ডুলিপি নির্বাচন, পুনর্লিখন, পেশাদার সম্পাদনা, তথ্য যাচাই, প্রুফরিডিং ও মুদ্রণের মান বইয়ের গুণমান নির্ধারণ করে। বইমেলাকেন্দ্রিক দ্রুত প্রকাশের প্রবণতায় অনেক সময় এসব ধাপ উপেক্ষিত হয়। দক্ষ সম্পাদক, প্রুফরিডার ও অনুবাদকের ঘাটতিও প্রকাশনা শিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ। তাই সমস্যাটিকে লেখকের প্রতিভার অভাব নয়, বরং মানসম্মত বই প্রকাশে প্রয়োজনীয় পেশাগত সহায়তার ঘাটতি হিসেবে দেখা জরুরি।
বিশ্ববাজারে প্রবেশের জন্য অনুবাদের মান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্য অনুবাদ শব্দের বদলে শব্দ বসানো নয়। লেখকের কণ্ঠ, বাক্যের ছন্দ, রসবোধ, স্থানীয় কথ্য ভাষা, সাংস্কৃতিক ইঙ্গিত এবং চরিত্রের সামাজিক অবস্থান–সবই অন্য ভাষায় নতুন করে নির্মাণ করতে হয়। অপরিণত অনুবাদে গল্পের প্রাণ হারিয়ে যেতে পারে, চরিত্রের ভাষা একরকম হয়ে যেতে পারে, কিংবা স্থান ও সময়ের পার্থক্য মুছে যেতে পারে। তাই অনুবাদককে কেবল ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন হলেই চলবে না; সাহিত্যবোধ, গবেষণার অভ্যাস ও লেখার দক্ষতাও প্রয়োজন। অনুবাদ সম্পাদকের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকাশকদের আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করে বই প্রস্তুত করতে হবে। বিদেশি প্রকাশক বা সাহিত্য এজেন্টের কাছে বই উপস্থাপনের জন্য সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, লেখকের জীবনী, নমুনা অধ্যায়, অনুবাদ-স্বত্বের বিবরণ, ISBN ও প্রকাশনা-সংক্রান্ত তথ্য পেশাদারভাবে প্রস্তুত রাখা জরুরি। পাশাপাশি স্বত্ব হস্তান্তর, রয়্যালটি ও ভাষা বা অঞ্চলভিত্তিক অধিকারের বিষয়ে স্বচ্ছ চুক্তি থাকতে হবে। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার মতো আন্তর্জাতিক আয়োজন অনুবাদ, সহ-প্রকাশনা ও স্বত্ব-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে। তাই এসব মেলায় অংশগ্রহণের আগে বইয়ের তালিকা, স্বত্ব-সংক্রান্ত নথি ও আলোচনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বাংলা বইয়ের প্রসারে ডিজিটাল মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনলাইন বইয়ের দোকান, ই-বুক, অডিওবুক, লেখক-পাঠক আলোচনা, নমুনা অধ্যায় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার ভৌগোলিক দূরত্ব কমায়। এক্ষেত্রে বইয়ের সঠিক তথ্য, মজুত, আন্তর্জাতিক ডাকব্যয় ও সরবরাহের সময় জানানো এবং ক্রেতার অভিযোগের জবাব দেওয়া জরুরি। ডিজিটাল প্রচার শুধু বিজ্ঞাপননির্ভর না হয়ে পাঠকের সঙ্গে সংযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি প্রবাসের বইপাঠের ক্লাব, বাংলা স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও কমিউনিটি লাইব্রেরিকে যুক্ত করে স্থায়ী পাঠকগোষ্ঠী গড়ে তোলা সম্ভব।
এ কাজে রাষ্ট্রীয় সহায়তা এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ উদ্যোগও প্রয়োজন। নির্বাচিত বই অনুবাদের জন্য অনুদান, বিদেশি প্রকাশকদের সঙ্গে সহ-প্রকাশনা, লেখক ও অনুবাদকের আবাসন কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক বইমেলায় যৌথ প্যাভিলিয়ন এবং বিদেশি গ্রন্থাগারে বাংলা বই সরবরাহ–এসব ব্যবস্থা বাংলা সাহিত্যের দৃশ্যমানতা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে কোন দেশে কোন ধরনের বইয়ের পাঠক আছে, কোন অনুবাদ বেশি সাড়া পাচ্ছে এবং স্বত্ব-বিক্রির ফল কী–এসব তথ্য সংগ্রহ করা দরকার। বাজার গবেষণা ছাড়া শুধু অনুমানের ওপর ভিত্তি করে বই বিদেশে পাঠালে অর্থ ও শ্রম দুটোই অপচয় হতে পারে।
বিশ্ববাজারে বাংলা বইয়ের সামনে তাই দুটি সমান্তরাল কাজ রয়েছে। প্রথমত, প্রবাসী বাংলা পাঠকের জন্য বই সহজলভ্য, নিয়মিত ও সাশ্রয়ী করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচিত বাংলা সাহিত্যকে যত্নসহকারে অনুবাদ করে আন্তর্জাতিক পাঠকের সামনে উপস্থাপন করতে হবে। লেখককে দিতে হবে সৃজনশীলতার পাশাপাশি গবেষণা ও পুনর্লিখনের সময়; প্রকাশককে বিনিয়োগ করতে হবে সম্পাদনা, নকশা, অনুবাদ ও বিপণনে; আর রাষ্ট্র ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে গড়ে তুলতে হবে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার কাঠামো।
বাংলা সাহিত্যের শক্তি তার ভাষা, ইতিহাস ও মানুষের বহুমাত্রিক জীবনে। সেই শক্তিকে বিশ্বে পৌঁছে দিতে হলে আমাদের বইকে একই সঙ্গে সাহিত্যিকভাবে গভীর, সম্পাদনায় নির্ভুল, অনুবাদে প্রাণবন্ত এবং পাঠকের কাছে সহজে প্রাপ্য করতে হবে। বিশ্ববাজারে জায়গা পাওয়া কোনো একক লেখক বা প্রকাশকের কাজ নয়; এটি একটি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক উদ্যোগ। সেই উদ্যোগ ধারাবাহিক হলে বাংলা বই কেবল প্রবাসী বাঙালির স্মৃতির আশ্রয় হয়ে থাকবে না–অনুবাদের মাধ্যমে নতুন বিভিন্ন ভাষার বিশ্ব পাঠকের কল্পনা ও চিন্তারও অংশ হয়ে উঠবে।
লেখক: প্রকাশক, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স
