নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ৪০৬ জন মাদক কারবারি ও তাদের পৃষ্ঠপোষকের আর্থিক কর্মকাণ্ড অনুসন্ধান শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। পুলিশ সদরদপ্তরের নির্দেশনার পর সিআইডির মানি লন্ডারিং ইউনিট এ অনুসন্ধানে নেমেছে।
অনুসন্ধানের আওতায় থাকা ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্বজনদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংক হিসাব ও বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে সিআইডি।
সিআইডি সূত্র জানায়, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের ব্যাংক লেনদেনের তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) চিঠি দেওয়া হয়েছে। জমি ও অন্যান্য সম্পদের তথ্য জানতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর কাছেও তথ্য চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অভিযুক্তদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য চাওয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশনের কাছে।
সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন বলেন, মাদক ব্যবসার মাধ্যমে অনেকে দ্রুত বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হচ্ছেন। মাদক কারবারিদের অবৈধ সম্পদের উৎস শনাক্ত করা এবং অর্থ পাচারের বিষয়টি তদন্ত করা সিআইডির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সিআইডির অনুসন্ধান তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের অনেকের বিরুদ্ধেই একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। কারও বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ২০ থেকে ৪৭টি পর্যন্ত। তালিকায় নারী মাদক কারবারির নামও রয়েছে।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ভাটারার রাজু আহমেদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ৪৭টি মামলা রয়েছে। ভাসানটেকের মো. রূপচানের বিরুদ্ধে ৪৩টি এবং শাহজাহানপুরের মো. সোহেলের বিরুদ্ধে ২৭টি মামলা রয়েছে। খিলগাঁওয়ের খালেদ মিয়ার বিরুদ্ধে ২১টি এবং মুগদার মো. লালনের বিরুদ্ধে ২২টি মামলা রয়েছে।
সিআইডি সূত্র বলছে, তালিকাভুক্ত অধিকাংশ ব্যক্তির মাদক নেটওয়ার্ক ঢাকাকেন্দ্রিক। রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর, কোতোয়ালি, চকবাজার, লালবাগ, হাজারীবাগ, মুগদা, সবুজবাগ, খিলগাঁও, ভাটারা, মিরপুর, বাড্ডা ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার মাদক কারবারিদের নাম অনুসন্ধান তালিকায় রয়েছে।
ইতোমধ্যে কয়েকটি থানার পক্ষ থেকে সিআইডির চিঠির জবাবে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হয়েছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে অবৈধ অর্থের প্রবাহ ও অর্থ পাচারের সম্পর্ক রয়েছে। তাই মাদক উদ্ধার বা মামলা দায়েরের পাশাপাশি মাদক ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের উৎস শনাক্ত করাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে সারাদেশে মাদকদ্রব্য উদ্ধারের ঘটনায় ৬ হাজার ৩৮৩টি মামলা হয়েছে। একই মাসে সব ধরনের অপরাধে মোট মামলা হয়েছে ১৭ হাজার ৯১১টি। অর্থাৎ মোট মামলার প্রায় ৩৫ দশমিক ৬৩ শতাংশই ছিল মাদক-সংক্রান্ত।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে সারাদেশে মাদক-সংক্রান্ত মামলা হয়েছিল ৪ হাজার ৬৫৮টি। ওই মাসে সব ধরনের অপরাধে মোট মামলা হয়েছিল ১৫ হাজার ৩৮৯টি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত সংস্থাটি ইয়াবা, হেরোইন, কোকেন, আফিম, গাঁজা ও ফেনসিডিলসহ বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ করেছে।
সিআইডি কর্মকর্তারা বলছেন, মাদক ব্যবসার আর্থিক ভিত্তি শনাক্ত করে অবৈধ সম্পদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া গেলে মাদক নেটওয়ার্ক দুর্বল করা সম্ভব হবে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য যাচাই শেষে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
