নারায়ণগঞ্জে গ্যাস লিকেজ ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থামছেই না। আবাসিক ভবন থেকে শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র— বিভিন্ন স্থানে একের পর এক দুর্ঘটনায় দগ্ধ হচ্ছেন নারী, পুরুষ ও শিশুরা। ঘটছে প্রাণহানি, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বসতবাড়ি ও স্থাপনা। প্রশ্ন উঠেছে, বারবার গ্যাস বিস্ফোরণের পেছনে দায়ী কে? অবৈধ সংযোগ ও ঝুঁকিপূর্ণ পাইপলাইন, নাকি ব্যবহারকারীদের অসচেতনতা?
স্থানীয়দের অভিযোগ, তিতাস গ্যাসের বিতরণ ব্যবস্থায় কার্যকর নজরদারির অভাব, অবৈধ সংযোগ এবং নিম্নমানের পাইপ ও সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণে বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস লিকেজের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ বলছে, গ্যাসের চুলার চাবি বন্ধ না করা, রান্নাঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা না থাকা এবং ব্যবহারকারীদের অসচেতনতার কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে। তবে, একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় গ্যাস বিতরণব্যবস্থার নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সর্বশেষ গত রবিবার রাতে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও ও সদর উপজেলার দেওভোগ এলাকায় গ্যাস লিকেজ থেকে সৃষ্ট দুটি পৃথক বিস্ফোরণের ঘটনায় সাতজন দগ্ধ হন। দুটি ঘটনাই আবাসিক ভবনে ঘটে।
জানা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের চলতি মাস পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস লিকেজ ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ছোট-বড় অন্তত ২৯০টি দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। তবে, এসব ঘটনায় আহত ও নিহত ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দিতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস কিংবা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, গত দুই বছরে গ্যাস বিস্ফোরণ ও লিকেজজনিত ঘটনায় দগ্ধ হয়ে অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে ঠিকাদারদের মাধ্যমে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। এসব সংযোগে নিম্নমানের পাইপ ও
অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার করায় কিছুদিনের মধ্যেই লিকেজ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ পাইপলাইন যথাসময়ে সংস্কার না করায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলেও মনে করছেন তারা।
তিতাস বলছে অসচেতনতা থেকেই ঘটছে দুর্ঘটনা
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির নারায়ণগঞ্জের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সত্যজিৎ ঘোষ বলেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। অনেক সময় অসাবধানতাবশত গ্যাসের চুলার চাবি বন্ধ করা হয় না। আবার অনেকের রান্নাঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থাও থাকে না। এসব কারণে গ্যাস জমে গিয়ে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটতে পারে।
তবে, স্থানীয়দের অভিযোগ ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মধ্যে যে ভিন্নতা রয়েছে, তা দূর করতে গ্যাস বিতরণব্যবস্থার নিরাপত্তা, অবৈধ সংযোগ এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স নারায়ণগঞ্জের উপ-সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল আরেফিন বলেন, গ্যাসের গন্ধ পেলে কোনোভাবেই বৈদ্যুতিক সুইচ অন বা অফ করা যাবে না। দ্রুত দরজা-জানালা খুলে দিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে খবর দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বাসা-বাড়ির গ্যাসলাইন নিয়মিত পরীক্ষা করা, মেয়াদোত্তীর্ণ চুলা ও রেগুলেটর পরিবর্তন করা এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
নারায়ণগঞ্জে গ্যাসজনিত দুর্ঘটনা শুধু আবাসিক এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। গত ১৩ মে সোনারগাঁওয়ের মেঘনাঘাট এলাকায় জেরা মেঘনাঘাট পাওয়ার প্লান্টে সিলিন্ডার থেকে গ্যাস লিকেজের পর বিস্ফোরণে প্রতিষ্ঠানটির ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী অগ্নিদগ্ধ হন। তাদের দ্রুত উদ্ধার করে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। সেখানে ছয়জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হলেও বাকি ছয়জনকে ভর্তি করা হয়। পরে শংকর (২৫) নামে এক কর্মীর মৃত্যু হয় বলে জানান ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক। চলতি বছর মে মাসে নারায়ণগঞ্জে কয়েকটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের প্রাণহানি ঘটে।
পরপর প্রাণহানির ঘটনায় গ্যাসের নিরাপদ ব্যবহার এবং আবাসিক ভবনের পাইপলাইন রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার দাবি উঠেছে।
তল্লা মসজিদে বিস্ফোরণের ক্ষত এখনও দগদগে
নারায়ণগঞ্জে গ্যাস লিকেজজনিত দুর্ঘটনার ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনার একটি ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা এলাকার বায়তুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণ। ২০২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এশার নামাজ চলাকালে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণে ৩৪ জন নিহত হন। গ্যাস পাইপলাইনের লিকেজ থেকে মসজিদের ভেতরে জমে থাকা গ্যাসে বিস্ফোরণ ঘটেছিল বলে তদন্তে উঠে আসে। এ ঘটনায় অর্ধশতাধিক মুসল্লি দগ্ধ হন।
বিস্ফোরণের ঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা হয়। পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তিতাস গ্যাসের ফতুল্লা শাখার আট কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করে। তাদের মধ্যে চারজন প্রকৌশলী ছিলেন। তদন্তসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ ছিল, দায়িত্বে অবহেলা ও যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। এত বড় প্রাণহানির পরও নারায়ণগঞ্জে গ্যাস লিকেজ ও বিস্ফোরণের ধারাবাহিকতা বন্ধ না হওয়ায় নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
