সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার চারটি ইউনিয়নে উন্নয়ন সহায়তা খাতের ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে এই বরাদ্দের একটি বড় অংশের প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে উঠেছে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেশ কিছু প্রকল্পে কোনো কাজই হয়নি, কোথাও নামমাত্র কাজ করে পুরো অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও প্রকল্পের কোনো অস্তিত্বই নেই। উপজেলার ১নং আটগাঁও, ২নং হবিবপুর, ৩নং বাহাড়া ও ৪নং শাল্লা ইউনিয়নে সরেজমিন ঘুরে সরকারি বরাদ্দ লুটপাটের এ চিত্র পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উন্নয়ন সহায়তা খাতের কিছু প্রকল্প কাগজে-কলমে সচল থাকলেও বাস্তবে তার কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব নেই।
১নং আটগাঁও ইউনিয়নের উজানগাঁও গ্রামের গফুর মিয়ার জমির সামনের রাস্তায় কালভার্ট নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হলেও বাস্তবে সেখানে কোনো কাজ হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভুয়া প্রকল্প তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। একই ইউনিয়নের হাফিজ আলী উচ্চ বিদ্যালয় ও মাহমুদনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে স্কুল ব্যাগ বিতরণের জন্য ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও এ বিষয়ে কিছুই জানে না বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। হাফিজ আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রদ্যুৎ কুমার দাশ ও মাহমুদনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনমথ কান্তি চৌধুরী জানান, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তাদের এ বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি। মাহমুদনগর গ্রামের বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম জানান, তার গ্রামে রাস্তা নির্মাণের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও মাত্র ২০-৩০ হাজার টাকার কাজ করা হয়েছে। এই ইউনিয়নের ৯টি প্রকল্পে প্রায় ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাজের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২নং হবিবপুর ইউনিয়নের মৌরাপুর গ্রামের কোনার হাওরের রাস্তায় কালভার্ট নির্মাণের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও সরেজমিনে এর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের দাবি, ওই স্থানে কালভার্টের কোনো প্রয়োজনই ছিল না। মৌরাপুর গ্রামের শৈলেন্দ্র কুমার দাস এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করার কথা জানান। এছাড়া, আগুয়াই মেইন রোডের অ্যাপ্রোচ নির্মাণে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও নামমাত্র কয়েকটি ব্লক বসিয়ে পুরো অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। ইউপি সচিব বিপ্লব কুমার দাশ জানান, মেয়াদ শেষ হলেও পরবর্তীতে কাজ করা যায়। আর চেয়ারম্যান সুবল চন্দ্র দাস দাবি করেন, কালভার্টটি পার্শ্ববর্তী চন্দীগাছের ওখানে করা হয়েছে। তবে স্থানীয়রা জানান, আশপাশের কোথাও এমন কোনো কাজ হয়নি।
৩নং বাহাড়া ইউনিয়নের ডুমরা পাকা রাস্তা থেকে রসিকলাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত সিসি ঢালাইয়ের জন্য দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও সেখানে পাকা রাস্তার কোনো অস্তিত্ব নেই; মানুষ চরম দুর্ভোগ নিয়ে কাঁচা রাস্তা দিয়েই চলাচল করছেন। হতদরিদ্রদের মধ্যে বিনামূল্যে রিংস্লাব বিতরণের দেড় লাখ টাকাও বিতরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। উল্টো প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বাদ দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে সদ্য সাবেক সচিব সমীর চন্দ্র সরকারের ভগ্নীপতি সুমন বিশ্বাসকে একটি নলকূপ স্থাপন করে দেওয়া হয়েছে। প্রতাপপুর ফুটবল খেলার মাঠে গোলপোস্ট নির্মাণের জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও সেখানে কোনো কাজ হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে।
বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ চৌধুরী নান্টু অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি কোনো প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করেননি। যেসব প্রকল্পের কাজ হয়নি, সেগুলোর টাকা তিনজনের নামে যৌথ হিসাবে জমা রাখা হয়েছে।
৪নং শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদের ডিজিটাল সেন্টারের আসবাবপত্র ও বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরবরাহের জন্য ২ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও শিক্ষকরা জানান, তাদের কোনো আসবাবপত্র দেওয়া হয়নি। এছাড়া কান্দিগাঁও-চানপুর হাটিতে দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত পুকুর খনন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। কান্দিগাঁও গ্রামের ইছব মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত পাকা রাস্তা নির্মাণের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও সেখানে কোনো কাজ হয়নি। পুকুরের মাটি চেয়ারম্যান ও তার আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস সাত্তার মিয়া বলেন, পরিষদের ফার্নিচার ও স্কুলের আসবাবপত্র এখনো কেনা হয়নি। সরকারি প্রাক্কলন (ইস্টিমেট) না দেওয়ায় অনেক কাজ করা বাকি আছে। তিনি আরও বলেন, “আমাদের টাকা বাজেয়াপ্ত হয় না, এগুলো স্বাধীনমতো করা যায়। এগুলো আমাদের নিজস্ব ফান্ড, চেয়ারম্যান চাইলে কাজ না করলেও কিচ্ছু হবে না।”
প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হলেও কাজের মান সন্তোষজনক মর্মে প্রত্যয়ন দিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তৎকালীন উপ-সহকারী প্রকৌশলী সাজু মিয়া (বর্তমানে শান্তিগঞ্জ উপজেলায় বদলিকৃত)। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কয়টি প্রকল্পে প্রত্যয়ন দিয়েছেন তা মনে নেই; এ বিষয়ে চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগের কথা বলেই তিনি সংযোগ কেটে দেন।
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় গৃহীত সব প্রকল্প যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কোনো প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ সুনামগঞ্জের উপপরিচালক অসীম চন্দ্র বণিক জানান, প্রকল্পের টাকা নিয়ে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে তিনি নিজে গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খানও একই কথা বলে জানান, সত্যতা পেলে আইনগতভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া
