দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি ও জ্বালানির অগ্নিমূল্যের কারণে সৃষ্ট জনঅসন্তোষের জেরে শনিবার (১৭ অক্টোবর) ফ্রান্সে যে ব্যাপক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে, তা রোধ করতে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যর্থতার মুখে পড়েছে দেশটির সরকার। এর ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ফ্রান্স এখন গুরুতর সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এই সংকট এখন খোদ সরকারের ভেতরেও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন নুনিয়াজ পদত্যাগপত্র জমা দিলেও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) ফরাসি প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এলিসি প্যালেসের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা বাহিনীর নেতৃত্বে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেছেন প্রেসিডেন্ট। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ত্রুটিগুলো নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং অনুরূপ সংকটগুলো আরো কার্যকরভাবে মোকাবিলায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নতুন অপারেশনাল পদ্ধতি চালুর নির্দেশ দিয়েছেন।
ব্যাপক সহিংসতা ও হতাহতের চিত্র
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং জনসেবার অবনতির প্রতিবাদে দেশব্যাপী চলা এই বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৩৯৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া ৯৯৭ জন পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে সাতজনের অবস্থা গুরুতর।
শনিবার রাজধানী প্যারিস, মার্সেই, লিয়ন, বর্ডো এবং লিমোজের মতো প্রধান শহরগুলোতে বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়। লিমোজে মুখোশধারীদের হামলায় ঐতিহাসিক টাউন হল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। মার্সেই ও লিমেও পৌরসভার বিভিন্ন ভবনে হামলার পাশাপাশি বর্ডোতে জেলা প্রশাসকের বাসভবনে ভাঙচুর চালানো হয়। এমনকি একদল দাঙ্গাকারী সরাসরি প্রেসিডেন্ট ভবন ‘এলিসি প্যালেস’-এর আশপাশে পৌঁছে যাওয়ায় দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড়
পুলিশি অপারেশনের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে চতুর্মুখী সমালোচনা শুরু হয়েছে। গ্রিন পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মারিন টন্ডেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে বলেন, তিনি সংকটের মাত্রা অনুধাবন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। ‘ফ্রান্স আনবাউড’ ও ‘ন্যাশনাল র্যালি’ দলের পক্ষ থেকেও সরকারের অদক্ষতার অভিযোগ তোলা হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ মন্তব্য করেন, রাষ্ট্র দেশজুড়ে জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
তবে অপর্যাপ্ত পরিকল্পনার অভিযোগ অস্বীকার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন নুনিয়াজ জানান, নিরাপত্তা বাহিনীকে এমন একদল সুপরিকল্পিত মানুষের মুখোমুখি হতে হয়েছে যারা আকস্মিক হামলা চালিয়ে দ্রুত ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার কৌশল নিয়েছিল। মার্সেইয়ের মেয়র বেনোয়া পায়ান শহরটিকে অরক্ষিত রাখার অভিযোগ তুললেও, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, রবিবার দিনের শুরুতেই প্রায় দুই হাজার দাঙ্গাকারীর উপস্থিতি পুলিশকে অপ্রস্তুত করে দিয়েছিল।
ম্যাখোঁর কঠোর বার্তা ও উপসাগরীয় দেশ সফর
ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের তীব্র নিন্দা জানিয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ রবিবার (১৮ অক্টোবর) রাতে এক টেলিভিশন ভাষণে বলেন, “আমরা সবাই রাগ ও লজ্জা অনুভব করছি। যারা ধ্বংস চালিয়েছে তাদের তার মূল্য চোকাতে হবে, যারা লুটপাট করেছে তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।”
শনিবারের বিক্ষোভে একাধিক টাউন হলে আগুন দেওয়া হয়। এছাড়া শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট বা ভাঙচুর চালানো হয়।
ম্যাক্রোঁ বলেন, “এই ছবিগুলো দেখে আমরা সবাই নিজেদের প্রশ্ন করেছি, তাদের মনে কী চলছে? ফরাসিরা ফ্রান্সের সঙ্গে এমন করতে পারে কীভাবে?”
একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী এবং ধ্বংসযজ্ঞে জড়িতদের আলাদা করে দেখার কথা উল্লেখ করে তিনি তরুণদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের আস্থার সংকট দূর করার প্রতিশ্রুতি দেন। সামনে আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় শান্তি ও ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে ফ্রান্সে জ্বালানির দাম কমাতে এবং তেল ও ডিজেল সরবরাহের নতুন চুক্তি নিশ্চিত করতে সোমবার থেকে চার দিনের এক উপসাগরীয় দেশ সফর শুরু করেছেন ম্যাক্রোঁ। এই সফরে ১৯ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কাতার সফর করবেন।
উল্লেখ্য, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল ও হাইড্রোকার্বন সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় ফ্রান্সে এই জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে।
তথ্যসূত্র: প্রোটোথেমা
