আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তার বাসায় ডিজে পার্টির আড়ালে মাদক সেবন, মাদক ব্যবসা কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়ার অভিযোগ উঠলে তা শুধু একটি বাসা বা ব্যক্তিকে ঘিরে প্রশ্ন নয়; বরং তা আইনের শাসন, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও জননিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। যে বাহিনীর দায়িত্ব অপরাধ দমন, মাদক ব্যবসা নির্মূল এবং সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা, ওই বাহিনীর কোনো কর্মকর্তার বাসা ঘিরে এমন অভিযোগ উঠলে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়। প্রশ্ন ওঠে- যাদের হাতে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের ক্ষমতা, তাদেরই কারো বাসায় অপরাধ সংঘটিত হওয়ার অভিযোগ উঠলে অপরাধীদের ধরবে কে? মাদকের বিস্তার তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি করছে এবং অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে তুলছে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হলেও প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধীরা নিরাপদে থেকে গেলে এসব অভিযান প্রত্যাশিত ফল দিতে পারে না। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ কঠোর। অথচ ক্ষমতাবানদের ক্ষেত্রে শিথিল- এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
বলা বাহুল্য, দেশে মাদক একটি ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা। ডিজে পার্টি আয়োজন করা নিজে কোনো অপরাধ নয়, ব্যক্তিগত পরিসরে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান আয়োজনের অধিকার মানুষের রয়েছে। কিন্তু ওই আয়োজনের আড়ালে যদি মাদকদ্রব্য রাখা, সেবন, কেনাবেচা কিংবা অন্য কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়; তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় বা পদমর্যাদা বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কোনো বাড়ি সরকারি কর্মকর্তার হোক কিংবা সাধারণ নাগরিকের- অপরাধের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে সবার জন্য একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত; বিশেষ করে অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার কোনো কর্মকর্তার বাসা কেন্দ্র করে এমন অভিযোগ সামনে এলে বিষয়টি আরো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করাও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। অভিযোগ সত্য হলে তার প্রমাণ সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আর অভিযোগ অসত্য হলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কারণ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য যেমন অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি, তেমনি নির্দোষ ব্যক্তিকে অপবাদ থেকে রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থা। অভিযোগের সঙ্গে কোনো কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার প্রশ্ন থাকলে তদন্ত যেন তার অধীনস্থ বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বারা প্রভাবিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন হলে নিরপেক্ষ তদন্তকারী দল গঠন, আইনসম্মতভাবে আলামত সংগ্রহ, মাদকদ্রব্যের উপস্থিতি যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণ করতে হবে। তদন্তের ফলাফলও যথাসম্ভব স্বচ্ছতার সঙ্গে জনসমক্ষে তুলে ধরা প্রয়োজন। এখানে প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বলার অপেক্ষা রাখে না, অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার কোনো কর্মকর্তার বাসায় ডিজে পার্টির আড়ালে মাদক কিংবা অসামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়ার অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া অপরিহার্য। এখানে মূল বিষয় কোনো ব্যক্তির পদ-পদবি নয়; মূল বিষয় হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগের সত্যতা না থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা পরিষ্কার করতে হবে। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখতে হলে একটি নীতিই অনুসরণ করতে হবে- আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। তা না হলে প্রশ্ন থেকেই যাবে- অপরাধ দমনের দায়িত্ব যাদের, তাদের ঘিরেই যদি অপরাধের অভিযোগ ওঠে; তাহলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পাবে কার কাছে? একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বাসায় কী ঘটছে, তা নিয়ে অভিযোগ উঠলে কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা। পদমর্যাদা যেন তদন্তে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। অপরাধ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং বিভাগীয় বিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নিতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের অজুহাতে কাউকে হয়রানি করা কিংবা ব্যক্তিগত বিদ্বেষ চরিতার্থ করার সুযোগও দেওয়া যাবে না। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে একদিকে সাধারণ মানুষকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে বলা হবে, অন্যদিকে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ উপেক্ষা করা হবে- এমন দ্বৈতনীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আইনের চোখে সবাই সমান- এই নীতির বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হবে। কারণ আইনের প্রয়োগে বৈষম্য থাকলে অপরাধীরা উৎসাহিত হয় এবং সৎ কর্মকর্তারাও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েন। তাই আমাদের প্রত্যাশা, ডিজে পার্টির আড়ালে অতিরিক্ত ডিআইজিসহ মাদক ব্যবসায় জড়িতদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করবে কর্তৃপক্ষ।
কেএমএএ/আপ্র/২২.১০.২০২৬
