আলবেনিয়ায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ টানা পঞ্চম দিনে সহিংস রূপ নিয়েছে। রাজধানী তিরানায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে অন্তত ২০০ বেশি আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৭০ জন পুলিশ সদস্য। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলেও পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রধানমন্ত্রী এদি রাম। তার বক্তব্য, সরকার পরিবর্তন করতে হলে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পথেই এগোতে হবে, বিপ্লবের মাধ্যমে নয়।
বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাম বলেন, সরকার পরিবর্তন হয় গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে। গত বছর আমাদের নির্বাচন হয়েছে, বিপ্লব হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরে নতুন করে সংঘর্ষ শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি এ মন্তব্য করেন। সেখানে ইটপাটকেল নিক্ষেপকারী তরুণদের ছত্রভঙ্গ করতে কাদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে দাঙ্গা পুলিশ। রাম বলেন, তার দায়িত্ব মানুষের কথা শোনা, যৌক্তিক উদ্বেগের সমাধান করা এবং আলবেনিয়াকে এগিয়ে নেওয়া।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্যপদ অর্জনের লক্ষ্য থেকেও সরে আসবেন না বলে জানিয়েছেন তিনি। রামের ভাষ্য, বিক্ষোভের সহিংসতার কারণে আলবেনিয়ার ইউরোপীয় ভবিষ্যৎ বাধাগ্রস্ত হতে দেওয়া হবে না। ইইউতে যোগদানের আলোচনা শেষ করার জন্য তাকে শক্তিশালী জনসমর্থন দেওয়া জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে, এমনটিও মনে করেন তিনি।
গত বছর ঐতিহাসিকভাবে চতুর্থ মেয়াদে নির্বাচিত রাম ২০৩০ সালের মধ্যে আলবেনিয়াকে ইইউর ২৭ সদস্যের জোটে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একসময় ইউরোপের সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন স্তালিনবাদী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত দেশটির জন্য এই লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও সাম্প্রতিক সহিংসতা তার দীর্ঘ শাসনের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বুধবার রাতভর বিক্ষোভকারী ও দাঙ্গা পুলিশের সংঘর্ষের পর বৃহস্পতিবার সকালে তিরানার বিভিন্ন এলাকায় দোকানের সামনের অংশ ভাঙচুর এবং ট্রাফিক সংকেত ধ্বংসের চিত্র দেখা যায়। সরকারি ভবন ও ব্যাংকে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। সংঘর্ষে আহত ৮৯ জনের মধ্যে ৬১ জনই পুলিশ সদস্য।
আলবেনিয়ার সমাজতান্ত্রিক সরকার টানা ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে। নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তিরানার আলবেনিয়ান ইনস্টিটিউট ফর পলিটিক্যাল স্টাডিজের পরিচালক আফ্রিম ক্রাসনিকি বলেন, তরুণ আলবেনীয়রা দুর্নীতি ও সরকারের ঔদ্ধত্যে ক্লান্ত। তারা আরও ভালো একটি দেশে বাস করতে চান এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে সহিংসতার পথ বেছে নিতেও ভয় পাচ্ছেন না। তবে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা অনুমান করা কঠিন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিক্ষোভকারীদের সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী রাম। বৃহস্পতিবার তিরানার অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত কলেজ অব ইউরোপ ভবন পরিদর্শনে গিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতের দিকে তাকান এবং আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে চান।
ক্ষতিগ্রস্ত ভবন দেখিয়ে রাম বলেন, যারা এই ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তারা শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করে না। তার অভিযোগ, আলবেনিয়া যখনই এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তখনই কিছু মানুষ দেশটিকে পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
শিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে তরুণদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি আছেন বলেও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। শিক্ষাব্যবস্থার খরচ বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ হলেও ভাঙচুর কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না বলে সতর্ক করেন তিনি।
আলবেনিয়ার দক্ষিণ উপকূলে বিতর্কিত পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে প্রায় পাঁচ মাস ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে আসছেন আন্দোলনকারীরা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য সংরক্ষিত উপকূলীয় এলাকা এবং জনবসতিহীন সাজান দ্বীপে নির্মাণকাজের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বন্য প্রাণী ও নাজুক বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন পরিবেশবাদীরা। এ কারণে আন্দোলনটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফ্লেমিঙ্গো বিপ্লব’। প্রকল্পের বিরোধিতার পাশাপাশি আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করছেন।
বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রকল্প থেকে সরে আসেননি রাম। তার দাবি, এটি আলবেনিয়ার জন্য একটি ‘উপহার’। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতি চাঙা হবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দেশটি বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাবে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ক্রাসনিকির মতে, আন্দোলন এখন গুরুত্বপূর্ণ এক মোড়ে পৌঁছেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আলবেনিয়ার তরুণদের বিক্ষোভেও প্রভাব ফেলেছে।
ক্রাসনিকি বলেন, সরকার মানুষের সঙ্গে কথা বলার জন্য চার মাসের বেশি সময় পেয়েছে। প্রতিদিন মানুষ রাস্তায় নামলেও সরকার তাদের দাবিকে গুরুত্ব দেয়নি। এখন শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতিতে তাদের প্রভাব বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে। তার ভাষ্য, এই প্রথম তরুণদের বলতে শোনা যাচ্ছে, গণতন্ত্র রক্ষার প্রয়োজনে তারা আহত হতে কিংবা কারাবরণ করতেও প্রস্তুত।
ক্রাসনিকির মতে, শিক্ষার্থীদের দাবি ‘ফ্লেমিঙ্গো বিপ্লব’-এর আন্দোলনকারীদের দাবি থেকে আলাদা। তারা উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো অবকাঠামো এবং তরুণদের আশাবাদী করে এমন সমাজ চান। একই সঙ্গে আলবেনিয়াকে বিক্রির জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার বিরোধিতা করছেন তারা।
ট্রাম্প পরিবারের সমর্থনপুষ্ট প্রস্তাবিত রিসোর্ট প্রকল্পটির বিনিয়োগমূল্য ৪০০ কোটি ইউরো। বাস্তবায়িত হলে এটি হবে আলবেনিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। গত সপ্তাহে প্রকল্পটি নিয়ে বিতর্কের মধ্যে কুশনার বলেন, তার বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান অ্যাফিনিটি পার্টনার্স এমন একটি দেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিচ্ছে, যেখানে আগে এ মাত্রার কোনো প্রকল্প হয়নি।
কুশনারের ভাষ্য, বিনিয়োগের কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে আলবেনিয়া ও দেশটির জনগণের ওপর আস্থা রেখেই তারা এই ঝুকি নিচ্ছেন। সফল হলে প্রকল্পটি বিপুল বিনিয়োগের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি তৈরি করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তবে পরিবেশবাদীরা প্রকল্পটির সম্ভাব্য সুফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আলবেনিয়ার অন্যতম প্রধান পরিবেশ সংরক্ষণ সংগঠন প্রোটেকশন অ্যান্ড প্রিজারভেশন অব ন্যাচারাল এনভায়রনমেন্ট ইন আলবেনিয়ার প্রধান আলেক্সান্দার ত্রাচে বলেন, কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি নিয়ে মানুষের ক্ষোভ কমেনি। অনেকের ধারণা, এর সুবিধা মূলত অভিজাত শ্রেণিই পাবে।
ত্রাচের মতে, কুশনারের প্রকল্প ঘিরে জমে থাকা ক্ষোভ বর্তমান সহিংস পরিস্থিতির পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তাঁর অভিযোগ, দিনের পর দিন বিক্ষোভকারীরা এমন একটি সরকারের ঔদ্ধত্যের মুখোমুখি হয়েছেন, যারা তাঁদের কথা শুনতে বা সামান্য ছাড় দিতেও রাজি হয়নি।
