তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ইসলামি জ্ঞান, সংস্কৃতি ও দাওয়াতকে বৈশ্বিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করেছে। মুদ্রণযন্ত্র, রেডিও-টেলিভিশনের পর ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্মার্টফোন ও এআই দাওয়াতকে আরও বিস্তৃত করেছে। একজন আলেম, গবেষক, লেখক কিংবা দাঈ (ইসলাম প্রচারক) একই সময়ে বিশ্বের লাখো মানুষের কাছে কোরআন, হাদিস, ইসলামি সাহিত্য ও নৈতিকতার বার্তা পৌঁছাতে পারছেন।
প্রযুক্তি ইসলামের বিকল্প নয়; ইসলামি জ্ঞান ও মূল্যবোধকে বিস্তৃত করার শক্তিশালী মাধ্যম। দাওয়াতের ক্ষেত্রে রয়েছে প্রযুক্তির সম্ভাবনা। দাওয়াতের মূলনীতি, উদ্দেশ্য ও নৈতিকতা কোরআন-সুন্নাহ নির্ধারণ করবে; প্রযুক্তি হবে সেই বার্তা পৌঁছানোর বাহন। দাওয়াতের ক্ষেত্রে নবী কারিম (সা.) ভাষা, চিঠি, দূত ও ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ ব্যবহার করেছেন। মাধ্যম পরিবর্তিত হলেও দাওয়াতের উদ্দেশ্য অপরিবর্তিত। আধুনিক প্রযুক্তি দাওয়াতকে ভিডিও, অডিও, পডকাস্ট, ই-বুক, পোস্ট ও অনলাইন কোর্সের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পৌঁছে দেয়। এটি একটি ‘রিচ মাল্টিপ্লায়ার।’ কিন্তু বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো আর হৃদয় ও চরিত্রে পরিবর্তন আনা এক নয়। দাওয়াতের সাফল্য ভিউ, লাইক, ফলোয়ার বা পরিসরে নয়; মানুষের জ্ঞান, নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি ও চরিত্রের ইতিবাচক পরিবর্তনে।
সে হিসেবে বলা চলে, যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রযুক্তি হতে পারে ডিজিটাল মিম্বর। সাধারণ অর্থে মিম্বর হলো- মসজিদের এমন একটি উঁচু স্থান বা সিঁড়ি, যেখান থেকে ইমাম সাহেব জুমার খুতবা বা ধর্মীয় বক্তব্য প্রদান করেন। সেই ধর্মীয় বিষয়াদী প্রচারের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহার করে যেকোনো স্থান থেকে নানা কিছু প্রচার করা সম্ভব।
মসজিদ, মাদরাসা, খানকা, গ্রন্থাগার ও পাঠচক্র ইসলামি জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্র। প্রযুক্তি এসব প্রতিষ্ঠানের জ্ঞানকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। ডিজিটাল মিম্বর হলো- ওয়েবসাইট, ইউটিউব চ্যানেল, পডকাস্ট, অনলাইন ম্যাগাজিন, ফেসবুক পেজ বা সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম; যেখানে কোরআন-হাদিস, নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি ও সমকালীন সমস্যার ইসলামি বিশ্লেষণ উপস্থাপিত হয়। এর শ্রোতা স্থানীয় নয়, বৈশ্বিক। মনে রাখতে হবে, মিম্বরের স্থান বদলেছে, দাওয়াতের উদ্দেশ্য নয়।
প্রযুক্তি ইসলামি জ্ঞানভাণ্ডার সংরক্ষণ ও সহজপ্রাপ্য করেছে, সবার নাগালে নিয়ে এসেছে। ডিজিটাল লাইব্রেরি, সার্চ ইঞ্জিন ও অনলাইন ডাটাবেজের মাধ্যমে তাফসির, হাদিস, ফিকহ ও প্রাচীন গ্রন্থ দ্রুত খুঁজে পাওয়া যায়। কোরআনের আয়াত, অনুবাদ, তাফসির, তেলাওয়াত ও বিষয়ভিত্তিক অনুসন্ধান শিক্ষার্থী ও গবেষক উভয়ের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। মুদ্রিত বইয়ের পাশাপাশি ই-বুক, অডিওবুক, ভিডিও লেকচার, ডিজিটাল আর্কাইভ ও অনলাইন কোর্স ইসলামি জ্ঞানকে আরও সহজলভ্য করেছে।
প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষকে হেদায়েতের দিকে আহ্বান করা সহজ হয়েছে। হেদায়েতের দিকে আহ্বানকারীর জন্য অনুসরণকারীদের সমপরিমাণ সওয়াবের যে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, ডিজিটাল যুগে তার সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অনলাইনে বিশুদ্ধ কোরআন-হাদিস ও কল্যাণকর জ্ঞান প্রকাশ করলে তা বহু মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে এবং ধারাবাহিকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু একইভাবে ভুল হাদিস, ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যাও দ্রুত ছড়ায়। ডিজিটাল দাওয়াত একইসঙ্গে বিশাল সুযোগ ও বড় আমানত।
প্রযুক্তির দ্রুততা যেমন শক্তি, তেমনি কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। যাচাইয়ের আগেই ভুল ধর্মীয় তথ্য, মিথ্যা ব্যাখ্যা, মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন ও ম্যালইনফরমেশন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। হাদিসের সূত্র, আলেমের বক্তব্য, কোরআনের আয়াতের প্রসঙ্গ বা সামাজিক মাধ্যমে প্রচলিত ধর্মীয় উদ্ধৃতি যাচাই ছাড়া প্রচার করা উচিত নয়। ইসলামি জ্ঞানের ক্ষেত্রে সত্যতা যাচাই অপরিহার্য। শেয়ার করার আগে যাচাই- ডিজিটাল দাওয়াহর মৌলিক নৈতিক দায়িত্ব।
মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি ধর্মীয় জ্ঞান প্রচারের পাশাপাশি ধর্মীয় কর্তৃত্বের কাঠামো বদলে দিয়েছে। এখন প্রতিষ্ঠিত আলেমের পাশাপাশি অযোগ্য ব্যক্তিও বিপুল মানুষের কাছে বক্তব্য পৌঁছাতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা ধর্মীয় যোগ্যতার প্রমাণ নয়। বেশি ভিউ, লাইক বা ফলোয়ার থাকা মানেই বেশি জ্ঞানী হওয়া নয়। অনলাইন ধর্মীয় কর্তৃত্ব কখনো প্রচলিত কর্তৃত্বকে শক্তিশালী করে, আবার কখনো চ্যালেঞ্জও করে। জনপ্রিয়তা নয়, প্রামাণিকতাই ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি।
কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম সাধারণত আবেগ, বিতর্ক, উত্তেজনা ও চমকপ্রদ কনটেন্টকে বেশি দৃশ্যমান করে। কিন্তু ইসলামি দাওয়াতের ভিত্তি হলো- হিকমাহ বা প্রজ্ঞা। অ্যালগরিদমের মনোযোগ পাওয়ার জন্য অতিরঞ্জন, বিদ্বেষ, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা মতভেদকে বিনোদনে পরিণত করলে দাওয়াতের নৈতিক উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অ্যালগরিদমকে বুঝতে হবে, কিন্তু তার দাস হওয়া যাবে না। আকর্ষণীয় কনটেন্টের সঙ্গে সত্যতা, প্রজ্ঞা ও নৈতিকতা বজায় রাখতে হবে।
আরেকপি কথা, প্রযুক্তির কল্যাণে বহু ভাষায় ইসলাম প্রচারের অভূতপূর্ব সুযোগ এসেছে। মেশিন ট্রান্সলেশন, ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং ও এআই ইসলামি জ্ঞানকে বহু ভাষায় দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বাংলা ভাষার গবেষণা বা বক্তব্য বিভিন্ন ভাষায় পৌঁছাতে পারে; একইভাবে বিদেশি ইসলামি সাহিত্য বাংলায় আনা সহজ হয়েছে। তবে কোরআন-হাদিসের অনুবাদে শব্দের পাশাপাশি প্রসঙ্গ, ব্যাকরণ, ইতিহাস ও ধর্মতাত্ত্বিক তাৎপর্য থাকে। তাই এআই অনুবাদ সহায়ক হলেও আলেম, আরবি ভাষাবিদ ও দক্ষ অনুবাদকের যাচাই প্রয়োজন। প্রযুক্তি অনুবাদকে দ্রুত করেছে; কিন্তু ধর্মীয় অনুবাদে বিশেষজ্ঞ মাধ্যমে যাচাই অপরিহার্য।
এআই কোরআনে কারিমের আয়াত অনুসন্ধান, হাদিস খোঁজা, সাহিত্য শ্রেণিবিন্যাস, অনুবাদ, বক্তৃতা লিখিত রূপ দেওয়া এবং শিক্ষাসামগ্রী তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। এআই আলেমের বিকল্প নয়। তথ্য বিশ্লেষণ করলেও এটি সবসময় সূত্রের নির্ভুলতা, ফিকহি প্রেক্ষাপট, মতভেদ, আরবি ভাষার সূক্ষ্মতা বা তাফসিরের গভীরতা সঠিকভাবে বুঝতে নাও পারে। এক্ষেত্রে সেরা মডেল হলো ‘এআই-অ্যাসিস্টেড, স্কলার-ভেরিফায়েড’- এআই প্রস্তুতি ও অনুসন্ধানে সহায়তাকারী-সহকারী; যোগ্য আলেম, বিশেষজ্ঞ ও গবেষক যাচাই করবেন ও চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রাখবেন।
