কাজের চাপে ক্লান্তি বা মানসিক মন খারাপ ঘিরে ধরেছে? নিজেকে রিফ্রেশ করতে ও মানসিক স্বস্তি ফেরাতে খুব বেশি সময় খরচ করার প্রয়োজন নেই। দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট কিছু অভ্যাস বা ‘মাইক্রোপ্র্যাকটিস’ গড়ে তুলেই নিমিষে মন ভালো করে নেওয়া সম্ভব।
সম্প্রতি নেদারল্যান্ডসভিত্তিক এক গবেষক নাটালি ভ্যান ডার ওয়ালের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলার অভিজ্ঞতা ছিল দারুণ। কথা বলার একপর্যায়ে তিনি হাসির একটি যোগ ব্যায়াম (লাফটার ইয়োগা) করালেন। প্রথমে কৃত্রিম বা ভুয়া এক ধরনের হাসি দিয়ে শুরু হলেও কিছুক্ষণ পর তা স্বতঃস্ফূর্ত ও বাস্তব হাসিতে পরিণত হলো। একসময় পেটে টান পড়ার মতো অবস্থা, অথচ হাসি থামানোই যাচ্ছিল না!
ভোর পাঁচটায় উঠে দীর্ঘ ধ্যান করা কিংবা কনকনে শীতে বরফজলে সাঁতার কাটার মতো ট্রেন্ডি সেলফ-কেয়ার পদ্ধতিগুলো বেশ সময়সাপেক্ষ। তবে একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিজেকে ভালো রাখার জন্য এত দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন নেই। মাত্র ৩০ সেকেন্ডের ছোট ছোট অভ্যাসই মন-মেজাজ চাঙ্গা করা ও শক্তি ফেরাতে চমৎকার কাজ করে। ‘মাইক্রোপ্র্যাকটিস’ গ্রন্থের লেখক ইলাই সুসম্যানের মতে, এমনই কিছু সহজ অভ্যাস যা এখনই শুরু করা যেতে পারে:
হাসির যোগ ব্যায়াম (লাফটার ইয়োগা)
কৌতুক বা কোনো মজার বিষয় ছাড়াই জোর করে হাসার চেষ্টা দিয়ে এই ব্যায়াম শুরু হয়। প্রথম দিকে বিষয়টি কিছুটা অস্বস্তিকর বা অদ্ভুত মনে হতে পারে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, হতাশা ও দুশ্চিন্তা কমাতে স্বাভাবিক কৌতুকভিত্তিক হাসির চেয়ে এই ‘ভুয়া হাসি’ দ্বিগুণ কার্যকর!
যেভাবে করবেন: পেটে হাত রেখে প্রথমে তিনটি দীর্ঘ শ্বাস নিন। এরপর কৃত্রিমভাবে হাসার চেষ্টা করুন। শুরু করতে না পারলে বলুন- ‘হি হি হি, হা হা হা’—ধীরে ধীরে শব্দ বাড়ান। খুব দ্রুতই এটি আসল হাসিতে রূপ নেবে। শেষে আরেকটি গভীর শ্বাস নিয়ে ভাবুন, জীবন আপনাকে কী দিয়েছে। সঙ্গী থাকলে একে অপরকে দেখে অনুকরণ করে হাসার চেষ্টা করতে পারেন।
মাইক্রো ইয়োগা
স্ক্রিনের সামনে একনাগাড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে কাজ করার ফলে শরীরে যে জড়তা ও মানসিক ক্লান্তি আসে, তা কাটাতে ‘মাইক্রো ইয়োগা’ বেশ কার্যকর। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১৫ মিনিটে মাত্র ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ডের জন্য একটু টানটান হয়ে বা ‘স্ট্রেচ’ করলে কাজের উৎপাদনশীলতা প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
যেভাবে করবেন: পিঠের পেছনে দুই হাতের আঙুলগুলো একটির ভেতর আরেকটি আটকে নিন। গভীর শ্বাস নিতে নিতে হাত দুটো নিচের দিকে টানটান করুন এবং বুক খানিকটা ওপরের দিকে তুলুন। শ্বাস ছাড়ার সময় ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরুন। দুই-তিনবার এই চর্চা করুন। (নতুন যেকোনো শারীরিক ব্যায়ামের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সতর্কতা বজায় রাখা ভালো।)
ধীরগতির শ্বাস-প্রশ্বাস
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপের সময় ধীর গতিতে গভীর শ্বাস নিলে শরীরের নার্ভাস সিস্টেম বা স্নায়ুতন্ত্র শান্ত হয়। এটি শরীরের রেস্ট-অ্যান্ড-ডাইজেস্ট বা আরামদায়ক অবস্থাকে জাগ্রত করে এবং মস্তিষ্কের আলফা ও থিটা তরঙ্গ বাড়িয়ে মনকে শান্ত ও মনোযোগী করে তোলে।
যেভাবে করবেন: সুবিধাজনকভাবে বসে চোখ বন্ধ করুন। প্রায় ১০ সেকেন্ড সময় নিয়ে আস্তে আস্তে ৩টি গভীর শ্বাস নিন। খেয়াল রাখবেন, শ্বাস নেওয়ার চেয়ে ছাড়ার সময় যেন একটু বেশি হয়। শ্বাস ভেতরে যাওয়া ও বের হওয়ার অনুভূতিতে মনোযোগ দিন। সারাদিনে সুযোগ পেলেই কাজের ফাঁকে বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো মিটিংয়ের আগে এটি বারবার করতে পারেন।
নিজের যত্ন ও স্পর্শ
মানুষের স্পর্শ মানসিক প্রশান্তি দেয়—এটি বহুল পরিচিত সত্য। তবে নিজেকে নিজে স্পর্শ করে বা আদর করে শান্ত করার পদ্ধতিও দারুণ কাজ করে। গবেষক সুসম্যান জানান, মাত্র ২০ সেকেন্ডের আত্ম-মনোযোগী স্পর্শ শরীরে মানসিক চাপের হরমোন ‘কর্টিসল’-এর মাত্রা অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
যেভাবে করবেন: একটি বা দুটি হাত নিজের বুকের ওপর অথবা বাহুতে আলতো করে রাখুন। একবার গভীর শ্বাস নিন। হাতের উষ্ণতা ও আলতো চাপ অনুভব করার পাশাপাশি নিজের প্রতি নিজের ভালোবাসা ও ভালোবাসাপূর্ণ চিন্তাভাবনা মনে আনুন।
সচেতন জীবনের চর্চা
সবকটি অভ্যাস যে একসঙ্গেই রপ্ত করতে হবে, তেমন কোনো কথা নেই। আপনার জীবনযাত্রার সঙ্গে যেটি বেশি খাপ খায়, সেটিই বেছে নিতে পারেন। হাঁটার সময় কিংবা থালাবাসন ধোয়ার সময়ও গভীরভাবে শ্বাস নিয়ে মাইন্ডফুলনেস বা সচেতন মনোযোগের অনুশীলন করা সম্ভব।
ছোট ছোট এই অভ্যাসে প্রতিদিনের মানসিক চাপ কমে মন হয়ে উঠবে অনেক বেশি হালকা ও প্রশান্ত।