সৌদি আরবের মক্কার একটি মসজিদ চত্বরে এক বাংলাদেশি নারীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নজরুল ইসলাম (২৫) নামের এক যুবকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। ১৪ অক্টোবর এই দণ্ড কার্যকরের ঘটনা ঘটে। একই অভিযোগে সিতি আক্তার সুইটি নামের ওই নারীরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদির আদালত। এর আগে ১১ অক্টোবর জেলাখানা থেকে মোবাইল ফোনে মা রহিমা বেগমের সঙ্গে শেষবার কথা বলেছিলেন নজরুল। এদিকে এই মর্মান্তিক খবর পাওয়ার পরদিন ১৪ অক্টোবর রাতেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান নজরুলের ফুফু আবেদা বেগম, যিনি ছোটবেলা থেকেই তাকে পরম যত্নে বড় করেছিলেন।
নজরুল ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের আব্দুল বাছির ও রহিমা বেগম দম্পতির সন্তান। চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় নজরুলই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। সংসারের অভাব-অনটন দূর করার আশায় ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর তিনি সৌদি আরব পাড়ি জমান এবং মক্কার মসজিদুল হারামে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ শুরু করেন। তবে দেশটিতে যাওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি। মসজিদ চত্বরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে দেশটির আদালতের রায়ে দীর্ঘ তিন বছরের বেশি সময় কারাবন্দি থাকার পর তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
নজরুলের মর্মান্তিক মৃত্যুতে তার পরিবারে চলছে শোকের মাতম। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে হতদরিদ্র পরিবারটি। একমাত্র ছেলের শোকে বর্তমানে শয্যাশায়ী ও প্রায় অচেতন হয়ে পড়ে আছেন বাবা আব্দুল বাছির। মা রহিমা বেগম আহাজারি করতে করতে জানান, জেলখানা থেকে ফোন করে নজরুল তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেছিল এবং সে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছিল। তিনি বলেন, আমরা ভেবেছিলাম দীর্ঘ কারাবাসের পর হয়তো আমার ছেলেকে একদিন দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু সেটি আর হলো না। আমি এখন শেষবারের মতো আমার সন্তানের মরদেহটি ছুঁয়ে দেখতে চাই এবং তা দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করছি।
এদিকে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড সহজে মেনে নিতে পারছেন না তার সহপাঠী ও এলাকাবাসী। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধুমাত্র বাংলাদেশি নাগরিক হওয়ায় পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা নিশ্চিত না করেই অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে নজরুল ও সিতির শিরোশ্ছেদ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তারা এ ঘটনায় সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসের নিষ্ক্রিয়তা ও ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নজরুলের বন্ধু মো. মাহফুজ জানান, ভাষাগত জটিলতার কারণে এবং ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়ায় নজরুল আদালতে নিজেকে নির্দোষ হিসেবে জোরালোভাবে প্রমাণ করতে পারেনি। এছাড়া প্রতিবেশী ও সৌদি প্রবাসী মো. আনোয়ার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শক্তিশালী অন্য কোনো দেশের নাগরিক হলে হয়তো বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে এতটা উদাসীনতা দেখাতে পারত না সৌদি কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে নজরুলকে সৌদি আরবে পাঠানো রিক্রুটিং এজেন্সি ‘মুছা ইন্টারন্যাশনাল’-এর কর্মকর্তা কবির জানিয়েছেন, ২০২২ সালের দীর্ঘ আগের ওই ঘটনার বিস্তারিত এখন তাৎক্ষণিকভাবে খোঁজ নিয়ে জানানো কঠিন। বর্তমানে সরকারি ছুটি চলছে এবং অফিস খোলার পরই এ বিষয়ে কথা বলা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, নিহত নজরুলের মরদেহ দ্রুত সসম্মানে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তার পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে।
