চারদিকে যতদূর চোখ যায়, কেবল জল আর জল। আর সেই জল রাশির বুক চিরে সবুজ পাতার গালিচায় মাথা তুলেছে লাল, গোলাপি ও সাদা রঙের হাজারো পদ্ম আর শাপলা ফুল। বর্ষার মেঘলা আকাশ, মৃদু বাতাসে দুলতে থাকা ফুল এবং জলের ছোট ছোট ঢেউ মিলে তৈরি করেছে এক অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য। খুলনা জেলার তেরখাদা উপজেলা ও নড়াইল জেলার আংশিক অংশ নিয়ে বিস্তৃত ঐতিহাসিক ভূতিয়ার বিল এখন প্রকৃতি প্রেমীদের কাছে রূপকথার এক রাজ্য।
ভোরের আলো ফুটতেই বিল পাড়ে শুরু হয় দর্শনার্থীদের আনাগোনা। পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনকে নিয়ে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভ্রমণ পিপাসুরা। ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় চড়ে বিলের ভেতর ঘুরে বেড়ানোর অনুভূতি যেন অন্যরকম। পানির ওপর ভাসমান পদ্ম পাতার টলটলে পানি, হোগলাবন আর কচুরিপানার ফাঁক দিয়ে নৌকার মৃদু চলাফেরা—সব মিলিয়ে এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
নৌকার মাঝি ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, পদ্মফুল ফোটার এই মৌসুমে ভূতিয়ার বিলকে ঘিরে মানুষের প্রাণচাঞ্চল্য অনেকটাই বেড়ে গেছে। গত কয়েক বছর ধরে মৌসুমে নৌকা নিয়ে দর্শনার্থীদের বিল ঘুরিয়ে দেখানোর কাজটি করছেন স্থানীয় অনেক বেকার যুবক। ফলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এটি স্থানীয় পর্যায়ে সাময়িক কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলেছে।
খুলনা শহর থেকে জেল খানা ঘাট পার হয়ে প্রায় ১৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তেরখাদা বাজার। সেখান থেকে ইজিবাইকে চরকুশলা গ্রামের এই পদ্মবিলে পৌঁছাতে সময় লাগে দেড় ঘণ্টার মতো। ছোট নৌকাগুলোর ভাড়া সাধারণত ২০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।
তবে ভূতিয়ার বিলের এই নয়নাভিরাম রূপের পেছনে লুকিয়ে আছে দীর্ঘদিনের এক কষ্টের ইতিহাস। ২০০৩ সাল থেকে প্রায় ২০ হাজার একর জমি স্থায়ী জলাবদ্ধতার মধ্যে পড়েছে। এর ফলে স্থানীয় কৃষি ও জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার শহরমুখী হয়েছে। তবে যারা গ্রামে টিকে আছেন, তাদের বড় একটি অংশ নির্ভরশীল মাছ ধরার ওপর।
ভ্রমণ করতে আসা দর্শনার্থী তামিম হাসান, প্রিয়া রহমান ও মুজাহিদুল ইসলামসহ অনেকে জানান, ডিঙি নৌকায় চড়ে পদ্ম ফুল ছুঁয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাই আলাদা। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছু অসচেতন দর্শনার্থী অযথা ফুল ছিঁড়ে প্রকৃতির এই সৌন্দর্য নষ্ট করেন।
এদিকে, দীর্ঘ জলাবদ্ধতার বেদনা এবং জীবন সংগ্রামের নানা প্রতিকূলতার মাঝেও ভূতিয়ার বিল প্রকৃতি প্রেমীদের মনে আশার আলো জ্বলেছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই বিলের অনন্য প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য দেশীয় জলজ প্রাণবৈচিত্র্য এবং জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে যদি একটি পরিকল্পিত ও টেকসই পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা যায়। তাহলে এটি হতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম সেরা আকর্ষণীয় ভ্রমণকেন্দ্র। নিরাপদ নৌযাত্রা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং দর্শনার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে একদিন ভূতিয়ার বিল কেবল ‘জলাবদ্ধতার অভিশাপ’ হিসেবে নয়, বরং সমাদৃত হবে এক অনন্য প্রকৃতি-তীর্থ বা ‘জলের ওপর ফুটে থাকা এক টুকরো স্বর্গ’ হিসেবেই।
