বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। চলতি বছরের ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে, আর প্রাণ হারিয়েছে ৩২১ জন। ডেঙ্গুর প্রধান সংক্রমণ মৌসুম এখনও শেষ হয়নি। ফলে সামনে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ অবস্থায় একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসছে- প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসরণ করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, সরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও রাজনৈতিক সংগঠন ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করার পরও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কাক্সিক্ষত সাফল্য আসছে না কেন? এই ব্যর্থতার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করতে না পারলে বিপুল অর্থ, জনবল ও সময় ব্যয় করেও ডেঙ্গুর বিস্তার কার্যকরভাবে রোধ করা সম্ভব হবে না।
ডেঙ্গু এখন আর শুধু ঢাকা বা বড় শহরগুলোর সমস্যা নয়। দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা এমনকি গ্রামাঞ্চলেও এর বিস্তার ঘটছে। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। ২০২৩ সালে দেশে তিন লাখ ২১ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল এবং মারা গিয়েছিল ১ হাজার ৭০৫ জন। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যায়, মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। ২০২৫ সালেও এক লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয় এবং ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়। বছরের পর বছর আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই ধারাবাহিকতা স্পষ্ট করে যে, ডেঙ্গুকে নিছক মৌসুমি সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে প্রচলিত পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা যথেষ্ট নয়। এটি এখন বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা ও অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ।
ডেঙ্গুতে একজন মানুষের মৃত্যু কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের দীর্ঘস্থায়ী সংকট। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা গেলে সন্তানদের শিক্ষা, পরিবারের আয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। অন্যদিকে, গুরুতর ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় হাসপাতাল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, যাতায়াত ও পরিচর্যার জন্য পরিবারকে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হয়। রোগীর পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্যদেরও কর্মস্থল থেকে ছুটি নিতে হতে পারে। এতে চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি কর্মঘণ্টা ও উৎপাদনশীলতার ক্ষতি হয়। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক, নার্স, পরীক্ষাগার ও নিবিড় পরিচর্যা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। সুতরাং ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিনিয়োগকে নিছক ব্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি মানুষের জীবন রক্ষা এবং ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানোর অপরিহার্য বিনিয়োগ। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অন্যতম কারণ খুঁজতে হলে প্রথমেই প্রশ্ন করতে হবে, আমরা কি সঠিক জায়গায়, সঠিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ করছি? বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণবয়স্ক মশা নিধন, বিশেষ করে ফগিং মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের দৃশ্যমান ও বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনকে ফগিং মেশিন নিয়ে রাস্তাঘাট, ড্রেন ও বাড়ির আশপাশে ধোঁয়া ছিটাতে দেখা যায়। কিন্তু এডিস মশার প্রজননস্থল ও আচরণ বিবেচনায় শুধু ফগিংয়ের ওপর নির্ভর করা কার্যকর সমাধান নয়। ফগিংয়ের মাধ্যমে উপযুক্ত পরিস্থিতিতে উন্মুক্ত স্থানে থাকা কিছু পূর্ণবয়স্ক মশা মারা যেতে পারে, কিন্তু এতে মশার ডিম, লার্ভা ও পিউপা ধ্বংস হয় না। ফলে প্রজননস্থল অক্ষত থাকলে সেখানে আবার নতুন মশা জন্মায়। অর্থাৎ দৃশ্যমান অভিযান চললেও মশার উৎপাদন অব্যাহত থাকতে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনসেক্ট রিয়ারিং অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশন (IRES) এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত গত দুই বছরের নিয়মিত কীটতাত্ত্বিক জরিপের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ৭০ শতাংশের বেশি এডিস মশা মানুষের বাসাবাড়ি ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনার ভেতরে বা আশপাশের জমে থাকা পানিতে জন্মায়। পানির ড্রাম, পানির ট্যাংক, মেঝেতে জমে থাকা পানি, গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান, বাড়ির বেজমেন্ট, বালতি, পানির মিটারের গর্তসহ বিভিন্ন ছোট-বড় পাত্র ও জলাধারকে গুরুত্বপূর্ণ প্রজননস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পর্যবেক্ষণের তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এডিস মশার উৎপাদনের বড় অংশ যদি মানুষের বসতবাড়ি ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে শুধু রাস্তা বা উন্মুক্ত স্থানে অভিযান পরিচালনা করে ডেঙ্গুর বাহক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এখানে একটি মৌলিক বিষয় বুঝতে হবেÑ পূর্ণবয়স্ক মশা নিধন এবং মশার উৎপাদন বন্ধ করা এক বিষয় নয়। প্রচলিত কীটনাশকের মাধ্যমে উন্মুক্ত স্থানে ফগিং বা ধোঁয়া ছড়ানো কোনো কার্যকরী পদ্ধতি নয়। মশার প্রজনন স্থল লক্ষ্য করে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য বাড়ির ভেতরে ও বাইরে জমে থাকা পানি অপসারণ, পানির পাত্র ঢেকে রাখা, পানির ট্যাংক পরিষ্কার করা, পরিত্যক্ত পাত্র সরিয়ে ফেলা এবং যেসব স্থানে পানি জমা বন্ধ করা সম্ভব নয়, সেখানে উপযুক্ত ও বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাইকৃত নিয়ন্ত্রণপদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে।
এ ধরনের কার্যক্রম সফল করতে প্রয়োজন তথ্য-উপাত্তভিত্তিক ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যনির্ভর এডিস মশা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। কোনো এলাকায় অভিযান পরিচালনার আগে জানতে হবে, সেখানে এডিস মশার ঘনত্ব কত, কোন ধরনের পাত্রে লার্ভা বেশি পাওয়া যাচ্ছে, কোন প্রজননস্থল থেকে সবচেয়ে বেশি মশা উৎপন্ন হচ্ছে এবং কোন নিয়ন্ত্রণপদ্ধতি সেখানে কার্যকর হবে। নিয়মিত কীটতাত্ত্বিক নজরদারি বা এন্টোমোলজিক্যাল সার্ভেইল্যান্সের মাধ্যমে এসব তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে তারপর নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। কোথাও যদি পানির ট্যাংক ও ড্রাম প্রধান প্রজননস্থল হয়, সেখানে এক ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে; আবার কোথাও নির্মাণাধীন ভবন, বেজমেন্ট বা পরিত্যক্ত পাত্র প্রধান সমস্যা হলে নিয়ন্ত্রণপদ্ধতিও সে অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে। সব এলাকায় একই ধরনের অভিযান পরিচালনা করলে জনবল ও অর্থ ব্যয় হলেও প্রত্যাশিত ফল না-ও আসতে পারে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কীটনাশকের কার্যকারিতা। কোনো এলাকায় ব্যবহৃত কীটনাশকের বিরুদ্ধে মশার প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হলে একই কীটনাশক বারবার প্রয়োগ করেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে না। তাই নিয়মিত কীটনাশক-প্রতিরোধক্ষমতা পর্যবেক্ষণ বা ইনসেক্টিসাইড রেজিস্ট্যান্স সার্ভেইল্যান্স চালু ও জোরদার করা জরুরি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এডিস মশার ওপর ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করতে হবে। কোনো কীটনাশক কার্যকর না হলে পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু প্রচলিত বা সহজলভ্য বলে কোনো কীটনাশক ব্যবহার করা দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর কৌশল হতে পারে না। একই সঙ্গে কীটনাশকের যথাযথ মাত্রা, প্রয়োগপদ্ধতি, সময় এবং পরিবেশগত নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। ডেঙ্গু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ায় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে ঢাকাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের করে আনতে হবে। যেসব জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি, সেখানে নিবিড় মশা জরিপ, প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ ও রোগ নজরদারি জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে যেসব এলাকায় বর্তমানে রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম, সেখানেও আগাম নজরদারি চালাতে হবে। কারণ, কোনো এলাকায় রোগীর সংখ্যা কম থাকার অর্থ এই নয় যে সেখানে ডেঙ্গুর ঝুঁকি নেই। মশার ঘনত্ব, প্রজননস্থল, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, জলাবদ্ধতা, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং মানুষের চলাচলের তথ্য সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করে এলাকাভিত্তিক ঝুঁকি নির্ধারণ করতে হবে। রোগীর সংখ্যা বাড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করে আগাম পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
এ জন্য বাংলাদেশের একটি সমন্বিত জাতীয় ডেঙ্গু ভেক্টর কন্ট্রোল পলিসি ও স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকল প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি। এই নীতিমালায় নিয়মিত কীটতাত্ত্বিক নজরদারি, উৎপাদনশীল প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ, কীটনাশকের কার্যকারিতা যাচাই, কীটনাশক-প্রতিরোধক্ষমতা পর্যবেক্ষণ, রোগ নজরদারি, ঝুঁকিভিত্তিক পরিকল্পনা, জনসম্পৃক্ততা এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রস্তুতিকে সমন্বিত করতে হবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখন আর বিচ্ছিন্ন অভিযান, সাময়িক তৎপরতা কিংবা দৃশ্যমান কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করার সুযোগ নেই। প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক, তথ্যনির্ভর, লক্ষ্যভিত্তিক এবং জবাবদিহিমূলক দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি। মশা কোথায় জন্মাচ্ছে, কোন পরিবেশে বেশি বংশবিস্তার করছে, কোন কীটনাশক কার্যকর এবং কীভাবে নতুন মশার উৎপাদন বন্ধ করা যায়, এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর খুঁজে বের করেই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজাতে হবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এত আয়োজনের পরও সাফল্য না আসার প্রশ্নটির উত্তর তাই শুধু আরও অভিযান পরিচালনা বা আরও কীটনাশক প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং আমাদের খুঁজতে হবে, বর্তমান কার্যক্রম কতটা বৈজ্ঞানিক, কতটা তথ্যনির্ভর এবং বাস্তব প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকর। এই মৌলিক পরিবর্তন নিশ্চিত করা গেলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা আরও ফলপ্রসূ হবে। অন্যথায় বিপুল আয়োজন ও ব্যয় সত্ত্বেও প্রতিবছর একই সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকবে। এখনই সময় মশা নিধনের প্রচলিত ধারণা থেকে বেরিয়ে মশার উৎপাদন বন্ধ করা, বৈজ্ঞানিক নজরদারি জোরদার করা এবং সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি ও জবাবদিহিমূলক ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলার।
অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার : কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব
