দেশে ক্যানসার গবেষণা ও চিকিৎসাপ্রযুক্তির উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের মধ্যে সমন্বিত সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ক্যানসার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয় জরুরি। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন তারা।
রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ডা. মিল্টন হলে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এ সুপারিশ করা হয়। বিএমইউর ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের ২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘অ্যাডভান্সিং ক্যান্সার এডুকেশন, রিসার্চ অ্যান্ড কেয়ার: বিএমইউ’স ভিশন অ্যান্ড লিডারশিপ’ শীর্ষক এ বৈঠকের আয়োজন করে ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ ও বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ)।
বিজ্ঞাপন
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী। চিকিৎসক, গবেষক, শিক্ষক, ওষুধশিল্পের প্রতিনিধি, চিকিৎসাপ্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকর্মীরা এতে অংশ নেন।
বৈঠকে বক্তারা বলেন, ক্যানসার চিকিৎসার উন্নয়নে শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো বাড়ালেই হবে না। প্রয়োজন দক্ষ জনবল তৈরি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়। বিএমইউতে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা গেলে চিকিৎসা, উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতার ক্ষেত্রও বিস্তৃত হবে।
অনুষ্ঠানে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, ক্যানসার শিক্ষা, গবেষণা ও চিকিৎসাসেবায় বিএমইউর নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী করতে হবে। এ জন্য উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা, দক্ষ জনবল তৈরি, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে ক্যানসার-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগ ও বিশেষায়িত সেবার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এতে উন্নত চিকিৎসা, স্নাতকোত্তর শিক্ষা, গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
বিএমইউকে ক্যানসার শিক্ষা, গবেষণা ও চিকিৎসাসেবার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উৎকর্ষকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
বৈঠকে বিএমইউর ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন বিভাগের অগ্রগতি, অর্জন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনা দেন।
তিনি বলেন, ক্যানসার চিকিৎসায় ক্লিনিক্যাল অনকোলজি, মেডিক্যাল অনকোলজি, সার্জিক্যাল অনকোলজি, প্যাথলজি, রেডিওলজি, নিউক্লিয়ার মেডিসিন ও মেডিক্যাল ফিজিকসসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। এতে রোগীর জন্য উপযুক্ত চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণ এবং চিকিৎসার মান উন্নয়নে সহায়তা মিলবে।
উপস্থাপনায় মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিউমার বোর্ডের কার্যক্রম, গবেষণাভিত্তিক চিকিৎসা এবং রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপির মতো আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ক্যানসারের বোঝা কমাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন বৈঠকে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা। তারা তামাক নিয়ন্ত্রণ, এইচপিভি টিকাদান, জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসারের স্ক্রিনিং এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন।
বক্তারা বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্ত করা গেলে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ বাড়ে। এ জন্য রোগের লক্ষণ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি স্ক্রিনিং সহজলভ্য করতে হবে। একই সঙ্গে রোগ শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে চিকিৎসা পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন ধাপের মধ্যে কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে ক্যানসারের প্রকৃত চিত্র জানতে জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যানসার নিবন্ধনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন তারা। এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে দেশে ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা, রোগের ধরন ও বিস্তারের প্রবণতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন, গবেষণা এবং চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ সহজ হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ক্যানসার চিকিৎসায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি এসব যন্ত্র পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য প্রশিক্ষিত ক্যানসার বিশেষজ্ঞ, মেডিক্যাল ফিজিসিস্ট, রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্ট, দক্ষ নার্সসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করা জরুরি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষায়িত ক্যানসার চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণে সরকারি বিনিয়োগ ও কার্যকর পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন তারা।
বৈঠকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও গবেষকেরা অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন ওষুধশিল্প এবং চিকিৎসাপ্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও।
আলোচনায় বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিক্যাল ফিজিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নতুন চিকিৎসাপ্রযুক্তি ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা উঠে আসে।
বক্তারা মনে করেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে দেশে ক্যানসার গবেষণা এবং আধুনিক চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, বিএমইউ এবং অন্যান্য চিকিৎসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যৌথ গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বানও জানানো হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক এজাজ ও সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম শুভসহ সংগঠনটির নেতারা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ক্যানসার নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা, প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে মানুষকে জানানো এবং চিকিৎসা নিতে দেরি করার প্রবণতা কমাতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ জন্য ক্যানসার প্রতিরোধ, আধুনিক চিকিৎসা ও গবেষণার অগ্রগতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য এবং বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য প্রচার করা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, ২০০৫ সালের ১৯ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত বিএমইউর ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ গত ২১ বছরে ক্যানসার চিকিৎসা, স্নাতকোত্তর শিক্ষা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি ও গবেষণায় ভূমিকা রেখেছে। বিভাগটির প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন। বিভাগটিতে রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপিসহ বিভিন্ন আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি স্নাতকোত্তর শিক্ষা, মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিউমার বোর্ড, চিকিৎসা পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও আন্তর্জাতিক একাডেমিক সহযোগিতার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
