ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে সালফারের সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। আগে যেখানে প্রতি টন সালফারের দাম ১০০-২০০ ডলারের মধ্যে ছিল, তা এখন বেড়ে প্রায় ১ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। এছাড়া সালফিউরিক অ্যাসিডের বড় সরবরাহকারী দেশ চীন রফতানি বন্ধ করে দেয়ায় বাজারে সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে
আন্তর্জাতিক বাজারে সালফারের সংকট খাদ্যেপণ্যের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করছে। সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং খনি খাতের কোম্পানিগুলোর বাড়তি চাহিদার কারণে এ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে সার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় কাঁচামাল না পেয়ে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাবে কৃষি উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি খরচের চাপ তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে সালফারের সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেল ও গ্যাস উৎপাদনের উপজাত সালফার থেকে তৈরি করা হয় সালফিউরিক অ্যাসিড। তামা উত্তোলন এবং ফসফেট সার উৎপাদনে এ অ্যাসিড গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট সালফার সরবরাহের প্রায় অর্ধেকই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।
সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আগে যেখানে প্রতি টন সালফারের দাম ১০০-২০০ ডলারের মধ্যে ছিল, তা এখন বেড়ে প্রায় ১ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। এছাড়া সালফিউরিক অ্যাসিডের বড় সরবরাহকারী দেশ চীন রফতানি বন্ধ করে দেয়ায় বাজারে সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে।
পণ্যবাজারবিষয়ক মূল্য নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান আরগাসের রাঘব জেইন বলেন, ‘সীমিত সরবরাহের মধ্যে সালফার কেনার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রয়েছে খনি কোম্পানিগুলো। ধাতুর উচ্চমূল্য থেকে বাড়তি মুনাফা এসব কোম্পানির ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু তুলনামূলক কম মুনাফার সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে সেই দামে কাঁচামাল কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মোজাইকের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যান্ডি জাং বলেন, ‘বাড়তি উৎপাদন ব্যয় কৃষকদের ওপর চাপিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। কারণ, কৃষকদের বেশি দামে সার কেনার সামর্থ্য খুবই সীমিত। এ অবস্থায় উৎপাদন কমানো ছাড়া অন্য উপায় নেই।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বজুড়ে ফসলের উৎপাদন কমতে পারে। আর উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফসফেট রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান মরক্কোর ওসিপি গত মাসে সালফারের বাড়তি দামের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানায়। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও আর্থিক চাপের কারণে তা পুরোপুরি কৃষকদের ওপর চাপাতে পারছে না। তাই কম সালফার প্রয়োজন হয়, এমন সার উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে তারা। পাশাপাশি জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল নয়, এমন বিকল্প উৎসও খুঁজছে প্রতিষ্ঠানটি।
অন্যদিকে, ধাতুর চড়া দাম খনির কোম্পানিগুলোকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। তামার দাম টনপ্রতি প্রায় ১৫ হাজার ডলারের রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও ভোক্তা ইলেকট্রনিকস পণ্যে তামার ব্যাপক ব্যবহারের কারণে চাহিদা বেড়েছে।
চিলির খনির কোম্পানি আন্তোফাগাস্তা জানিয়েছে, সালফিউরিক অ্যাসিড ও ডিজেলের দাম বাড়ায় তাদের ব্যয় বেড়েছে। তা সত্ত্বেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে কোম্পানিটির আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি ছিল।
তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলার জানিয়েছে, সালফারের বাণিজ্যে বিঘ্ন আবারও বাড়ছে। ইরান যুদ্ধ অব্যাহত থাকায় হরমুজ প্রণালিতে এখনো কিছু জাহাজ আটকে রয়েছে। ফলে সালফারের সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার অনিশ্চয়তা কাটেনি। এ সংকট দীর্ঘায়িত হলে খনি ও সার শিল্পের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন এবং ভোক্তা পর্যায়ে খাদ্যের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
