Published on
:
2 min read
সমীর মণ্ডল, মেদিনীপুর
তখন তিনি কিশোরী। তাঁর এলাকায় দেবী দুর্গার মূর্তি গড়তে এসেছিলেন তরুণ এক মৃৎশিল্পী। তন্ময় হয়ে দেখতেন তাঁর কাজ। শরতের সেই সময় একমুঠো আবির ছড়িয়ে দিয়েছিল ওই কিশোরীর মনে। সেই মৃৎশিল্পীর প্রেমে পড়েছিলেন, তার পরে বাড়ির মত নিয়েই বিয়েও হয় তাঁর। আজ থেকে তা প্রায় ৩৫-৪০ বছর আগের কথা। তারপরে স্বামীর পেশাকেও ভালোবেসে ফেলেছিলেন। ধীরে ধীরে প্রতিমা গড়ার কাজ শিখে, এখন তিনি পরিচিত প্রতিমা শিল্পী। ডেবরার বালিচকের সাবিত্রী মিশ্রের গড়া প্রতিমায় পূজিত হন দেবী দুর্গা। দক্ষ হাতে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কালী, জগদ্ধাত্রী থেকে কার্তিক, গণেশ— সবই গড়েন তিনি।
অন্তত ৩৫ বছর আগের কথা। সাবিত্রীর বাপের বাড়ি ডেবরার কালুয়া গ্রামে বাসন্তী পুজোতে প্রতিমা গড়তে এসেছিলেন সবংয়ের বলপাই এলাকার বাসিন্দা শঙ্করকুমার মিশ্র। পেশায় মৃৎশিল্পী শঙ্করকে প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে যায় কিশোরী সাবিত্রীর। প্রতিদিন দু’বেলা প্রতিমা গড়ার কাজ দেখতে ছুটে যেত সেই কিশোরী। তারপরে পরিচয়, ভালো লাগা এবং দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে। বিয়ের পর স্বামীর প্রতিমা গড়ার কাজে হাত লাগান কিশোরী বধূ। সেই থেকেই প্রতিমা গড়ার কাজে হাতেখড়ি তাঁর। প্রথমে ছোট ছোট প্রতিমা তৈরি করতেন। সবটাই স্বামীর থেকে শিখেছেন বলে জানাচ্ছেন তিনি।
একসময়ে স্বামীকে সাহায্য করতেন। এখন স্বামী শঙ্কর ও ছেলে সুব্রতই প্রতিমা গড়ার কাজে তাঁকে সাহায্য করেন। সাবিত্রীর কথায়, ‘আমার শিল্পী হয়ে ওঠার পিছনে স্বামীর অবদান সবচেয়ে বেশি। বিয়ের পরে তাঁর বাবা বালিচকে একটি ঘর ভাড়া করে দিয়েছিলেন। সেখান থেকেই দু’জনে কাজ শুরু করেন। তিনি জানাচ্ছেন, সারা বছর প্রতিমা গড়ে যা আয় হয়, তা দিয়েই সংসার চলে। তবে লড়াই সহজ নয়। আগে পাঁচ-সাতটি দুর্গা প্রতিমা তৈরির বরাত নিতেন সাবিত্রী। এ বছর নতুন জায়গায় প্রতিমা গড়ছেন। সেখানে জায়গা কম থাকায় এ বার মাত্র দু’টি দুর্গা প্রতিমা গড়ছেন। লোকবলের অভাবে ফিরিয়ে দিতে হয়েছে কিছু বরাত।
এই কাজে রোজগার নিয়মিত হয়? সাবিত্রীর আক্ষেপ, জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি প্রতিমার দাম। ফলে আয়-ব্যয়ের হিসেব মেলানো কঠিন হয়ে উঠছে। এলাকার বাসিন্দা বাপি দাস ও সন্দীপ কর বলছেন, ‘অনেক দিন ধরে প্রতিমা গড়ছেন সাবিত্রী বউদি। কঠিন বাস্তবের সঙ্গে লড়াই করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আমাদের চোখে তিনি এক অন্য দুর্গা।’
দুর্গাপুজোয় মণ্ডপে মণ্ডপে যখন দেবী দুর্গার আরাধনা চলে, তখন মাটির প্রতিমা গড়ার আড়ালে থেকে যায় সাবিত্রীর মতো শিল্পীদের জীবনসংগ্রাম। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে, সীমিত সামর্থ্যকে সম্বল করে সাবিত্রীর নিরন্তর লড়াই প্রমাণ করে শক্তির আরাধনা শুধু মণ্ডপে নয়, বাস্তবের মাটিতেও হয়।