চলতি বছর ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের সবচেয়ে বড় অংশ বয়সে তরুণ। ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী রোগীরা মোট ভর্তির ৪২ শতাংশ। মৃত্যুর হিসাবেও তরুণদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। তরুণদের বেশি আক্রান্ত হওয়ার জন্য প্রথাগতভাবে বাইরে বেশি থাকাসহ কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করা হয়ে থাকে। তবে তরুণ বয়সী ও পুরুষদের বেশি আক্রান্ত হওয়া এবং নারীদের মৃত্যু বেশি হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলতি বছরে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ২৫৯ জন। মৃত্যু হয়েছে ৩৩১ জনের। রোগীদের মধ্যে ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সী ১৪ হাজার ৫২২ জন, ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সী ১৫ হাজার ৩৮২ এবং ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী ১৫ হাজার ১৯৫ জন। তিন বয়সগোষ্ঠী মিলিয়ে রোগী ৪৫ হাজারের কিছু বেশি, যা হাসপাতালে
ভর্তি হওয়া মোট রোগীর ৪২ শতাংশ, অর্থাৎ অর্ধেকের কাছাকাছি। প্রসঙ্গত, ১৬-৩০ বয়সগোষ্ঠীতে পুরুষ রোগীর সংখ্যা নারীর প্রায় দ্বিগুণ।
১৬ থেকে ৩০ বয়সগোষ্ঠীর পরে যেসব রোগী সংখ্যায় বেশি, তাঁরাও প্রাপ্তবয়স্ক। ৩১ থেকে ৩৫ বছর বয়সের রোগী সাড়ে ১০ হাজার এবং ৩৬ থেকে ৪০ বছর বয়সী সাড়ে ৯ হাজার। ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সী রোগী সাড়ে ১২ হাজার। আর ৫১ বছর বা তার বেশি বয়সী রোগী ১২ হাজার।
অন্যদিকে শিশুদের মধ্যে রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। শূন্য থেকে ৫ বছর এবং ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী রোগীর সংখ্যা সাড়ে ৫ হাজার করে প্রায় ১১ হাজার। আর ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সী রোগী সাড়ে ৬ হাজারের বেশি।
ঢাকার আশুলিয়ায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন ২৪ বছর বয়সী সজীব হোসেন (ছদ্মনাম)। ছয় দিন জ্বরে ভোগার পর সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তিনি ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রথম পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা না পড়লেও দ্বিতীয় দফায় ////////////ইমিউনোগ্লোবুলিন///////////// জি-আইজিজি ও ///////////////ইমিউনোগ্লোবুলিন/////////// এম-আইজিএম পরীক্ষায় সংক্রমণ নিশ্চিত হয়। সজীবের ছিল তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা ও বমি। সাত দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন তিনি।
অন্যদিকে ঝিনাইদহের শৈলকুপার বাসিন্দা ২৩ বছর বয়সী অপূর্বকুমার রায় (ছদ্মনাম) গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর ডেঙ্গু শক সিনড্রোম (ডেঙ্গুজনিত সংজ্ঞাহীনতা) দেখা দেয়। হাসপাতালে ভর্তির পরদিনই অপূর্বর মৃত্যু হয়।
অবশ্য রোগতত্ত্ববিদেরা বলছেন, শুধু হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যার ভিত্তিতে পাওয়া এই হিসাবকে সরাসরি বয়সভিত্তিক আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, সব বয়সগোষ্ঠীর জনসংখ্যা সমান নয়। কোনো বয়সে রোগী বেশি পাওয়ার অর্থ ওই বয়সে আক্রান্ত হওয়ার হারও বেশি—এমন সিদ্ধান্তে যেতে হলে সংশ্লিষ্ট বয়সগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যার বিপরীতে রোগীর সংখ্যা হিসাব করতে হবে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে ডেঙ্গু রোগী বেশি পাওয়া নতুন কোনো প্রবণতা নয়। কারণ, এই বয়সের মানুষ পড়াশোনা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে তুলনামূলক বেশি বাইরে থাকেন। ফলে তাঁদের এডিস মশার সংস্পর্শে আসার আশঙ্কাও বেশি থাকে। তবে ঠিক কোন কারণে এই বয়সগোষ্ঠীতে আক্রান্তের হার বেশি, তা নিশ্চিতভাবে জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।’
জ্যেষ্ঠ এই রোগতত্ত্ববিদ বলেন, ‘বর্তমানে দেশে ডেঙ্গুর যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তা মূলত হাসপাতালভিত্তিক নজরদারির ফল। ফলে হাসপাতালে না আসা রোগী বা হালকা উপসর্গে থাকা রোগীদের বড় একটি অংশের তথ্য নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে।’
তরুণদের মধ্যে পুরুষ রোগী বেশি
সরকারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী রোগীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি। ১৬-২০ বছর, ২১-২৫ এবং ২৬-৩০ বছর—এই তিন বয়সগোষ্ঠীতে পুরুষ রোগীর সংখ্যা নারীর প্রায় দ্বিগুণ। পুরুষদের আক্রান্তের সংখ্যা তুলনায় এত বেশি হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ সরকারি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় না। এডিস মশা মূলত দিনে কামড়ায় এবং তরুণেরা পেশাগত ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে দিনের বেশির ভাগ সময় বাইরে কাটান। ফলে তাঁদের মশার সংস্পর্শে বেশি যাওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে এটিকে পুরুষের আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হওয়ার বৈজ্ঞানিক কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা।
নারীর মৃত্যু বেশি
ডেঙ্গুতে আক্রান্তের তুলনায় নারীদের মৃত্যুর হার বেশি। গত কয়েক বছর ধরে এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে মৃতদের ৫৭ শতাংশ ছিলেন নারী। ২০২৪ সালে নারী রোগী ৬ শতাংশ হলেও মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে তাঁদের অংশ ছিল ৫১ শতাংশ। আবার ২০২৫ সালে নারী রোগী ৩৭ শতাংশ হলেও মোট মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে নারী ছিলেন ৪৮ শতাংশ।
নারীদের মৃত্যু বেশি হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ বলতে গেলেও বিশদ বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক আবু জামিল ফয়সাল। তিনি বলেন, ‘এর বৈজ্ঞানিক কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। রোগী হওয়া থেকে শুরু করে চিকিৎসা নেওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে নারীরা অবহেলার শিকার হয়ে থাকতে পারেন। পরিবারের পাশাপাশি নিজেদের অসচেতনতা ও অবহেলাও এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।’
মোট মৃত্যুতেও তরুণেরা বেশি
বয়সভিত্তিক মৃত্যুর হিসাবেও চলতি বছরে তরুণদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। মোট মৃত্যুর ২৬ শতাংশই ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী। ২৬-৩০ বছর বয়সী ৪৩ জন, ২১-২৫ বছর বয়সী ২২ এবং ১৬-২০ বছর বয়সী ২২ জন ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। সব মিলিয়ে ৮৭ জন। আর সব বয়স মিলিয়ে এ পর্যন্ত মোট মৃত্যু ৩৩১ জনের।
তবে অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো এ ব্যাপারেও রোগতত্ত্ববিদেরা বিশদ তথ্য ছাড়া এই বয়সগোষ্ঠীতে মৃত্যুঝুঁকি বেশি—এমন সিদ্ধান্ত দিতে রাজি নন। তাঁরা বলেছেন, এ জন্য প্রতিটি বয়সগোষ্ঠীর আক্রান্তের বিপরীতে মৃত্যুর অনুপাত বা কেস ফেটালিটি রেশিও (সিএফআর) হিসাব করতে হবে।
কারণ খুঁজছে আইইডিসিআর
ডেঙ্গুতে তরুণ জনগোষ্ঠী ও পুরুষদের বেশি আক্রান্ত হওয়া এবং নারীদের মৃত্যু বেশি হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখছে আইইডিসিআর। ডেঙ্গু ভাইরাসের ধরন, চিকিৎসা নিতে বিলম্ব, রোগের জটিলতা কিংবা চিকিৎসাব্যবস্থার ঘাটতি—মৃত্যুতে কোনটি কতটা ভূমিকা রাখছে, তা মাঠপর্যায়ের তথ্য ও পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণায় বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আইইডিসিআরের পরিচালক কাজী আহমেদ জাকী বলেন, ‘এ বছর ডেঙ্গুতে মৃতদের “ডেথ রিভিউ” (মৃত্যুর ঘটনা পর্যালোচনা) করা হবে। নারীদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণসহ মৃত্যুর ধরন বুঝতে এ নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে।’
কাজী আহমেদ জাকী জানান, ২০২৩ সালে অনেক রোগী শেষ পর্যায়ে হাসপাতালে এসেছিলেন। অনেকে ওষুধের দোকান বা অপচিকিৎসকের কাছ থেকে স্যালাইন বা ওষুধ নিয়ে সময় পার করেছেন। তাঁদের অনেকের হাসপাতালে আসার ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ‘শকে’ বা একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে মৃত্যু হয়েছে। এবার মৃত রোগীদের চিকিৎসার নথি সংগ্রহ, স্বজনদের সঙ্গে কথা বলা এবং চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা হবে। রোগী কখন অসুস্থ হয়েছেন, হাসপাতালে কখন এসেছেন, চিকিৎসায় বিলম্ব বা ঘাটতি ছিল কি না এবং নির্ধারিত চিকিৎসাপদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।
রোগী বৃদ্ধি সামলাতে প্রস্তুতি
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল মাত্র ৩ হাজার ১৯৭ জন। জুনে ভর্তির সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে হয় ২ হাজার ৯০৭। এর পর থেকে জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬, আগস্টে ২০ হাজার ৫৩৬ ও সেপ্টেম্বরে ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। আর চলতি অক্টোবরের প্রথম ১৫ দিনেই সাড়ে ২৭ হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মধ্যে সরকারি হাসপাতালগুলোতে বাড়তি প্রস্তুতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, প্রয়োজনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে শয্যা বাড়াতে বলা হয়েছে। কুর্মিটোলা মাল্টিডিসিপ্লিনারি হাসপাতালকেও প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) নুরুল ইসলাম বলেন, ‘রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত শয্যা চালুর প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটের কিছু রোগী জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া সম্ভব হলে ওই ইউনিটে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য শয্যা বাড়ানো যাবে।’
