ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রচলিত বোমা ‘মাদার অব অল বোম্বস’ ব্যবহারের পরিকল্পনা তৈরি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর নির্দেশ দিলে এই বোমা ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। বৃহস্পতিবার মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে সিএনএন। এদিকে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বেড়ে যাওয়ার মধ্যে ওমান সাগরের নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করা একটি তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন লাগার কথা জানিয়েছে ইরানের নৌবাহিনী। একই সময়ে প্রণালিটিতে দুটি জাহাজ ডুবে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর একটিতে কোনো প্রক্ষেপণাস্ত্র বা ক্ষেপণাস্ত্রজাতীয় বস্তু আঘাত হানে এবং অন্যটি সমুদ্রের মাইনে আঘাত পেয়ে ডুবে যায় বলে জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন হামলার পরিকল্পনা ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে সৌদি আরবের মদিনা অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে সৌদি
নেতৃত্বাধীন জোট। তবে ইয়েমেনের হুথিরা সৌদি আরবে বৃহস্পতিবার কোনো হামলা চালানোর কথা অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও বন্দরে হুথিদের হামলার চেষ্টার অভিযোগ তুলেছে জোটটি। ইয়েমেনের তাইজে একাধিক ফ্রন্টে তীব্র লড়াই অব্যাহত রয়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট (এমওএবি) বোমা ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে পরিকল্পনা করেছে। বোমাটি ‘মাদার অব অল বোম্বস’ নামে পরিচিত। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের সবচেয়ে বড় অ-পারমাণবিক বোমা।
এদিকে ইরানও সামরিক প্রস্তুতি বাড়িয়েছে। দেশটি সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে এবং আরও কিছু নতুন অস্ত্র উন্মোচনের হুমকি দিয়েছে। তেহরান যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক সরকারগুলোকে সতর্ক করে বলেছে, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তা আরও বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমনকি স্থলপথেও অভিযান চালানোর আশঙ্কা রয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তহীন যুদ্ধ কিংবা দীর্ঘস্থায়ী আলোচনা— কোনোটিই তেহরানের লক্ষ্য নয়। তবে ওয়াশিংটন ইরানের দাবিগুলো মেনে না নেওয়া পর্যন্ত দেশটি লড়াই চালিয়ে যাবে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও বলেছেন, বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে কোনো দেশ বা সমাজকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায় না। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনার বরাতে তিনি বলেন, ‘আমরা যদি বিভক্ত হয়ে পড়ি এবং দেশের ভেতর থেকেই বিভক্ত হই, তাহলে শত্রু তার লক্ষ্য অর্জন করবে।’
পেজেশকিয়ান আরও বলেন, সামনে যেসব কঠিন পরিস্থিতি আসবে, সেগুলো মোকাবিলায় জাতীয় সংহতি ও ঐক্য শক্তিশালী করার উপায় খুঁজে বের করতে হবে এবং সবাইকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে।
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বেড়ে যাওয়ায় তেল পরিবহনে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের নৌবাহিনী জানিয়েছে, ওমান সাগরের নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করার সময় একটি তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন ধরে যায়। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন দেশটির নৌবাহিনীর বরাত দিয়ে জানায়, ট্যাংকারটি তার অবস্থান শনাক্ত করার ব্যবস্থা বন্ধ করে নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করেছিল।
ইরানের নৌবাহিনী জাহাজটিকে নিয়ম লঙ্ঘনকারী হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে, নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টার সময় সেটিতে আগুন লাগে। তবে জাহাজটির নাম, আগুনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিংবা হতাহতের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
এদিকে হরমুজ প্রণালির কাছে দুটি জাহাজ ডুবে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর একটি ক্ষেপণাস্ত্রজাতীয় বস্তুর আঘাতে এবং অন্যটি সমুদ্রের মাইনে আঘাত পেয়ে ডুবে গেছে বলে জানানো হয়েছে। এসব হামলার কারণে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটিতে জাহাজ চলাচল আরও ব্যাহত হচ্ছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নজরদারি বাড়াতে নতুন নৌ ইউনিট মোতায়েন করেছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানানো হয়েছে, নতুন ইউনিটগুলো প্রণালি, ওমান সাগর ও আরব সাগরে শত্রুপক্ষের তৎপরতা এবং সামুদ্রিক যান চলাচলের ওপর তাৎক্ষণিক নজরদারি চালাবে।
সামুদ্রিক পরিবহন পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে ১০টি তেলবাহী ট্যাংকার হামলার শিকার হয়েছে। ৫ অক্টোবর আরও একটি জাহাজে হামলা হয়। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) কেন্দ্র ৬ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত পৃথক আরও ১৫টি হামলার তথ্য নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে গত চার দিনেই ১১টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
হামলার প্রভাব পড়েছে তেল পরিবহনেও। কেপলারের তথ্য বলছে, ৮ অক্টোবর হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রায় ২ কোটি ৮ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছিল। কিন্তু ১১ অক্টোবর তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ২৯ লাখ ব্যারেলে।
ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং ইরানের বন্দরগুলোতে ওয়াশিংটনের অবরোধের জবাব হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, মার্কিন বাহিনী ও আঞ্চলিক অংশীদাররা প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে দুই পক্ষের বিপরীতমুখী অবস্থানের মধ্যে নৌপথটিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।
ইরানের সেনাবাহিনীর উপসমন্বয়ক রিয়ার অ্যাডমিরাল হাবিবোল্লাহ সায়ারি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ রয়েছে। সমন্বয় ছাড়া যারা এই প্রণালি দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করবে, তাদের পরিণতি কী হবে, তা তারা নিজেরাই দেখতে পাবে। ইরানের মেহের সংবাদ সংস্থার বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই নিরাপত্তারক্ষী নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী এডেনে অবস্থিত আল-মাশিক প্রাসাদে এ হামলা হয়। হামলায় পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী মুয়াম্মার আল-এরিয়ানি। তবে হামলার পর প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সব সদস্য নিরাপদে রয়েছেন বলে জানিয়েছে সরকার।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের মন্ত্রিসভা বলেছে, এডেনের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে হামলা হুথিদের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা সৃষ্টির তৎপরতারই অংশ। তাদের দাবি, তাইজ ও লাহিজের বেসামরিক এলাকায় এবং সৌদি আরবেও হামলা চালানো হচ্ছে।
এদিকে ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে হুথিদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। সরকারপন্থি হোমল্যান্ড শিল্ড ফোর্স জানিয়েছে, তারা সাউদার্ন জায়ান্টস ব্রিগেডের সঙ্গে মিলে তাইজ প্রদেশের উপকূলীয় শহর ধুবাবের বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। বিমানবন্দরটি লক্ষ্য করে হুথিদের হামলা প্রতিহত করা হচ্ছে বলেও দাবি করেছে বাহিনীটি।
সৌদি আরবের মদিনা অঞ্চলে একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ধ্বংস করার দাবি করেছে ইয়েমেনে লড়াইরত সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানান। তবে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, বৃহস্পতিবার সৌদি আরবে কোনো হামলা চালানো হয়নি।
অন্যদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট অভিযোগ করেছে, হুথিরা সৌদি আরবের কয়েক ডজন বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও বন্দরে হামলার চেষ্টা করেছে। রিয়াদে এক সংবাদ সম্মেলনে আল-মালিকি বলেন, সৌদি আরবের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১ অক্টোবর থেকে অন্তত ২০টি হামলা হয়েছে। ৭ থেকে ১১ অক্টোবরের মধ্যে বিমানবন্দরটিতে হুথিদের হামলায় ১৭ জন নিহত এবং ৩৩৩ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। ১০ অক্টোবরের হামলায় ১০টি ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য প্রক্ষেপণাস্ত্রজাতীয় বস্তু ব্যবহার করা হয়েছিল বলেও জানান জোটের মুখপাত্র।
আল-মালিকি আরও বলেন, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট পাহাড়ি এলাকায় হুথি মিলিশিয়াদের ১২৭টি অস্ত্রের গুদাম ধ্বংস করেছে। তার দাবি, কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ চালাতে ১০টি ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে হুথিদের হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জোটের মুখপাত্রের অভিযোগ, আঞ্চলিক কয়েকটি পক্ষের সহায়তায় হুথিরা উন্নত প্রযুক্তি অর্জন করেছে। তার ভাষায়, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, আক্রমণকারী ড্রোন ও বিস্ফোরকবাহী দ্রুতগতির নৌযান ব্যবহারকারী প্রথম সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হলো হুথিরা। হুথিদের হুমকি মোকাবিলায় জোটের প্রয়োজনীয় সব সক্ষমতা রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ইয়েমেনের বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে তাইজে একাধিক ফ্রন্টে তীব্র লড়াই চলছে। সংঘর্ষে সব পক্ষের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। তবে হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা কিংবা সংঘর্ষের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, হুথিরা আঞ্চলিক পক্ষগুলোর সহায়তায় উন্নত সামরিক প্রযুক্তি অর্জন করেছে। অন্যদিকে হুথিদের হামলা ও পাল্টা সামরিক তৎপরতা ইয়েমেনের সংঘাতকে আরও বিস্তৃত অঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
অন্যদিকে মার্কিন সামরিক অভিযানের তথ্য সংবাদমাধ্যমে ফাঁসকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অ্যারিজোনায় এক নির্বাচনী সমাবেশে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানসংক্রান্ত তথ্য সংবাদমাধ্যমে ফাঁসকারীদের ‘গুলি করে হত্যা করা উচিত’।
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সময়সূচি নিয়ে সাংবাদিকদের কাছে তথ্য ফাঁস করার অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ট্রাম্প। তবে তিনি অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম প্রকাশ করেননি। ট্রাম্প বলেন, তথ্য ফাঁসকারীদের ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত। অতীতে এ ধরনের অপরাধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এভাবেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
