সবজি চাষে বারবার লোকসানের মুখে পড়ে নতুন সম্ভাবনার খোঁজে ইউটিউবের সহায়তা নেন মেহেরপুরের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা মিঠু। ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে দেড় বিঘা জমিতে শুরু করেন বিদেশি ফল আনারকলির চাষ। মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই গাছে ফুল ও ফল আসতে শুরু করেছে। এ পর্যন্ত তার ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টাকা। সবকিছু অনুকূলে থাকলে এবার ফল বিক্রি করে ১০ লাখ টাকা আয়ের আশা করছেন তিনি।
মেহেরপুর সদর উপজেলার গোভীপুর গ্রামের এই কৃষকের বাগানে এখন গাছে গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে লালচে-বেগুনি রঙের আনারকলি। নতুন ধরনের এ ফলের চাষ দেখতে এবং পদ্ধতি জানতে তার বাগানে ভিড় করছেন আশপাশের কৃষকেরা।
মিঠু আগে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করতেন। কিন্তু উৎপাদন খরচ বেশি হওয়া এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তাকে বারবার লোকসানের মুখে পড়তে হতো। একপর্যায়ে ইউটিউবে আনারকলি চাষের ভিডিও দেখে এ ফল উৎপাদনে আগ্রহী হন তিনি। পরে খোঁজখবর নিয়ে নিজের দেড় বিঘা জমিতে মাচা পদ্ধতিতে চাষ শুরু করেন।
মিঠু বলেন, ‘চারা রোপণ, মাচা তৈরি ও পরিচর্যাসহ এখন পর্যন্ত আমার প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। গাছ লাগানোর ছয় মাসের মধ্যেই ফুল ও ফল আসতে শুরু করেছে। গাছে গাছে থোকায় থোকায় ফল ধরেছে। বাজারে প্রতি কেজি আনারকলি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। সবকিছু ঠিক থাকলে এবার প্রায় ১০ লাখ টাকার ফল বিক্রি করতে পারব বলে আশা করছি।’
তিনি জানান, এ ফল চাষে তুলনামূলকভাবে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কম। জৈব সার ব্যবহার করে ভালো ফলন পাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। একটি গাছ থেকে কয়েক দফায় ফল সংগ্রহ করা যায়। এ কারণে ভবিষ্যতে আনারকলির চাষ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার।
মিঠু বলেন, ‘আমার বাগানের ফল দেখতে এবং চাষপদ্ধতি জানতে অনেকেই আসছেন। তাদের আগ্রহ দেখে ভালো লাগছে। আমি মনে করি, কৃষকেরা প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি নতুন ও লাভজনক ফল চাষে এগিয়ে এলে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।’
নতুন ফল চাষে আগ্রহী কৃষকেরা
মিঠুর বাগান দেখে আনারকলি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন এলাকার অন্য কৃষকেরাও। তাদের মতে, প্রচলিত ফসলের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে বিকল্প ফসলের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
কৃষক আরিফ হোসেন বলেন, ‘আমরা সাধারণত ধান, পাট ও বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করি। কিন্তু অনেক সময় উৎপাদন খরচ অনুযায়ী বাজারে দাম পাওয়া যায় না। এতে লোকসানের মুখে পড়তে হয়। মিঠু ভাইয়ের আনারকলি বাগান দেখে নতুন করে আশাবাদী হয়েছি। অল্প সময়ের মধ্যে গাছে ফল আসছে, আবার বাজারে দামও ভালো বলে জানতে পেরেছি। তাই আমিও আনারকলি চাষের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি। কৃষি বিভাগের পরামর্শ পেলে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু জমিতে এ ফল চাষ শুরু করতে চাই।’
আরেক কৃষক বশির আহমেদ বলেন, ‘বর্তমানে কৃষিতে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি—সবকিছুর পেছনে বেশি টাকা ব্যয় করতে হয়। কিন্তু ফসল বিক্রির সময় অনেক ক্ষেত্রে ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না। মিঠুর আনারকলি চাষের কথা শুনে এবং তার বাগান দেখে আমারও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ফলটি কয়েক দফায় সংগ্রহ করা যায় বলে বিষয়টি সম্ভাবনাময় মনে হচ্ছে। তবে চাষ শুরুর আগে উৎপাদন খরচ, রোগবালাই ও বাজারজাতকরণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই। সবকিছু অনুকূলে থাকলে আমিও এ চাষে যুক্ত হব।’
কৃষক মিনারুল ইসলাম বলেন, ‘মেহেরপুরের মাটিতে নতুন ধরনের ফল চাষ করে মিঠু যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা আমাদের মতো কৃষকদের জন্য অনুপ্রেরণা। আমরা অনেক সময় একই ধরনের ফসল চাষ করি। ফলে বাজারে দাম কমে গেলে ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। আনারকলির মতো নতুন ফল চাষের মাধ্যমে সেই ঝুঁকি কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। আমি এ ফলের চাষপদ্ধতি, চারা সংগ্রহ ও পরিচর্যা সম্পর্কে জানতে চাই। কৃষি বিভাগ থেকে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ পেলে আগামী মৌসুমে জমির একটি অংশে আনারকলি চাষের পরিকল্পনা আছে।’
চাষ সম্প্রসারণে পরামর্শ দেবে কৃষি বিভাগ
মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কাজী শাহনেওয়াজ বলেন, ‘আনারকলি একটি পুষ্টিকর ও সম্ভাবনাময় ফল। মেহেরপুরের মাটিতে এ ফলের চাষ সম্প্রসারণের সুযোগ আছে। কৃষক মিঠু ইউটিউব দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে আনারকলি চাষ শুরু করেছেন এবং ভালো ফলন পাচ্ছেন বলে জানান। নতুন ও লাভজনক ফসল চাষে কৃষকদের আগ্রহী করে তুলতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এ ধরনের ফসল চাষের আগে কৃষকদের মাটির উপযোগিতা, চাষপদ্ধতি, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং বাজারজাতকরণ সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হবে। পাশাপাশি বাজারের চাহিদা ও উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নিয়ে চাষের পরিকল্পনা করা জরুরি। সঠিক পরিচর্যা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষি বিভাগের পরামর্শ কাজে লাগাতে পারলে আনারকলি চাষ কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।’
চাষ শুরু করার আগে সঠিক জাত নির্বাচন, পরিচর্যা, বাজারের চাহিদা ও বিক্রির ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া জরুরি। টক-মিষ্টি স্বাদের এ ফল দেখতে ও স্বাদ নিতে যেমন মানুষ মিঠুর বাগানে আসছেন, তেমনি চাষপদ্ধতি জানতে আগ্রহী কৃষকেরাও তার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করছেন। তাদের কেউ কেউ আগামী মৌসুমে পরীক্ষামূলকভাবে আনারকলি চাষের পরিকল্পনা করছেন।
এসি/আপ্র/১৪/১০/২০২৬
