সংবাদ · সাধারণ
অতিযাপনের ক্ষয়ক্ষতি: চেতনার নান্দনিক অভিব্যক্তি
২৩/১০/২০২৬

জীবন হচ্ছে যাপনের অনিন্দ্য ক্ষেত্র। নানা উপলক্ষ এবং অনুষঙ্গ এই যাপনকে জীবনময় করে তোলে। কিন্তু সেই যাপনে যখন অতিরিক্ত ও অনভিপ্রেত শক্তি ও সংঘাতের সংযোগ ঘটে তখন তা অতিযাপনের জীবনচিত্র তৈরি করে। অতিযাপনের চক্রে জীবন তখন হারিয়ে ফেলে তার সৌন্দর্য ও স্বাভাবিকতা। জীবনের অতিযাপন সবসময় ব্যক্তির কারণে ঘটে, তা নয়। কখনও অতিরিক্ত নগর সভ্যতা জীবনকে অতিযাপনের মুখোমুখি করে আর কখনওবা অনভিপ্রেত সময় এসে জীবনের সহজ সুমধুর গতিকে আক্রান্ত করে বসে। ফলে ব্যক্তি তখন না চাইলেও অতিযাপনের বিড়ম্বনায় আক্রান্ত হতে পারে। প্রাথমিক নির্মাণকাল পেরিয়ে লব্ধপ্রতিষ্ঠ হওয়ার পথে এগিয়ে যাওয়া কবি সৌম্য সালেকের সাম্প্রতিক প্রকাশিত এ কাব্যের শিরোনাম দেখেই মনের মধ্যে তৈরি হলো অতিযাপনের জীবনচিত্র। ‘অতিযাপনের ক্ষয়ক্ষতি’ নামের এ গ্রন্থটি তার নামরূপের কারণেই মনোযোগ টেনে নেয় নিজের দিকে। মোট বায়ান্নটি সাম্প্রতিক কবিতা রয়েছে গ্রন্থে। কবির জন্মক্ষণে মৃত কন্যা ইসরাকে উৎসর্গ করে মলাটবদ্ধ হওয়া গ্রন্থটি তাই সূচনাতেই গভীর বেদনায় মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে। যে মুহূর্তে গ্রন্থটি পাঠে মনোযোগী ছিলাম ঠিক সে সময়েই বাংলাদেশজুড়ে হামের টিকার অভাবে নিষ্পাপ শিশুদের অমরলোকে গমনের হিড়িক আমায় ইসরাকে হারানোর বেদনার কথা মনে করিয়ে দেয়। যদিও ইসরা হামাক্রান্ত ছিলো না। কবির অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মতো এ গ্রন্থটিও নামকরণের অভিনবত্বে জ্যোতির্ময়। মনে হয় এ যেন ‘আত্মখুনের স্কেচ’, ‘পাতাঝরার অর্কেস্ট্রা’, ‘ঊষা ও গামিনি’, ‘পার্কবেঞ্চের কবিতা’ কিংবা ‘শিরঃপীড়া ও অন্যান্য সংবেদ’-এর এক যথার্থ সিকুয়েল। কবিতাগুলো নিমগ্ন পাঠশেষে এককথায় বলতে হয়, এ গ্রন্থটি কবির একধরনের কনফেশন। কেননা, কবি তার জীবনকে কাঙ্ক্ষিত শান্তি ও স্বস্তির সাথে যাপন করতে পারেননি বলে মনে করেছেন। তার এ গ্রন্থের শিরোনামীয় কবিতাটি কলকাতায় বসে লেখা। এ কবিতায় তিনি হেমন্তে হঠাৎ বৃষ্টিতে জলমগ্ন আধুনিক কলকাতার বিড়ম্বনা ও ভোগান্তির পটভূমিতে নিজের হৃদয়ের দুর্দশাকে তুলে ধরেছেন। বৃটিশ আমল থেকেই সাংস্কৃতিক রাজধানীর তকমা পাওয়া শহরটি কখন যে অতিযাপনের ভিড়ে অনাবাসযোগ্য হয়ে উঠেছে তা কবি আন্দাজ করতে পারেননি। কিন্তু গুলশান লজে বসে লেখা অতিযাপনের অনুশোচনার বিলাপপত্রে এটা তিনি স্পষ্ট করেছেন, যে প্রশান্তি সন্ধানে, যে শান্তি ও স্বস্তির অন্বেষণে তিনি জীবনকে যাপনের আশায় এত পথ-পরিক্রমণ করেছেন তাতে কেবল আয়ুক্ষয়ের দুঃখ লেগে আছে, জীবনকে যাপন করার প্রাপ্তি নেই মোটেই। সভ্যতার যান্ত্রিকতা আর উচ্চাভিলাষ জীবনকে জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং জীবনকে করে তুলেছে সাম্রাজ্যবাদী সভ্যতার গিনিপিগ। এ গ্রন্থের আরও কিছু কবিতায় কবির এ অতিযাপনের বিলাপ ও কনফেশন ফুটে উঠেছে। এ ধারার কবিতাগুলোর মধ্যে ‘দাঙ্গার অভিপ্রায়’, ‘যারা মারতে বা মরতে এসেছে’, ‘সর্বনাশ হয়ে গেছে’, ‘যাপনের মদিরা’ কবিতাগুলো উল্লেখযোগ্য। যদিও ‘সর্বনাশ হয়ে গেছে’ নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতার ছাঁচে গড়া বলে মনে হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, কবির ‘মকর’ কবিতাটি পাঠ করলে মনে হয়, কবিও বুঝি কাফকায়েস্কে আক্রান্ত। কবির বক্ষ্যমাণ কাব্যগ্রন্থের একটা বিশেষ প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায় যাতে তিনি কবিতাগুলোর জন্মস্থান ও জন্মতারিখ চিহ্নিত করার প্রয়াস পেয়েছেন। অধিকাংশ কবিতারই জন্ম কবির ঢাকার টিকাটুলির বাসায়। কিছু কিছু কবিতার জন্ম হয়েছে প্রবাসে পরিব্রাজনে। জন্মতারিখ ও জন্মস্থান চিহ্নিত থাকায় কবিতাগুলোর রচনা-রসায়নের হদিশ পাওয়াটা সহজ হয়ে উঠেছে আপাতভাবে। কবির কিছু কিছু কবিতা পাঠে বোঝা যায়, তিনি অতি সংবেদনশীল। যদিও কবিদের সংবেদনশীল হতে হয় নানা ঘাত-প্রতিঘাতে, তবে কবিকে মনে হয়েছে তিনি তার প্রতিক্রিয়া নির্মাণে দ্রুত সময় নিয়েছেন যা ‘স্ফুরণ’ কবিতায় দৃশ্যমান। ফলে সময় যত বয়ে গেছে ততই এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে; কবির প্রতিক্রিয়ার উদ্দেশ্যের মতো ঘটনাটি মহৎ সংশ্লিষ্ট ছিলো না বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা বিপরীতধর্মী যা আমাদের সৃজনশীল দেশপ্রেমিক মনকে দুর্বল করে দেয়। আর এ কারণেই প্রতি-প্রতিক্রিয়ার সংবেদনে জন্ম নিয়েছে ‘গন্তব্য কোথায়’ কবিতাটি। যারা বছরখানেক আগে অনেক অনেক পরিবর্তনের কথা বলে সবাইকে রাজপথে নামিয়েছিল কবি তাদের খুব দ্রুত সংবর্ধনা জানাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। কিন্তু বছরখানেক না যেতেই চৈতন্যোদয় হয়, আসলে আমাদের গন্তব্য কোথায়? কবি এখানেও কনফেশন করেন তার দ্রুত সংবেদন-প্রতিক্রিয়া প্রকাশের জন্যে। তারই চূড়ান্ত আক্ষেপ আমরা শুনি ‘যারা মারতে বা মরতে এসেছে’ কবিতায়: ‘কীসের মন্ত্রে ওরা নষ্ট হল/ ভ্রষ্ট হল/ ডুবিয়ে দিয়ে সোনার জীবন।’বক্ষ্যমাণ গ্রন্থে কবি কেবল নিজ দেশের অস্থিরতা নিয়েই উদগ্রীব নন। তিনি পৃথিবীজুড়ে চলমান অস্থিরতাকে তার কবিতার পটে আঁকেন। ফলে সুদানের দারফুর কিংবা গাজার রক্তক্ষয় তাকে বিমর্ষ করে তোলে। তারই প্রকট প্রভাবে হয়তো কবি অকপটে দার্শনিক ভাব-মন্থন করে ‘নিধনের পটভূমে’ কবিতায় বলে ওঠেন, ‘মানবাত্মা মৃত, মানুষ তাকে হত্যা করেছে’। কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আত্মখুনের স্কেচ’ এর একটা অসাধারণ সুন্দর কবিতা ছিলো ‘কালো মায়ের গল্প’। কবি এ গ্রন্থেও মায়ের কথা স্মরণ করেছেন। ‘মাকে বলে দেব’, ‘জন্মদাগ’ কিংবা ‘মাতৃবৃক্ষ’ কবিতাত্রয় মাকে মনে করেই লেখা। ‘জন্মদাগ’ কবিতায় মাকে মনে করে এক অসাধারণ পঙ্ক্তি তিনি রচনা করেছেন, ‘এবং মা জানে হৃদয়ের কোনখানে ক্ষত/ কোনটা তার জন্মদাগ।’ ‘মাকে বলে দেব’ কবিতাটি পাঠে পাঠক হিসেবে আমরাও কবির বেদনার সাথে একাত্ম হয়ে যাই, বিশেষ করে জ্বরাক্রান্ত কবি যখন বলেন, ‘মাগো জলপট্টি বাঁধো, মাথাটা ঘুরছে খুব!’ কেবল মাকে নয় বাবাকেও তিনি স্মরণ করেছেন তার ‘দূরে গেলে’ কবিতায়। তিনি প্রবীণ পিতার হাত ধরে ঘুরে ঘুরে পৃথিবী দেখার শৈশব স্মৃতিতে নস্টালজিক হয়ে পড়েন কিছুটা সময়। এ গ্রন্থে ভালোবাসা নিয়েও কবির একাধিক কবিতা আছে। ‘ভালোবাসা সম্পর্কে’ বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ভালোবাসা এক অনিঃশেষ ফসলের নাম।’ আবার সেই ভালোবাসা যখন সমাজের কাছে দোষের তখন তিনি ‘ভালোবাসা ব্যতিরেকে’ কবিতায় অনিবার্যভাবেই বলে ওঠেন: ‘প্রেমের গুঞ্জনে যত ভয়, যত সংশয়-দ্বিধা;সব শনশন সাঁইসাঁই, ঝনঝন শব্দ এখানেতলোয়ার হাতে ধেয়ে আসে বিধি—ধর্ম ও সমাজের।’ভালোবাসার পাশাপাশি আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনও কবির কবিতায় সমাদৃত হয়েছে। কবি এখানে চমৎকার করে বলেছেন: ‘আমার হৃদয়ের ভাষা ভালোবাসা।’ (ভাষা ভালোবাসা)সত্যিকার অর্থেই যাদের হৃদয়ের ভাষা ভালোবাসা, অতিযাপনের ক্ষয়ক্ষতি তাদের জীবনকে বিব্রত ও বিড়ম্বিত করার কথা নয়। কবির উপরিউক্ত কবিতার বক্তব্য আমাদের স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, পৃথিবী হোক হৃদয়বান মানুষের, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধলোলুপদের জন্যে নয়, কেননা ‘মানুষের কীর্তি হৃদয়ের মতো সুনিপুণ।’কবির মনে প্রিয় নবীজীর প্রতি প্রেম ফুটে উঠেছে ‘সালাম’ কবিতায়, যিনি শত্রুর বিছানো কাঁটা নিজ হাতে সরিয়ে শত্রুকে রোগশয্যায় দেখে এসে তার মন জয় করেছেন। তিনি যেদিকে গেছেন ছড়িয়েছেন আশার আলো। কবির কাছে জীবন এক প্রখর পরিযান। নানা জায়গায় পরিযায়ী হতে হতে একসময় মীনা কুমারীর জখম গানও তাকে স্পর্শ করে মরমে। নিজের জীবনের অতিযাপনের ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপ করে কবি একসময় চূড়ান্ত অনুশোচনার অনলে দগ্ধ হতে হতে নিজেকে খাঁটি সোনায় পরিণত করে তোলেন। তিনি অকপটে কনফেশন করে বলে ফেলেন তার স্বপ্ন ও মনোবাসনার কথা: ‘আমার স্বপ্ন গুরুতর কিছু নয়;/ শরতের স্নিগ্ধ নদীর পাশে নৌকা-পাল মাঝি/মগ্ন নিশীথে সুগভীর তান ভাটিয়ালি।’ (মেঠো স্বপ্ন)অতিযাপনের ক্ষয়ক্ষতি। সৌম্য সালেক। প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৬। প্রকাশক: জলধি। প্রচ্ছদ: খালেদ চৌধুরী। মূল্য: ২৫০ টাকা।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗