ছবি সংগৃহীত
সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবস গতকাল বুধবার দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচকের উত্থানের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। এদিন অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েছে। একই সঙ্গে সামান্য হলেও বেড়েছে মোট লেনদেনের পরিমাণ। তবে সূচক ও অধিকাংশ কোম্পানির দর বাড়লেও বাজারে সব শেয়ারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়নি। বেশ কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারদর কমেছে, যার মধ্যে নূরানী ডাইং অ্যান্ড সোয়েটার লিমিটেড ছিল দরপতনের শীর্ষে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বুধবার ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের কার্যদিবসের তুলনায় ২০ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৪২৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। ডিএসই শরিয়াহ সূচক ২ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৭২ পয়েন্টে অবস্থান করছে। অন্যদিকে ডিএসই-৩০ সূচক ৩ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯২ পয়েন্টে।
দিন শেষে সূচকের এই উত্থান পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রবণতার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। তবে লেনদেনে অংশ নেওয়া সব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বাড়েনি। কিছু কোম্পানির দর কমেছে, আবার কয়েকটির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে বাজারে দরবৃদ্ধির প্রবণতা থাকলেও কোম্পানিভেদে বিনিয়োগকারীদের অভিজ্ঞতায় পার্থক্য দেখা গেছে।
ডিএসইতে মোট ৩৮৫টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ১৯০টির দর বেড়েছে, ১৩৭টির দর কমেছে এবং ৫১টির দর অপরিবর্তিত ছিল। অর্থাৎ দরবৃদ্ধি পাওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দরপতনের মধ্যে থাকা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেশি ছিল।
দরবৃদ্ধির এই প্রবণতা বাজারের সার্বিক সূচককে ঊর্ধ্বমুখী রাখতে সহায়তা করেছে। তবে দর বেড়েছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি হলেও বাজারের সব খাতে সমান ইতিবাচক প্রবণতা ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। কারণ, বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারদরে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার পরিবর্তন হয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের কাছে সূচকের পাশাপাশি দরবৃদ্ধি ও দরপতনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক। এর মাধ্যমে বাজারের সামগ্রিক অংশগ্রহণ ও শেয়ারের দামের বিস্তৃত প্রবণতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বুধবার ডিএসইতে দরবৃদ্ধি পাওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি থাকায় লেনদেনের চিত্রে ইতিবাচক দিকটি স্পষ্ট হয়েছে।
ডিএসইতে মোট ৪১৬ কোটি ১৫ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪১৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে এক কার্যদিবসের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে ৫ লাখ টাকা।
লেনদেনের পরিমাণে এই বৃদ্ধি খুব বেশি না হলেও সূচকের উত্থানের সঙ্গে লেনদেনের পরিমাণও সামান্য বেড়েছে। এতে বাজারে ক্রয়-বিক্রয় কার্যক্রম আগের দিনের তুলনায় কিছুটা বেশি ছিল বলে বোঝা যায়। তবেলেনদেনের এই সামান্য পরিবর্তন থেকে বাজারে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রবাহ তৈরি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
পুঁজিবাজারে সূচকের পরিবর্তনের পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ। সূচক বাড়ার সময় লেনদেন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লে বাজারে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা সম্পর্কে বাড়তি ধারণা পাওয়া যায়। অন্যদিকে লেনদেন প্রায় অপরিবর্তিত থাকলে সূচকের উত্থান কতটা বিস্তৃত ক্রয়চাপের ওপর নির্ভর করছে, তা বুঝতে আরও কয়েক দিনের বাজারচিত্র পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সূচকের উত্থান দেখা গেলেও দেশের অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) ছিল ভিন্ন চিত্র। বুধবার সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই আগের কার্যদিবসের তুলনায় ৬ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ৫১৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
দিনটিতে সিএসইতে মোট ১৫৬টি প্রতিষ্ঠান লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে ৬৫টির শেয়ারদর বেড়েছে, ৭১টির কমেছে এবং ২০টির দর অপরিবর্তিত ছিল। অর্থাৎ এই বাজারে দরপতন হওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দরবৃদ্ধি পাওয়া প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেশি ছিল।
সিএসইতে বুধবার মোট ৬ কোটি ৬২ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। ফলে ডিএসইতে সূচকের উত্থান ও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের দরবৃদ্ধির বিপরীতে সিএসইতে সূচক কমেছে এবং দরপতন হওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেশি ছিল।
দুই স্টক এক্সচেঞ্জের এই ভিন্ন চিত্র থেকে বোঝা যায়, একই কার্যদিবসে দেশের দুই পুঁজিবাজারে লেনদেনের প্রবণতা এক রকম ছিল না। ডিএসইতে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও সিএসইতে সূচকের পতন ঘটেছে। ডিএসইতে টাকার অঙ্কে লেনদেনের শীর্ষস্থান দখল করেছে ইভেন্স টেক্সটাইল লিমিটেড। কোম্পানিটির মোট ১৫ কোটি ৪৯ লাখ ৯৯ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে।
লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল সোনালী আঁশ। কোম্পানিটির মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১৩ কোটি ২২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। অন্যদিকে ৯ কোটি ৫৬ লাখ ২৬ হাজার টাকার ইউনিট লেনদেন নিয়ে তালিকার তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে প্রাইম ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড।
এ ছাড়া লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় থাকা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল এপেক্স স্পিনিং, ব্র্যাক ব্যাংক, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, সায়হাম টেক্সটাইল, এপেক্স ফুডস ও এমএল ডাইং। লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় কোনো কোম্পানির অবস্থান তার শেয়ার কেনাবেচার মোট আর্থিক পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। তাই তালিকায় থাকা মানেই কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে, এমন নয়। বুধবারের লেনদেনের তথ্যেও দেখা গেছে, সোনালী আঁশ লেনদেনের শীর্ষ তিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে থাকলেও একই দিনে কোম্পানিটির শেয়ারদর কমেছে।
ডিএসইতে দরবৃদ্ধির শীর্ষে ছিল ফার্স্ট প্রাইম ফাইন্যান্স মিউচুয়াল ফান্ড। দিন শেষে ফান্ডটির ইউনিটদর আগের কার্যদিবসের তুলনায় ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ বেড়েছে।
দরবৃদ্ধির তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল টেকনো ড্রাগস। কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে থাকা প্রভাতী ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদর বেড়েছে ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ।
এ ছাড়া বিডি থাই ফুড অ্যান্ড বেভারেজের শেয়ারদর ৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ, এপেক্স স্পিনিং অ্যান্ড নিটিং মিলসের ৬ দশমিক ০৮ শতাংশ, ইউনাইটেড ইন্স্যুরেন্সের ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং প্রাইম ইন্স্যুরেন্সের ৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেড়েছে।
দরবৃদ্ধির তালিকায় আরও ছিল পেনিনসুলা চিটাগাং, জিপিএইচ ইস্পাত ও মেঘনা ইন্স্যুরেন্স। প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারদর যথাক্রমে ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ, ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ ও ৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেড়েছে।
তালিকাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বুধবার বিভিন্ন খাতের কোম্পানি এবং একটি মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটদরে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে। তবে এক দিনের দরবৃদ্ধি দিয়ে কোনো কোম্পানির ভবিষ্যৎ শেয়ারদরের প্রবণতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষে ছিল নূরানী ডাইং অ্যান্ড সোয়েটার লিমিটেড। কোম্পানিটির শেয়ারদর আগের কার্যদিবসের তুলনায় ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ কমেছে।
দরপতনের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ। কোম্পানিটির শেয়ারদর কমেছে ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে থাকা সোনালী আঁশের শেয়ারদর কমেছে ৪ দশমিক ৯০ শতাংশ।
এ ছাড়া ইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটদর ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং ফার্স্ট ফাইন্যান্সের শেয়ারদর ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ কমেছে। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের শেয়ারদর কমেছে ৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং ফ্যামিলিটেক্সের ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
দরপতনের তালিকায় আরও ছিল ন্যাশনাল ফিড মিল, সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইলস এবং আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারদর যথাক্রমে ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ, ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ ও ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ কমেছে।
গতকাল বুধবারের লেনদেনে ডিএসইর প্রধান সূচকসহ তিনটি সূচকই বেড়েছে। একই সঙ্গে দরবৃদ্ধি পাওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দরপতনের মধ্যে থাকা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেশি ছিল। তবে মোট লেনদেন বেড়েছে মাত্র ৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে সিএসইতে সার্বিক সূচক কমেছে এবং দরপতন হওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল দরবৃদ্ধি পাওয়া প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি।
এদিন ইভেন্স টেক্সটাইল লেনদেনের শীর্ষে থাকলেও দরবৃদ্ধির শীর্ষে ছিল ফার্স্ট প্রাইম ফাইন্যান্স মিউচুয়াল ফান্ড। বিপরীতে নূরানী ডাইং অ্যান্ড সোয়েটার ছিল দরপতনের শীর্ষে। এসব তথ্য থেকে দিনের বাজারচিত্রে সূচকের উত্থান, লেনদেনের সামান্য বৃদ্ধি এবং কোম্পানিভেদে ভিন্নমুখী দরপরিবর্তন—তিনটি দিকই স্পষ্ট হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে বুধবারের লেনদেন ডিএসইতে ইতিবাচক প্রবণতার ইঙ্গিত দিলেও লেনদেনের পরিমাণে বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। ফলে বাজারের এই উত্থান কতটা স্থায়ী হয়, তা বোঝার জন্য পরবর্তী কার্যদিবসগুলোর সূচক, লেনদেন এবং দরবৃদ্ধি-দরপতনের অনুপাত পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হবে।
