একসময় ব্রাজিলের ম্যাচ দেখার জন্য আলাদা কোনো কারণ খুঁজতে হতো না। প্রতিপক্ষ কে, ম্যাচটি কোন টুর্নামেন্টের—এসব বড় হয়ে উঠত না। ব্রাজিল মাঠে নামলেই চোখ আটকে থাকত টেলিভিশনের পর্দায়। কারণ ব্রাজিল মানেই ছিল অন্যরকম কিছু।
বল পায়ে নিয়ে একজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে যাওয়া, ছোট জায়গায় কয়েকটি পাস, হঠাৎ গতি বাড়ানো, এক মুহূর্তের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে ম্যাচের চিত্র বদলে দেওয়া—ব্রাজিলের ফুটবলে এসব ছিল খুবই পরিচিত দৃশ্য। সেই ফুটবলকে বলা হতো ‘জোগো বনিতো’—সুন্দর খেলা।
কিন্তু সময় বদলেছে। ব্রাজিলও বদলেছে। এখনো তাদের দলে তারকা আছে, প্রতিভা আছে, ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোতে খেলা খেলোয়াড় আছে। তবু ব্রাজিলের ম্যাচ দেখতে বসলে কোথাও যেন একটা শূন্যতা থেকে যায়। মনে হয়, দলটি ব্রাজিল ঠিকই, কিন্তু ব্রাজিলের সেই চেনা ফুটবলটি আর নেই।
হারিয়ে গেছে সেই ছন্দ
ব্রাজিলের ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার ছন্দ। প্রজন্ম বদলেছে, খেলোয়াড় বদলেছে, কিন্তু পেলে-গারিঞ্চা থেকে জিকো, রোমারিও, রোনালদো, রোনালদিনহো—সবার খেলায় একটা বিষয় ছিল একই। তারা মাঠে কিছু একটা তৈরি করতে পারতেন।
সবকিছু কোচের বোর্ডে আঁকা ছিল না। খেলোয়াড়ের নিজের ভাবনারও জায়গা ছিল। বল পায়ে একজন খেলোয়াড় কখন গতি বাড়াবেন, কখন ড্রিবল করবেন, কখন সতীর্থকে খুঁজে নেবেন—এসবের মধ্যে ছিল স্বাভাবিকতা। ব্রাজিলের ফুটবলকে আলাদা করে চিনতে তাই কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতো না।
এখন ফুটবল অনেক বেশি পরিকল্পনানির্ভর। প্রেসিং, পজিশন, দ্রুত ট্রানজিশন, রক্ষণে দলবদ্ধতা—সবকিছুর হিসাব থাকে। ব্রাজিলও আধুনিক ফুটবলের এই পরিবর্তন থেকে বাইরে নয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আধুনিকতার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে তারা নিজেদের পুরোনো ছন্দটাকেই যেন হারিয়ে ফেলেছে।
ব্রাজিলের সর্বশেষ বিশ্বকাপ জয় ২০০২ সালে। সেই দলের দিকে তাকালে আজকের ব্রাজিলের সঙ্গে পার্থক্যটা সহজেই বোঝা যায়। রোনালদো, রোনালদিনহো, রিভালদো, কাফু, রবার্তো কার্লোস—দলে তারকার অভাব ছিল না। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, একাধিক খেলোয়াড়ের মধ্যে ছিল ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা।
এরপর দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। ব্রাজিল দলে বড় তারকার অভাব কখনোই হয়নি। কিন্তু বিশ্বকাপ আর আসেনি। ২০০৬ ও ২০১০ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায়। ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের দুঃসহ স্মৃতি।
এরপর ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হার। ২০২২ সালে আবার কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে বিদায়। অর্থাৎ ব্রাজিল এখনো বিশ্ব ফুটবলের বড় দল। কিন্তু বিশ্বকাপের শেষ ধাপে গিয়ে কোথাও একটা ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
তিতের ব্রাজিল: দারুণ শুরু, শেষটা একই
২০১৪ বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের ট্র্যাজেডির পর ২০১৬ সালে তিতে ব্রাজিলের দায়িত্ব নেন। এরপর পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গিয়েছিল। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ব্রাজিল দুর্দান্ত ফুটবল খেলেছে। প্রীতি ম্যাচ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ম্যাচেও দলটির ধারাবাহিকতা ছিল চোখে পড়ার মতো। তিতের অধীনে ব্রাজিল শুধু ম্যাচ জিতছিল না, নিজেদের গুছিয়েও নিয়েছিল। রক্ষণ শক্ত হয়েছিল, মাঝমাঠে ভারসাম্য এসেছিল, আক্রমণে গতি ছিল। কিন্তু বিশ্বকাপ এলেই গল্পটা বদলে যেত।
২০১৮ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায়। চার বছর পর ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে এগিয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে হার। সমস্যাটা ধরা দেয় সেই একই গল্পে–গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ম্যাচের গতিপথ বদলাতে পারেননি কেউ।
প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে সেলেসাওদের অন্ধকার ফুটবলে আশার প্রদ্বীপ হয়ে এসেছিলেন নেইমার জুনিয়র। চেষ্টাটাও করে গেছেন তিনি। কিন্তু বারবার চোটের ধাক্কা আর যোগ্য সঙ্গী খুঁজে না পাওয়া–বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তার জন্য।
তারকা আছে, কিন্তু সেই ‘একজন’ কোথায়?
এক সময় ব্রাজিল দলে এমন অনেক ফুটবলার ছিলেন, যারা শুধু ভালো খেলতেন না, কঠিন মুহূর্তে ম্যাচের গতিপথও বদলে দিতে পারতেন। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে রোমারিওর গোল আর ব্যক্তিগত দক্ষতা ব্রাজিলকে শিরোপা জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ২০০২ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে রোনালদোর জোড়া গোল ব্রাজিলকে পঞ্চম শিরোপা এনে দিয়েছিল।
একই আসরে রিভালদো ছিলেন দলের আক্রমণভাগের অন্যতম চালিকাশক্তি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে রোনালদিনিয়োর সেই ফ্রি-কিকও মনে করিয়ে দেয়, ব্রাজিল ফুটবলে ব্যক্তিগত প্রতিভা কতটা বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারত। আরেকটু ফিরে তাকালে পেলে, গারিঞ্চা কিংবা বেবেতোরা ছিলেন অনবদ্য। তখন হারের আগেই হেরে যেত না ব্রাজিল। কোনো একজন তারকার প্রতিভার গুণে বদলে যেত ম্যাচের গতিপথ।
এমন নয় যে বর্তমান ব্রাজিল দলে প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের অভাব। ভিনিসিয়াস জুনিয়র রিয়াল মাদ্রিদে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের একজন। রাফিনিয়াও ক্লাব ফুটবলে বার্সেলোনার হয়ে রীতিমতো গোল মেশিন বনে গেছেন। রদ্রিগো, এন্ড্রিক, জোয়াও পেদ্রোসহ আরও অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় আছে। কিন্তু জাতীয় দলের জার্সিতে তাদের কাছ থেকে ক্লাবের মতো পারফরম্যান্স পাওয়া যায় না।
ব্রাজিল ভক্তরা তো আক্ষেপ করেই বলেন–রিয়াল মাদ্রিদের ভিনিসিয়াসকে যদি সেলেসাওদের হলুদ জার্সিতে পাওয়া যেত। কিংবা বার্সেলোনার রাফিনিয়াকে জাতীয় দলে পাওয়া যেত! তাহলে হয়ত ব্রাজিলের চেহারাই বদলে যেত। তাহলে হয়ত ফুটবল সমুদ্রে ডুবতে বসত না ব্রাজিলের ফুটবল। বারবার খালিহাতে ফিরতে হতো না বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে।
ব্রাজিল আধুনিক হয়েছে, কিন্তু নিজের মতো হতে পারেনি
ব্রাজিলকে পুরোনো ফুটবলে ফিরে যেতে হবে—এমন কথা বলার সুযোগ নেই। আধুনিক ফুটবলে শুধু ড্রিবলিং আর সৌন্দর্য দিয়ে বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব নয়। প্রেসিং দরকার, রক্ষণে শৃঙ্খলা দরকার, দ্রুত আক্রমণ দরকার, কৌশল দরকার। কিন্তু আধুনিক হওয়ার অর্থ নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলা নয়।
ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় শক্তি তো ছিল—তারা অন্যদের মতো খেলত না। তারা যখন নিজেদের মতো খেলত, তখন ফুটবল শুধু ফলাফলের খেলা থাকত না। সেখানে আনন্দ ছিল, বিস্ময় ছিল, সৌন্দর্য ছিল। আজকের ব্রাজিল অনেক সময় খুব হিসাব করে ফুটবল খেলে। কিন্তু সেই হিসাবের মধ্যে কোথাও যেন হারিয়ে যায় স্বাভাবিকতা।
একসময় ব্রাজিল মাঠে নামলেই মনে হতো, আজ কিছু একটা ঘটবে। একজন খেলোয়াড় হয়তো এমন একটি ড্রিবল করবেন, এমন একটি পাস দেবেন, এমন একটি গোল করবেন—যেটা কেউ আগে থেকে ভাবতে পারেনি। সেই অনুভূতিটাই এখন সবচেয়ে বেশি মিস করে ফুটবল বিশ্ব।
ব্রাজিল এখনো বড় দল। এখনো বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট। এখনো তাদের জার্সির ওজন অন্যদের চেয়ে বেশি। কিন্তু শুধু পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলেই তো ব্রাজিলকে ব্রাজিল বলা যায় না। ব্রাজিলকে ব্রাজিল বানিয়েছিল তার ফুটবল। সেই ছন্দ, সেই স্বাধীনতা, সেই সৃজনশীলতা, সেই অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত।
আজকের ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়তো আরেকজন তারকা নয়। প্রয়োজন এমন একটি ফুটবল, যেটা দেখলে আবার মনে হবে—হ্যাঁ, এটাই তো ব্রাজিল। সেই চেষ্টাটাই এখন করে যাচ্ছেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল কোচ কার্লো আনচেলত্তি।
