শরতের নীল আকাশ আর শিউলির গন্ধ যখন বাংলাকে উৎসবের রঙে রাঙিয়ে তোলে, ঠিক তখনই হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা প্রবাসীদের বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে এক অদ্ভুত শূন্যতা। এ কেবল ঘরছাড়া থাকার কষ্ট নয়; এ হলো উমার আগমনে নিজের মাটিতে ফিরতে না পারার হাহাকার। বাঙালির প্রাণের উৎসব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার সেই তীব্র যন্ত্রণা থেকেই জন্ম নেয় বিকল্প পথের খোঁজ, পরবাসের মাটিতেই শিকড় রোপণ করার অঙ্গীকার। ঠিক সেই তাগিদ থেকেই অর্ধশতক আগে লিভারপুলের বুকে শুরু হয়েছিল এক অভিনব লড়াই।
সময়টা ১৯৭৬ সাল। লিভারপুলে বসবাসকারী একদল প্রবাসী বাঙালি সিদ্ধান্ত নেন, বিলেতের বুকেই তাঁরা আহ্বান করবেন ঘরের মেয়ে উমাকে। গড়ে ওঠে ‘বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন অফ মার্সিসাইড অ্যান্ড নর্থ অফ ইংল্যান্ড’ (BAMNE)। সে যুগে গোটা ব্রিটেনে দুর্গোৎসব ছিল এক বিরল দৃশ্য। অনেকের মতে, সে সময় সমগ্র ব্রিটেনে এটিই ছিল একমাত্র সর্বজনীন পুজো। আজ বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সেই পুজো পা রাখল সুবর্ণজয়ন্তীতে। সবচেয়ে আশার কথা, প্রবীণ প্রজন্মের হাত থেকে পুজোর রাশ এখন অতি সযত্নে তুলে নিয়েছে পরবর্তী প্রজন্ম। এখানে যাঁরা পৌরোহিত্য করেন, তাঁরা প্রত্যেকেই উচ্চশিক্ষিত ও পেশাগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত। নিয়মমাফিক প্রশিক্ষণ নিয়ে তাঁরা দেবীর আরাধনা করেন এবং সমান দক্ষতায় পুজো অর্চনার সেই ধারা শিখিয়ে দিচ্ছেন উত্তরসূরিদেরও।
সপ্তাহান্তের সুবিধে নয়, খাঁটি বাংলা পঞ্জিকার তিথি মেনেই মহালয়া থেকে শুরু হয় উৎসবের তোড়জোড়। ষষ্ঠীর বোধন থেকে দশমীর বিসর্জন—আচার-অনুষ্ঠানে এতটুকু ফাঁক থাকে না। অঞ্জলি, সন্ধিপুজো, কুমারী পুজো, দেবীবরণ থেকে শুরু করে দশমীর সিঁদুরখেলা—সবটাই চলে নিষ্ঠাভরে। প্রতি সন্ধ্যায় ধুনুচির ধোঁয়া আর ঢাকের বোলে কেঁপে ওঠে লিভারপুলের আকাশ। সঙ্গে থাকে বাঙালি রসনাতৃপ্তির এলাহি আয়োজন।
কেবল দুর্গাপুজোই নয়, শরৎ থেকে বসন্ত— লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজো থেকে সরস্বতী আরাধনায় সারাবছরই মেতে থাকে এই সংস্থা। উৎসবের স্মৃতিকে বেঁধে রাখতে বিএএমএনই প্রতি বছর প্রকাশ করে তাদের নিজস্ব স্মরণিকা ‘উমা’। আটলান্টিকের তীরে দাঁড়িয়ে এ কেবল উৎসবের উদযাপন নয়; প্রবাসের ধূসর জীবনে স্বদেশের সংস্কৃতিকে বুক দিয়ে আগলে রাখার এক জীবন্ত দলিল।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।
