মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা বন্ধ না হলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে নগরবাসীর প্রতিও আহ্বান জানান তিনি।
শনিবার সন্ধ্যায় নগরীর বায়েজিদ মোহাম্মদ নগর চত্বরে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে সভাটির আয়োজন করে মোহাম্মদ নগর হাউজিং সোসাইটি কল্যাণ সমিতি।
সমিতির আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে ও সদস্যসচিব জিয়াউর রহমান জিয়ার পরিচালনায় সভায় প্রধান বক্তা ছিলেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক আলহাজ্ব এরশাদ উল্লাহ। বিশেষ অতিথি ছিলেন মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান, সিএমপি পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী এবং এসআরবি-৭ চট্টগ্রামের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান।
অপরাধীদের সতর্ক করে মেয়র বলেন, এসব অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের সমন্বয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “আপনারা অপরাধীদের নাম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিন। কেউ চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধের বিরুদ্ধে সবাইকে প্রতিবাদী হতে হবে।” জনগণ ঐক্যবদ্ধ হলে অপরাধীরা কখনোই এলাকার মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মেয়র বলেন, মাদক ব্যবসা ও অপরাধ দমনে শুধু প্রশাসনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না, নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। এলাকার কোথায় মাদক বিক্রি হচ্ছে, কারা চাঁদাবাজি করছে এবং কারা ফুটপাত দখল করে অবৈধভাবে দোকান বসাচ্ছে, এসব তথ্য প্রশাসনকে জানাতে হবে। নাগরিকেরা প্রতিবাদ করলে পুলিশ ও প্রশাসন তাঁদের পাশে দাঁড়াবে। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করার কোনো সুযোগ নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মাদককে যুবসমাজ ও কিশোরদের ধ্বংসের অন্যতম কারণ উল্লেখ করে মেয়র বলেন, মাদকের বিস্তার রোধে বিক্রয়কেন্দ্রের পাশাপাশি এর সরবরাহ ও উৎপত্তির উৎস বন্ধ করতে হবে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের তৎপরতা প্রতিরোধে সামাজিক উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি। তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
মোহাম্মদ নগর এলাকার সড়ক উন্নয়ন প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকার পর এলাকাটির সড়ক উন্নয়নে প্রায় ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উন্নয়নকাজে কেউ চাঁদাবাজি করেছে কি না, তা জানতে এলাকাবাসীর প্রতি প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তা প্রশাসনকে জানাতে হবে।
এলাকার ‘চিকেন নেক’ হিসেবে পরিচিত সড়কসংলগ্ন জায়গা ও চলাচলের প্রতিবন্ধকতা প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, বিষয়টি সমাধানে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা করছেন। প্রয়োজনীয় জায়গা ছেড়ে দেওয়া এবং মানুষের চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আবারও বৈঠক করা হবে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মেয়র বলেন, ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের জন্য, অবৈধ দোকান বসানো কিংবা চাঁদাবাজির জন্য নয়। নিজের দোকান বা বাসার সামনে ফুটপাত দখল হতে দেখলে নাগরিকদের প্রতিবাদ করতে হবে। অন্যায় দেখেও নীরব থাকলে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। নগরকে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও বাসযোগ্য রাখতে প্রত্যেক নাগরিককে নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে বলেও জানান।
হোল্ডিং ট্যাক্স প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, যেসব বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স এখনো চূড়ান্ত হয়নি, সেসব ক্ষেত্রে সহনীয় পর্যায়ে কর নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে নগরীর উন্নয়ন, সড়ক নির্মাণ ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে ন্যায্য কর পরিশোধের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মেয়র বলেন, নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা চালালে আইনগত জটিলতায় পড়তে হতে পারে।
বক্তব্যের শেষ দিকে মেয়র বলেন, এই শহর শুধু মেয়রের নয়, ৮০ লাখ মানুষের। রাষ্ট্র যেমন ১৮ কোটি মানুষের, তেমনি শহরের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও সবার। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে, নিজের শহরকে ভালোবাসতে হবে এবং নাগরিক দায়িত্ব পালন করতে হবে।
প্রধান বক্তার বক্তব্যে এরশাদ উল্লাহ বলেন, প্রশাসন অন্যায় ও অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং নাগরিকদের পাশে আছে। আগামী দিনে এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও অন্যায়ের “কালো হাত” ভেঙে দিয়ে সমাজ থেকে নির্মূল করা হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। যাঁরা এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের সাবধান হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণ একসঙ্গে কাজ করে এসব সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করবে। “গুটি কয়েকজন অপরাধীর জন্য মানুষ শান্তিতে থাকতে পারবে না, তা হতে পারে না। আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।”
এরশাদ উল্লাহ আরও বলেন, “বিএনপির নাম ভাঙিয়ে যদি কেউ চাঁদাবাজি বা কোনো অপকর্ম করার চেষ্টা করে, তবে সে আমার ভাই হোক, ছেলে হোক, বন্ধু হোক কিংবা পরিচিত কেউ হোক, আমরা এক মুহূর্তের জন্যও তাকে ছাড় দেব না। অপরাধীর পরিচয় যা-ই হোক না কেন, তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া হবে। আর দলীয় পদধারী কেউ হলে তার শাস্তি হবে দ্বিগুণ।”
সভায় আরও বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আর ইউ চৌধুরী শাহীন, আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ইসকান্দার মির্জা, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মঞ্জুর আলম মঞ্জু, হাউজিং সোসাইটির সদস্য অ্যাডভোকেট এফ এ সেলিম, শাখাওয়াত হোসেন লিটন, আজিজুল হক, হাজী কামরুল ইসলাম, আবু মুছা, আমিন সাংগঠনিক ওয়ার্ড বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল বাতেন, চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক এরশাদ হোসেন, হাউজিং সোসাইটির সদস্য মনিরুল ইসলাম মনু, ডা. আবদুল মতিন, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা কাজল কান্তি চৌধুরী, স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক মোস্তাক আহমেদ স্বপন, মুসফিকুর রহমান, সুমন আল মামুন, বায়তুন নূর জামে মসজিদের উপদেষ্টা মো. শাহজাহান, ফরিদ আহমেদ, হাউজিং সোসাইটির সদস্য সাইফুল ইসলাম মনির ও মোহাম্মদ নূর উল্লাহ।
বিআলো/শিলি