শ্যামলী ভট্টাচার্য
ভারতীয় নাট্যজগতে বহুরূপী নামটি একটি প্রতিষ্ঠান, একটি আন্দোলন। আর সেই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ ইতিহাসে শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্রের পর যে মানুষটি সবচেয়ে নীরবে, সবচেয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে হাল ধরে রেখেছিলেন, তিনি কুমার রায়।
কুমার রায় (২ মার্চ ১৯২৬ - ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০) ছিলেন একজন ভারতীয় বাঙালি নট, নাট্যকার ও নাট্যনির্দেশক। তাঁর পিতৃদত্ত নাম কুমারেন্দ্র নারায়ণ রায়। জন্ম ব্রিটিশ ভারতের দিনাজপুরের এক জমিদার পরিবারে, যে পরিবারে শিল্প ও জ্ঞানচর্চার অনুকূল পরিবেশ ছিল।
ছাত্রাবস্থা থেকেই নাটকে। 'সিরাজদ্দৌলা'য় ওয়াটস, 'মহারাজা নন্দকুমার' নাটকে নন্দকুমারের চরিত্রে অভিনয়। ১৯৪২ সালের অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে কৈশোরে কারাবরণ করেন এবং কারান্তরালে থেকেও ম্যাট্রিক পাশ করেন। পরে রিপন কলেজ, রাজশাহী কলেজ - সেখানে সহপাঠী ঋত্বিক ঘটক। রবীন্দ্রনাথের 'রাজা', 'পরিত্রাণ', 'ফাল্গুনী'তে অভিনয়। দেশভাগের পর কলকাতা, বঙ্গবাসী কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক, পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর।
১৯৪৯ সালে ঋত্বিক ঘটকের সূত্রেই তিনি বহুরূপী থিয়েটারে যোগ দেন। ১৯৫১ সালে তুলসী লাহিড়ীর 'পথিক' নাটকে অভিনয়। তখন খাদ্য বিভাগের পরিদর্শকের চাকরি ছেড়ে, বরাকরে বদলি নিতে অস্বীকার করে, নাটকের টানে কলকাতার স্মল কেসেস কোর্টের কম বেতনের চাকরি নেন - এটাই ছিল তাঁর জীবনের সিদ্ধান্ত।
বহুরূপীর প্রথম পর্বের প্রায় সব কালজয়ী প্রযোজনায় কুমার রায় অভিনেতা। 'দশচক্র', 'ধর্মঘট', 'রক্তকরবী', 'স্বর্গীয় প্রহসন', 'ডাকঘর' প্রভৃতি নানা নাটকে অভিনয় করেন। 'রক্তকরবী'তে তাঁর গোঁসাই, 'বিসর্জন' এর গোবিন্দমাণিক্য, 'পুতুল খেলা'র ড. রায় আজও প্রবাদপ্রতিম। তাঁর শিষ্য শেখর সমাদ্দারের ভাষায় - তিনি খুব ভাল ছবি আঁকতেন, অত্যন্ত ভাল মেক-আপ করতেন, অর্থাৎ নাট্যকলার সঙ্গে যুক্ত যে যে চারুকলা, তার সব ক'টি বিভাগে তাঁর স্বাভাবিক পটুত্ব ছিল।
১৯৫৬ সালে তিনি প্রথম নির্দেশনার দায়িত্ব পান। তারপর ইতিহাস। ১৯৭৯ সালে শম্ভু মিত্র বহুরূপী ত্যাগ করলে কুমার রায় নাট্যনির্দেশক হন এবং আমৃত্যু সেই দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ের অসামান্য কাজ ‘মৃচ্ছকটিক’, ‘রাজদর্শন’ ইত্যাদি।
তাঁর নির্দেশিত নাটকের তালিকাটি বাংলা থিয়েটারের একটি বিশ্বকোষ:
মৃচ্ছকটিক (১৯৭৯), গ্যালিলিও - ব্রেখট (১৯৮০), রাজদর্শন - মনোজ মিত্র (১৯৮২), আগুনের পাখি (১৯৮৪), মালিনী - রবীন্দ্রনাথ (১৯৮৬)
মিঃ কাকাতুয়া, যযাতি - গিরিশ কারনাড, কিনু কাহারের থেটার, নবান্ন (১৯৮৯), নিন্দাপাঙ্কে - সার্ত্র, শ্যামা, আকবর বীরবল, মুক্তধারা (১৯৯৬), কাল সন্ধ্যা (২০০৮) পর্যন্ত
এর মধ্যে দুটি প্রযোজনা মাইলফলক।
প্রায় চল্লিশ বছর আগে কলকাতাকে মালিনী নাট্য-উপহার দিয়েছিলেন কুমার রায়। শম্ভু মিত্রের ‘বহুরূপী’র দায়িত্ব তখন তিনিই বইছেন।
নবান্ন-র পুনঃনির্মাণ (১৯৮৯) - তিনি পঞ্চাশের মন্বন্তর নিয়ে বিজন ভট্টাচার্য রচিত এবং ১৯৪৮ সালে শম্ভু মিত্র প্রযোজিত ক্লাসিক নাটক নবান্ন-এর পুনঃনির্মাণে নির্দেশনা করেন। এটি ছিল ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তার প্রাসঙ্গিকতা ফিরিয়ে আনা।
শিক্ষক হিসেবে তিনি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক বিভাগের অধ্যাপক এবং শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীর সঙ্গীত ভবনের ভিজিটিং অধ্যাপক ছিলেন। ২০০৬ সালের ১৭ জুলাই থেকে আমৃত্যু তিনি পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমির সভাপতি ছিলেন।
তিনি যখন ব্রেখটের গ্যালিলিও বা শূদ্রকের মৃচ্ছকটিক করেন, তখন প্রাচীন বা বিদেশি গল্পেও আজকের শোষণ, ক্ষমতা, মানুষের লড়াইকে তুলে আনেন। নবান্ন-র মতো মন্বন্তরের গল্প ১৯৮৯-এ আবার করা মানে ছিল - ইতিহাস ভুলে যাওয়া নতুন মধ্যবিত্তকে মনে করানো।
মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের নির্দেশ ছিল ‘যত দিন ডিসিপ্লিন তত দিন বহুরূপী’ এবং দলের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত হতে হবে। কুমার রায় সেই ধারাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। শেখর সমাদ্দারের স্মৃতিতে - ওই পাঁচজনের মধ্যে কুমার রায়কেই বহুরূপী-র নাট্য নির্দেশনা এবং ‘বহুরূপী’ পত্রিকা সম্পাদনা এবং অন্যান্য কাজের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। তিনি একাধারে মঞ্চসজ্জা, মেকআপ, পোস্টার, বই - সব দেখতেন। সুরেন চক্রবর্তীকে দিয়ে ‘মৃচ্ছকটিক’ নাটকের মঞ্চে থার্মোকলের হাতির মোটিফগুলির ডিজাইন তিনি নিজে করিয়ে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ থিয়েটারকে তিনি বুঝতেন একটি সামগ্রিক চারুকলা হিসেবে, যেখানে দর্শককে ঠকানো যায় না। তিনি ছিলেন ‘অর্গানিক’ মঞ্চে বিশ্বাসী, ডিজিটাল প্রিন্ট নয়, হাতে আঁকা, হাতে গড়া শিল্পে বিশ্বাসী।
বহুরূপী ১৯৫৭-র মার্চে প্রথম ঢাকা যায় ‘রক্তকরবী’ আর ‘ছেঁড়াতার’ নিয়ে। সেই যাত্রার উত্তরাধিকার বহন করে কুমার রায়ের আমলে বহুরূপী শুধু অ্যাকাডেমিতে আটকে থাকেনি, জেলায় জেলায়, কলেজে, স্কুলে গেছে। রবীন্দ্রভারতীতে পড়ানো মানে প্রত্যন্ত ছাত্রের কাছে আধুনিক অভিনয়-তত্ত্ব পৌঁছে দেওয়া।
তাঁর ব্যক্তিত্বও ছিল এই জনমুখীতার বড় কারণ। শিষ্যের কথায় - প্রকৃত সুভদ্র বলতে যা বোঝায়, কুমার রায় ছিলেন তাই। রাগ হলেও তিনি নিজের দু’গালে চড় মেরেছিলেন, শিষ্যের গায়ে হাত তোলেননি। এই মানবিকতাই দর্শককে কাছে টানে।
একটি জাতির নাট্য-দলিল
বহুরূপী পত্রিকা বাংলা থিয়েটারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর্কাইভ। ১৯৫৫-য় শুরু হয় ‘বহুরূপী’ পত্রিকা। খালেদ চৌধুরীর অনবদ্য প্রচ্ছদে তারাভূষণ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত সেই পত্রিকা আজও প্রকাশিত হয়ে চলেছে।
পরবর্তী সম্পাদক ছিলেন গঙ্গাপদ বসু, শম্ভু মিত্র, কুমার রায়, চিত্ররঞ্জন ঘোষ। অর্থাৎ; শম্ভু মিত্রের পর পত্রিকার দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে সংকটময় সময়ের সম্পাদক ছিলেন কুমার রায়। তিনি অভিনয় ছাড়াও নাট্যচর্চার উপর নানা গ্রন্থ এবং বহুরূপী নাট্যদলের পত্রিকা "বহুরূপী"-র সম্পাদনা করেন।
তাঁর নিজের লেখা বই - ‘নাট্য ভবিষ্যৎ ও রবীন্দ্রনাথ’ (১৯৮৭), ‘ঋষি-নট মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য’ (১৯৮৯), ‘শম্ভু মিত্র: নির্মাণ ও সৃজন’ (১৯৯৮), ‘মোকাম কলকাতা: নাট্যরঙ্গ’, ‘রবীন্দ্র-নাটক: আলোকিত উদ্ভাবন’ (২০০৩), ‘অভিনয়ের নানা আঁচড়’ (২০০৫) - এই সবই প্রথমে বহুরূপী পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রবন্ধ হিসেবে বেরিয়েছে। ফলে পত্রিকাটি শুধু নাটকের বিজ্ঞাপন নয়, গবেষণা পত্রিকা হয়ে ওঠে।
বাদল সরকারের ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ ও শম্ভু মিত্রের ‘চাঁদ বণিকের পালা’— আমরা পেয়েছি এই নাট্যপত্রে। অর্থাৎ বাংলা নাটকের দুটি যুগান্তকারী নাটক প্রথম ছাপা হয় বহুরূপীতে, যখন কুমার রায় সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত। তিনি নতুন লেখকদের উৎসাহ দিতেন, লেখা পড়ে ভাল লাগলে ফোন করে বা দেখা হলে মুক্ত গলায় প্রশংসা করতেন।
খালেদ চৌধুরীর প্রচ্ছদ, পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায়ের অলংকরণ - এই শিল্পবোধকে তিনি ধরে রেখেছিলেন। উত্তরপাড়ার জীবনস্মৃতি আর্কাইভে তাঁর শতবর্ষ ঘিরে যে প্রদর্শনী হয়েছে, সেখানে ‘বহুরূপী’র ৭৫ বছরে কুমার রায় পরিচালিত নাটকগুলির মূল নাট্যপুস্তিকাগুলি মুখ্য আকর্ষণ। পুস্তিকায় কলাকুশলী-পরিচিতির সঙ্গে নাটকের মূল ভাবনাটি সংক্ষেপে লেখা থাকত, দলের প্রথম যুগ থেকেই শুরু, ১৯৭৯-র পর প্রায় একক ভাবে সামলাতেন কুমার রায়। অর্থাৎ ; আজ আমরা যে নাটকের বুকলেটে পরিচালকের ভাবনা পড়ি, তার প্রবর্তক তিনি।
তিনি শুধু নির্দেশক ছিলেন না, ছিলেন একজন সেতু - শিশিরকুমার থেকে শম্ভু মিত্র, শম্ভু মিত্র থেকে দেবেশ রায়চৌধুরী, মঞ্চ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা থেকে বাংলাদেশ, নাটক থেকে পত্রিকা - সব কিছুর মধ্যে সেতু।
তাঁর জীবন থেকে আজকের তরুণ নাট্যকর্মীর জন্য শিক্ষা -
থিয়েটার মানে শুধু অভিনয় নয়, মেকআপ, আঁকা, লেখা, সম্পাদনা, আর্কাইভ - সব শিখতে হয়।
জনপ্রিয়তা নয়, শৃঙ্খলা ও ভদ্রতা দিয়ে দল চলে।
পত্রিকা বা ডকুমেন্টেশন ছাড়া থিয়েটার বাঁচে না।
