দীর্ঘদিনের জনতুষ্টিবাদী নেতা আলেকসান্দার ভুসিচকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আন্দোলনের মধ্যে সার্বিয়ায় পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় থাকা ভুসিচ এবার দুর্নীতিবিরোধী ও কর্তৃত্ববাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।
আগাম নির্বাচনের ভোটগ্রহণের জন্য রোববার (২৫ অক্টোবর) ভোটকেন্দ্রগুলো খুলে দেওয়া হয়।
নির্বাচনে ২ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং সারা দেশে প্রায় ৮ হাজার ৪০০টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ চলছে।
পশ্চিম বলকান অঞ্চলের এই দেশটিতে স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে এবং রাত ৮টায় তা শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরে ভুসিচের ঘোষিত আগাম এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০২৪ সালে দেশটির নোভি সাদ শহরে একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর থেকে শিক্ষার্থীরা প্রায় দুই বছর ধরে বিক্ষোভ করে আসছেন। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সরকারি দুর্নীতি ও ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। পরে এ আন্দোলন ব্যাপক জনসমর্থন পায়।
প্রায় ৬০ লাখ মানুষের বলকান অঞ্চলের দেশ সার্বিয়ায় ভুসিচের পরাজয় ঘটলে তা বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। গত এপ্রিলে হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবানের পরাজয়ের মতো ঘটনাও এর মধ্য দিয়ে স্মরণ করিয়ে দিতে পারে।
তবে সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগ করে আবারও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ফেরার জন্য নির্বাচনে অংশ নেওয়া ভুসিচ এখনো শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন। সার্বিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা অবস্থা থেকে এগিয়ে নেওয়া এবং ধারাবাহিক আধুনিকায়নের জন্য অনেক ভোটার তাকে কৃতিত্ব দেন।
ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফটের জ্যেষ্ঠ ইউরোপ বিশ্লেষক মারিও বিকারস্কি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘স্টুডেন্ট লিস্ট ভুসিচের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ গড়ে তোলায় সার্বিয়ার নির্বাচন দেশটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা দিচ্ছে।’
নির্বাচনী প্রচারে ভুসিচ পেনশন ও সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো, রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ এবং তরুণ দম্পতিদের ভর্তুকি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক ধরে রেখেছেন তিনি। চীন সার্বিয়ার অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী। অন্যদিকে, রাশিয়া দেশটির দীর্ঘদিনের মিত্র এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান সরবরাহকারী। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগ দেওয়ার সম্ভাবনাও খোলা রেখেছেন ভুসিচ।
তবে তার শাসনামলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সার্বিয়ার সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। বিচারব্যবস্থা, আইনের শাসন ও দুর্নীতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ায় জোটটির অসন্তোষ ক্রমেই বেড়েছে।
দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদের জোর
স্টুডেন্ট লিস্ট আন্দোলনের মূল লক্ষ্য দুর্নীতি নির্মূল করা এবং শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খুব বেশি বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আন্দোলনটির ২৫০ জন প্রার্থীর তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, অভিনেতা ও কৃষকসহ বিভিন্ন পেশার তুলনামূলকভাবে অপরিচিত ব্যক্তিরা রয়েছেন। এ তালিকার নেতৃত্ব দিচ্ছেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ইলিয়া সার্দানোভিচ।
জনমত জরিপগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ইপসোসের এক জরিপে ভুসিচের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি ৪৭ শতাংশ এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলনসমর্থিত প্রার্থীরা ৪০ শতাংশ ভোট পেতে পারেন বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে অন্য কয়েকটি জরিপে ছাত্র আন্দোলন সমর্থিত প্রার্থীদের এগিয়ে থাকতে দেখা গেছে।
মানবাধিকার সংগঠন ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে প্রাণহানির ঘটনার পর থেকে দেশে দমন-পীড়ন আরও বেড়েছে। সরকারি দুর্নীতিকে ওই দুর্ঘটনার জন্য ব্যাপকভাবে দায়ী করা হয়েছিল, যা শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে নতুন গতি এনে দেয়।
গত বৃহস্পতিবার রাজধানী বেলগ্রেডের কেন্দ্রস্থলে ছাত্র আন্দোলনের প্রায় দেড় লাখ সমর্থক সমাবেশ করেন।
ভুসিচ ও তার দল অবশ্য দমন-পীড়ন, দুর্নীতি এবং বিরোধীদের ওপর নজরদারির অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট ভুসিচের দাবি, ছাত্র আন্দোলনটি ক্রোয়েশিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিদেশি এজেন্টদের অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। তবে শিক্ষার্থীরা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সূত্র: আল জাজিরা, আনাদোলু