জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস আজ। সড়ক দুর্ঘটনা রোধ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর ২২ অক্টোবর বাংলাদেশে এই দিবসটি পালন করা হয়।
জাতিসংঘ ২০২১ থেকে ২০৩০ সালকে ‘নিরাপদ সড়ক দশক’ ঘোষণা করেছে। এর প্রধান লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও আহত হওয়ার সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমানো। ২০২০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এ উদ্যোগ গ্রহণ করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমন্বয়ে প্রণীত বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনায় নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, যানবাহনের নিরাপত্তা, গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ, আইন প্রয়োগ এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গত ২০ ও ২১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
বৈঠকে শেখ রবিউল আলম সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নে বাংলাদেশের অঙ্গীকার তুলে ধরেন। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ, দুর্ঘটনার পর দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সেবা এবং পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানান। ২০২৭ সালের মধ্যে সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতিও তুলে ধরেন তিনি।
৬ বছরে দুর্ঘটনায় ৪০ হাজার প্রাণহানি
গত ৬ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৪০ হাজারের বেশি মানুষ। ২০২৬ সালের গত ৯ মাসে প্রতিদিন গড়ে দুর্ঘটনা ১৭টি, নিহত ১৬ জন।
সারা দেশ প্রতিদিন দুর্ঘটনায় নিহত হচ্ছেন গড়ে ১৬ জন, আহত ৪০ জন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে সড়ক দুর্ঘটনায় গত ৯ মাসে নিহত হয়েছেন ৪ হাজার ২১১ জন। সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ১ হাজার ৪৯২ জন।
‘বিগত সরকারের ভুল নীতি সড়কে দুর্ঘটনা বাড়িয়েছে’
কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা উপেক্ষা করে সড়ককেন্দ্রিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলেই দেশে সড়ক দুর্ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির দাবি, ত্রিমাত্রিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে একচেটিয়াভাবে মানুষের যাতায়াত সড়কনির্ভর করে তোলায় বিগত সরকারের ভুল নীতির প্রভাবেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও প্রাণহানি বেড়েছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, “স্বাধীনতার আগে দেশের প্রধান যাতায়াত মাধ্যম ছিল নৌপথ ও রেলপথ। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হওয়ায় এ দুই মাধ্যমে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ চলাচল করতেন, আর সড়কপথ ব্যবহার করতেন প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ। সে সময় সড়ক দুর্ঘটনাও তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।”
মোজাম্মেল হক দাবি করেন, “স্বাধীনতার পর বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার প্রভাব এবং সরকারের ভুল নীতির কারণে বহুমাত্রিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে রেল ও নৌপথকে ক্রমেই সংকুচিত করা হয়। একই সঙ্গে নতুন নতুন সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে অধিকাংশ মানুষের যাতায়াত সড়কনির্ভর করে তোলা হয়েছে।”
তার অভিযোগ, “এ নীতির পাশাপাশি দুর্নীতি, পরিবহন খাতে অনিয়ম ও চাঁদাবাজির কারণে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ কারণে সড়কে প্রাণহানির দায় অতীতের সব সরকারকেই নিতে হবে।”
মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সড়ক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তার চাঁদাবাজির কারণে সড়কে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। তার দাবি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের চলাচল, লাইসেন্সবিহীন ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক, সড়ক নির্মাণে ত্রুটি, মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, বেপরোয়া গতি, অযোগ্য যানবাহনকে ফিটনেস সনদ এবং অযোগ্য চালকদের লাইসেন্স দেওয়াসহ নানা কারণে সড়ক দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত এবং ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন আহত হয়েছেন।”
সংগঠনটির দাবি, “এ তথ্য শুধু গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনার ভিত্তিতে তৈরি; হাসপাতালগুলোর প্রকৃত চিত্র বিবেচনায় হতাহত মানুষের সংখ্যা আরও কয়েকগুণ বেশি হতে পারে।”
একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, “একই সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়া ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের চলমান বিভিন্ন যুদ্ধে নিহত মানুষের সংখ্যার তুলনায় বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেশি।”
