উত্তর কলকাতার অলিগলিতে কান পাতলে এখনও যেন শোনা যায় পুরনো কলকাতার পদধ্বনি। শোভাবাজার থেকে সিমলা, আহিরীটোলা থেকে সুকিয়া স্ট্রিট— শহরের এই অংশের বনেদি বাড়িগুলির আনাচকানাচে ছড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস। কোথাও পুরনো স্থাপত্য, কোথাও পারিবারিক ঐতিহ্য, আবার কোথাও কয়েক পুরুষ ধরে চলে আসা দুর্গাপুজোর নানা রীতি। সেই তালিকায় অন্যতম আহিরীটোলার ধরবাড়ি। এ বছর এই বাড়ির দুর্গাপুজো ১১২ বছরে পা দিল। বৈষ্ণব মতে দেবীর আরাধনা হয় এখানে। মহাষ্টমীতে দেবী পূজিতা হন কুমারী ও সধবা, দুই রূপেই। সন্ধিপুজোয় ১০৮ প্রদীপ জ্বালানো থেকে বিশেষ নৈবেদ্য নিবেদন— ধরবাড়ির পুজোর প্রতিটি পর্বেই জড়িয়ে রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্য।
কাচের ব্যবসা থেকে দুর্গাপুজোর সূচনা
ধর পরিবারের আদি বাসস্থান হুগলির আদিসপ্তগ্রাম। পরিবারের পূর্বপুরুষ বাবু কানাইলাল ধর সেখান থেকে কলকাতায় আসেন। চিনাবাজারের একটি কাচের দোকানে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। পরে নিজেই ব্যবসা শুরু করেন। কাচ ও টিনের ব্যবসায় সাফল্য আসায় ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে ধর পরিবার। কানাইলালের হাত ধরেই বাড়িতে দুর্গাপুজোর সূচনা। তাঁর পুত্র শরৎচন্দ্র ধর ব্যবসার পরিধি আরও বাড়ান। তাঁর সময়ে পরিবারের সমৃদ্ধির পাশাপাশি পুজোর আয়োজনও আরও বিস্তৃত হয়।
রথের দিন থেকেই শুরু প্রস্তুতি
ধরবাড়িতে দুর্গাপুজোর সূচনা হয় রথযাত্রার দিন প্রতিমার কাঠামো পুজোর মাধ্যমে। মহালয়ার পরের দিন, অর্থাৎ প্রতিপদে বসে বোধন ঘট। প্রতিদিন হয় চণ্ডীপাঠ। ষষ্ঠী থেকে দুর্গাদালানে শুরু হয় দেবীর পুজো। বৈষ্ণব মতে আরাধনা হওয়ায় এই বাড়িতে বলিদানের রীতি নেই।
প্রতিপদ থেকে পঞ্চমী পর্যন্ত বাড়ির বিবাহিতা মহিলারা তৈরি করেন অরুগী। দূর্বা ও লাল সুতো দিয়ে তৈরি এই বস্তু দেবীকে নিবেদন করা হয়। পুজো শেষে বাড়ির মহিলারা তা সারা বছরের জন্য নিজেদের কাছে রেখে দেন। পারিবারিক বিশ্বাস ও প্রথার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই রীতিও ধরবাড়ির পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
কুমারী ও সধবা, দুই রূপে দেবীর আরাধনা
মহাষ্টমীতে ধরবাড়ির পুজোর বিশেষ আকর্ষণ কুমারীপুজো ও সধবাপুজো। যে বালিকাকে কুমারী রূপে পুজো করা হয়, তাঁর মাকে সধবা রূপে পুজো করার রীতি রয়েছে এই বাড়িতে। একই দিনে দুই প্রজন্মের দুই নারীর মধ্যে দিয়ে দেবীর দুই রূপের আরাধনা যেন পুজোয় যোগ করে অন্য মাত্রা।
অষ্টমীর দিন বাড়ির মহিলারা হাতে ও মাথায় সরা নিয়ে ধুনো পোড়ান। বনেদি বাড়ির পুজোর এই আচারও দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
সন্ধিপুজোয় ১০৮ প্রদীপ, বিশেষ নৈবেদ্য
সন্ধিপুজোয় ধরবাড়ির রীতি আরও স্বতন্ত্র। পরিবারের পুরুষ সদস্যেরা দেবীর সামনে ১০৮টি প্রদীপ জ্বালান। এই পুজো ঘিরে রয়েছে পারিবারিক কিছু নিয়মও। পরিবারের বাইরের কারও সন্ধিপুজো দেখার অনুমতি নেই। পুজো চলাকালীন বন্ধ থাকে বাড়ির সদর দরজা।
সন্ধিপুজোয় দেবীকে নিবেদন করা হয় ১০ কিলো চালের বিশেষ নৈবেদ্য। সেই চাল দিয়েই নবমীর দিন রান্না করা হয় খিচুড়ি। সঙ্গে থাকে চালতার অম্বল। দেবীর ভোগে থাকে লুচি ও নানা রকম ভাজা, সবই ঘিয়ে ভাজা। এ ছাড়াও নিবেদন করা হয় নারকেল নাড়ু, প্যারাকি, লাড্ডু, তিলের নাড়ু, সুজির হালুয়া এবং বাড়িতে তৈরি বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি। পুজোর ভোগে বনেদি বাড়ির নিজস্ব রন্ধনরীতির ছাপ স্পষ্ট।
দশমীতে কনকাঞ্জলি, তার পর মৎস্যমুখ
দশমীর দিন ধরবাড়িতে কনকাঞ্জলি দেওয়ার রীতি রয়েছে। কনকাঞ্জলি পর্বের পর বাড়ির কর্তা দেবীকে পরের বছর আবার ফিরে আসার নিমন্ত্রণ জানান। তার পর গঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জন হয়।
বিসর্জনের পর পরিবারের সদস্যেরা মৎস্যমুখ করেন। সেদিনের বিশেষ আহারে থাকে পোলাও, কাতলা মাছের মাথা দিয়ে চচ্চড়ি, কাতলা কালিয়া এবং ইলিশের টক। দেবীর বিদায়ের বিষাদ পেরিয়ে পরিবারের সকলে মিলে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় পুজোর আনুষ্ঠানিক পর্ব।
কাঠামো পুজো থেকে কনকাঞ্জলি, কুমারী ও সধবা আরাধনা থেকে সন্ধিপুজোর ১০৮ প্রদীপ— আহিরীটোলার ধরবাড়ির দুর্গাপুজো শুধু দেবী আরাধনার আয়োজন নয়, বরং একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস, সংস্কার ও ঐতিহ্য বহন করে চলেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।
