১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন বা তুলার তৈরি সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত অবিলম্বে ও শর্তহীনভাবে বাতিলের দাবি জানিয়েছে তৈরি পোশাকশিল্পের দুই সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ চেয়েছে সংগঠন দুটি।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক যৌথ চিঠিতে সংগঠন দুটি এ দাবি জানিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
চিঠিতে বলা হয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ৭ সেপ্টেম্বর ও ১৪ অক্টোবর জারি করা পৃথক দুটি আদেশের ফলে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পে কাঁচামাল আমদানি, উৎপাদন ব্যয় ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান ও বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের সই করা চিঠিতে বলা হয়, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহারের ফলে আমদানিকৃত সুতার ওপর শুল্ক ও কর পরিশোধ অথবা ব্যাংক গ্যারান্টি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। এতে রপ্তানিকারকদের কার্যকরী মূলধনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আটকে যাচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকেরা তারল্য সংকটে পড়ছেন।
বিজ্ঞাপন
দুটি প্রধান দাবি
চিঠিতে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ দুটি প্রধান সুপারিশ করেছে। প্রথমত, ২০২৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর জারি করা এনবিআরের আদেশ অবিলম্বে ও শর্তহীনভাবে প্রত্যাহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আদেশ প্রত্যাহারের পর বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) মধ্যে গঠনমূলক আলোচনা ও পারস্পরিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি টেকসই নীতিকাঠামো তৈরি করতে হবে।
সংগঠন দুটি বলেছে, স্থানীয় বস্ত্রকলগুলোর প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বজায় রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর মতো সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিতে হবে।
বিজ্ঞাপন
বন্দরে আটকে আছে আমদানি করা সুতা
বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের প্রভাবে এরই মধ্যে কাঁচামাল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করেছে সংগঠন দুটি। তাদের দাবি, চট্টগ্রাম বন্দরে পোশাকশিল্পের জন্য আমদানি করা বিভিন্ন ধরনের সুতা আটকে রয়েছে। এর মধ্যে সোয়েটার উৎপাদনে ব্যবহৃত টুইস্টেড সুতা, অর্গানিক সুতা, বিসিআই কটন সুতা, কটন মেলাঞ্জ ও অন্যান্য বিশেষায়িত সুতা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এসব সুতা প্রয়োজনীয় স্পেসিফিকেশন ও গুণগত মান বজায় রেখে দেশে উৎপাদিত হয় না বলে দাবি করেছে সংগঠন দুটি। ফলে আমদানি করা এসব কাঁচামাল সময়মতো কারখানায় পৌঁছাতে না পারায় উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, এনবিআরের ৭ সেপ্টেম্বরের আদেশের পর স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো এরই মধ্যে প্রতি পাউন্ড সুতার দাম ৩০ থেকে ৫০ সেন্ট বাড়িয়েছে। এতে পোশাক উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা দুর্বল হচ্ছে।
ক্রয়াদেশ সরে যাবার আশঙ্কা
বিজ্ঞাপন
ঘন ঘন নীতিগত পরিবর্তনের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ।
চিঠিতে ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল স্থলপথে সুতা আমদানি নিষিদ্ধ করা, কটন সুতা আমদানিতে বর্ধিত সুরক্ষামূলক শুল্ক আরোপের উদ্যোগ এবং ২০২৬ সালের আগস্টে নতুন আমদানি নীতির মাধ্যমে নিট কাপড় আমদানি নিষিদ্ধ করে পরে তা প্রত্যাহারের বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে।
বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত এ অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে বলে মনে করছে সংগঠন দুটি। তাদের দাবি, এ ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের কারণে ক্রেতারা বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হচ্ছেন। এরই মধ্যে কিছু ক্রয়াদেশ ভারত ও মিশরে স্থানান্তরিত হচ্ছে বলেও তারা জানিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ে প্রভাবের আশঙ্কা
চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প বছরে ৩৯ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় অর্জন করে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন অব্যাহত থাকলে শ্রমিক, রপ্তানিকারক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
পোশাকশিল্পের ওপর নির্ভর করে দেশের টেক্সটাইল বা বস্ত্রশিল্প গড়ে উঠেছে উল্লেখ করে সংগঠন দুটি বলেছে, পোশাকশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে সুতা ও কাপড় উৎপাদনকারী স্থানীয় মিলগুলোও ক্ষতির মুখে পড়বে।
এ পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের স্বার্থ রক্ষা এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখতে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা চেয়েছে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ।
সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
যৌথ চিঠিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংগঠন দুটি।
চিঠি অনুযায়ী, গত ২০ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বস্ত্র ও পোশাক খাত নিয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় আলোচ্যসূচির বাইরে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের তুলার সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের বিষয়টি উত্থাপন করেন বিটিএমএর প্রতিনিধিরা।
সভায় এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত না হলেও পরবর্তী সময়ে ৩১ আগস্ট জারি করা কার্যবিবরণীতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার ও ব্যাংক গ্যারান্টির বিষয়টি সিদ্ধান্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে চিঠিতে।
সংগঠনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই কার্যবিবরণীর ভিত্তিতে ৭ সেপ্টেম্বর এনবিআর বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার এবং ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে সুতা আমদানির আদেশ জারি করে। তবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পোশাকশিল্পের অন্যতম প্রধান অংশীজন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সঙ্গে যথাযথ আলোচনা করা হয়নি।
চিঠিতে আরও বলা হয়, ৭ সেপ্টেম্বরের আদেশ জারির আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভার কার্যবিবরণী তাদের হাতে পৌঁছায়নি। পরে সংগঠন দুটির অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ১৩ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত স্থগিত করার অনুরোধ জানিয়ে এনবিআরকে চিঠি দেয়। তা সত্ত্বেও আদেশ প্রত্যাহার না করে ১৪ অক্টোবর একই ধরনের আরেকটি আদেশ জারি করা হয়।
আইএইচও/এমকেআর
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
