আজকের পত্রিকা ডেস্ক

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার একটি গ্রামে তিনটি খ্রিস্টান পরিবারকে তিন দিন ধরে নানাভাবে হয়রানি ও হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি তাদের ওপর জোরপূর্বক হিন্দু রীতি চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কট্টর হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী বজরং দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য স্ক্রল থানায় দায়ের করা এফআইআরের ভিত্তিতে এই তথ্য জানিয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা স্ক্রলকে জানান, পরিবারের অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ধর্ষণ ও অপহরণের হুমকি দেওয়া হয় এবং এক নারীকে প্রায় বিবস্ত্র করে ফেলা হয়। তা ছাড়া, উত্তেজিত জনতা তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারার হুমকি দেয় এবং খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করার জন্য বারবার চাপ দিতে থাকে। এখনও পর্যন্ত এই ঘটনায় কাউকেই গ্রেপ্তার করা হয়নি।
গত ১৮ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে ৪০ বছর বয়সী লক্ষ্মী মণ্ডল যখন ঘরের কাজ করছিলেন, তখন পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে আসা অন্তত তিনজন নারীসহ ১০ জনেরও বেশি মানুষের একটি হামলাকারী দল তাঁর ঘরে অনধিকার প্রবেশ করে। লক্ষ্মী মণ্ডল তাদের চিহ্নিত করে জানান, তারা প্রতিবেশী গ্রামের বাসিন্দা এবং হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বজরং দলের সঙ্গে যুক্ত।
স্ক্রলকে লক্ষ্মী মণ্ডল বলেন, ‘তারা আমাকে টেনে হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে আসে। আমাকে চড়-থাপ্পড় মারা হয় এবং মাথায় ও কানের নিচে সজোরে আঘাত করা হয়, যার ফলে আমি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ি।’ জ্ঞান ফেরার পর তিনি দেখতে পান যে হামলাকারীরা তাঁর পোশাক খুলে ফেলার চেষ্টা করছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমি বুঝতে পারলাম তারা আমাকে গালাগাল করছে এবং চিৎকার করে বলছে আমাকে বিবস্ত্র করে ফেলা হবে। তিনজন পুরুষ আমার শাড়ি খুলে ফেলে এবং আমার ব্লাউজ ছিঁড়ে দেয়।’
তিনি অভিযোগ করেন, একটি ‘হিন্দু শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠান’-এর অংশ হিসেবে তাঁকে জোর করে স্নান করানো হয়। লোকজন তাঁর ১৬ বছর বয়সী মেয়েকে অপহরণ ও ধর্ষণের হুমকি দেয়। তিনি বলেন, ‘তারা বলেছিল আমি খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাস রাখতে পারব না এবং এই হিন্দু এলাকায় কোনো খ্রিস্টান থাকতে পারবে না।’
এই হামলার ঘটনার দুদিন পর চন্দ্রকোনা থানা ১৩ জনের বিরুদ্ধে একটি এফআইআর দায়ের করা হয়। এফআইআর সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অনধিকার প্রবেশ, হত্যাচেষ্টা, নারীর শ্লীলতাহানির উদ্দেশ্যে হামলা বা বলপ্রয়োগ, চুরি, অপরাধমূলক হুমকি এবং নারীর সম্মানহানি করার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুরের এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা স্ক্রলকে জানান, পুলিশ একটি মামলা নথিভুক্ত করেছে এবং ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘পরিবারটি তাদের বাড়িতেই রয়েছে এবং সেখানে একটি পুলিশ দল মোতায়েন করা হয়েছে।’ এই ঘটনায় বজরং দল যুক্ত ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।’
তিন বছর আগে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করা লক্ষ্মী মণ্ডল জানান, গত এক বছর ধরে ওই তিনটি পরিবারকে মৌখিকভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল এবং ধর্ম ত্যাগ করার কথা বলা হচ্ছিল। তিনি বলেন, ‘তবে এই প্রথম তারা আমাদের ঘরে ঢুকেছে, হামলা চালিয়েছে, অশালীন ভাষায় গালাগাল করেছে এবং আমাকে ও আমার মেয়েকে ধর্ষণের হুমকি দিয়েছে।’ লক্ষ্মী মণ্ডলের অভিযোগ, পুলিশ প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের ‘কোনো সুরক্ষা দেয়নি।’ তিনি বলেন, ‘তৃতীয় দিনে তারা আমাদের বাড়ি পাহারা দিতে শুরু করে। কিন্তু এখনও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।’
‘তারা আমাদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারার হুমকি দিয়েছিল’
লক্ষ্মী মণ্ডলের ওপর আক্রমণের পরপরই সেই দলটির লোকেরা তাঁর দুই জা বনশ্রী ও সরস্বতী মণ্ডলের ঘরে ঢোকে, যাঁরা নিকটেই বসবাস করেন। লক্ষ্মী মণ্ডল জানান, ‘তাদের পিঠে লোহার রড দিয়ে আঘাত করা হয় এবং অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। তারা সরস্বতী মণ্ডলের ঘরের তালা ভেঙে ২০ হাজার রুপি চুরি করে নিয়ে যায়।’ বনশ্রী মণ্ডলের অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েও এই হামলার শিকার হয়। এফআইআরে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘হত্যার উদ্দেশ্যে সেই ১৫ বছর বয়সী কিশোরীর গলা টিপে ধরা হয়েছিল। তাকে অপহরণ ও ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়।’
ঘর ছাড়ার আগে হামলাকারীরা তাদের প্রাণনাশের হুমকি দেয়। লক্ষ্মী মণ্ডল বলেন, ‘তারা হুমকি দিয়েছিল যে আমরা পুলিশের কাছে গেলে আমাদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হবে।’ তবে ভয় না পেয়ে লক্ষ্মী মণ্ডল ১০০ নম্বরে ফোন করেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তিনি বলেন, ‘কিন্তু পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তারা কোনো নিরাপত্তা না দিয়েই কিছু সময় পর চলে যায়।’
পুলিশ চলে যাওয়ার পর হামলাকারীদের সাহস আরও বেড়ে যায় বলে জানান লক্ষ্মী মণ্ডল। তারা বাড়িগুলো ঘিরে ফেলে এবং কাউকে বের হতে দেয়নি। তিনি বলেন, ‘তারা বলছিল পুলিশ আমাদের বাঁচাতে কিছুই করতে পারবে না। তাই আমরা রাতেই আমাদের মেয়েকে অন্য একটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিই।’
পরদিন সকালে, অর্থাৎ ১৯ অক্টোবর, সেই জনতা আবারও ফিরে আসে।
লক্ষ্মী মণ্ডল জানান, এবার তাঁকে, বনোশ্রী মণ্ডলকে এবং তাঁদের স্বামীদের নিকটবর্তী ডিঙাল গ্রামের একটি দুর্গাপূজার মণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চারজনকেই জোর করে পুষ্পাঞ্জলি দিতে বাধ্য করা হয়। এর পরের দিন সকালে লক্ষ্মী মণ্ডলের স্বামীকে তারা আবার তুলে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘তারা আমার স্বামীকে একটি অজানা স্থানে নিয়ে যায় এবং আমরা যদি যিশু খ্রিস্টকে ত্যাগ না করি তবে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।’ কয়েক ঘণ্টা পর তাঁর স্বামী ফিরে আসেন।
এই ঘটনার পর ২০ অক্টোবর তাদের ঘরের সামনে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। লক্ষ্মী মণ্ডল বলেন, ‘কিন্তু আমরা এখনও ভীষণ আতঙ্কের মধ্যে আছি। কাউকেই গ্রেপ্তার করা হয়নি। যদি পুলিশ সরিয়ে নেওয়া হয়, তবে আমাদের কী হবে?’
খ্রিস্টান সংগঠনগুলো জানিয়েছে যে তারা রাজ্যজুড়ে সম্প্রদায়ের ওপর চলা সহিংসতার তথ্য সংরক্ষণ করছে। কলকাতার এক খ্রিস্টান নেতা বলেন, ‘কমপক্ষে ১৩টি এফআইআর এবং ৬০ টিরও বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’ ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে খ্রিস্টানদের জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ লাখ, যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার দশমিক ৭২ শতাংশ।

